• বুধবার, ২২ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

তারুণ্যের চোখে জাপান

  ইকরাম হোসাইন তুষার ১৭ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৩৩

জাপান
টোকিও শহরটা বেশ পছন্দ হয়ে গেল প্রথম দেখাতেই; (ছবি : লেখক ) 

যাত্রা শুরু হয়েছিল ৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে। আমরা ৬ জনের একটা দল যাচ্ছি সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে। উদ্দেশ্য জাপানে অনুষ্ঠিত তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে প্রোগ্রাম ল্যাম্পে অংশ নেয়া। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করার সময় মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। কেমন একটা ভালো লাগা ছুঁয়ে যাচ্ছিল অনুভূতিগুলোকে। দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছি। ভাবতেই রক্তের মধ্যে কেমন একটা শিহরণ কাজ করতে লাগল।

ল্যাম্প প্রোগ্রামের মূল কথা হলো লার্ন, অ্যাক্ট অ্যান্ড মেক প্রোগ্রাম। প্রোগ্রামের আয়োজক হচ্ছে ই-এডুকেশন জাপান। বিশ্ববিখ্যাত টয়োটা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে প্রোগ্রামটিতে অংশ নিচ্ছে তিনটি দেশ। জাপান, বাংলাদেশ ছাড়াও এতে অংশ নিতে আসবে মায়ানমার।

২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকেই মূলত রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সম্পর্কের অবনতি হয়। অক্টোবর এবং ডিসেম্বর মাসে আমরা ৩ পর্যায়ে উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাই এবং বিভিন্নভাবে তাদের সহায়তার চেষ্টা করি। সে সময় আমাদের টিমের নেতৃত্ব দেন মি. কাইটো মিওয়া। আমরা তখন প্রায় ২০ লক্ষ টাকার ত্রাণ বিতরণ করি।

সত্যি বলতে এমন একটি প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের চিন্তা প্রথম মি. কাইটো মিওয়ার মাথায় প্রথম উদ্ভব হয়। কেননা, ই-এডুকেশন বাংলাদেশ মায়ানমারসহ ১৩টি দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সেই সুবাদে মায়ানমার এবং বাংলাদেশের যুবকদের সাথে প্রচুর কাজ করেছে। সে যখন পর্যবেক্ষণ করল যে, বাংলাদেশ থেকে আমরা রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার চেষ্টা করছি এবং সাথে সাথে মায়ানমারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছি। অপরদিকে মায়ানমারের সাধারণ জনগণ কিছুটা ধোঁয়াশাতেই আছে যে রাখাইনে কী হচ্ছে বা রোহিঙ্গারা আসলেই বাঙালি কি না।

জাপান

শুরু হয়ে গেল ওয়ার্কশপ। (ছবি : লেখক )

মি.কাইটু মিওয়া মায়ানমার ও বাংলাদেশের যুবকদের মাঝের এই দূরত্ব দূর করতে এমন একটি প্রোগ্রামের কথা চিন্তা করেন। কেননা, উভয় দেশের যুবকদের মাঝে একটা জিনিস কম পান, সেটা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং মানবতার কথা বলা। সেখান থেকেই মূলত ল্যাম্প গঠন বা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। আমি ব্যক্তিগত খুব গর্বিত যে আমি এই প্রোগ্রামের শুরু থেকেই থাকতে পেরেছিলাম।

৯ তারিখ সকালে টোকিওর নারিতা এয়ারপোর্টে নামলাম। মাঝখানে কুয়ালালামপুর একটা বিরতি ছিল বিমানের। বিশ্বের ব্যস্ততম এয়ারপোর্টগুলোর একটি এই নারিতা এয়ারপোর্ট। ঝকঝকে এয়ারপোর্ট দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়। এখানেই আমাদের সাথে যোগ দেয় মায়ানমার টিম। দুইদল একসাথেই রওয়ানা দিলাম। আমাদের জন্য নির্ধারিত বাস ছিল। বাসের ভেতরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেলাম। কত্ত আধুনিক আর উন্নত এই বাস। আমাদের ঢাকা শহরের লোকাল বাসগুলোর কথা মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কবে আমরা ওদের মতো এত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারব।

জাপান

আমরা পেরেছি; (ছবি : লেখক )

বাসে করে আমরা যাচ্ছি জাপান অলিম্পিক ইয়ুথ মেমোরিয়াল সেন্টারে। টোকিও শহরটা কী পরিষ্কার আর চকচকে! জাপান অলম্পিক ইয়ুথ মেমোরিয়াল সেন্টারে আমাদের অভ্যর্থনা জানানো হলো। একটু বিশ্রাম আর নাস্তার পর আমাদের পরিচিত পর্ব শুরু হয়। প্রতি টিমে ছয়জন করে তিনটি টিম করে দেয়া হয় ওয়ার্কশপের জন্য। তিন দেশের দুইজন করে ছিল প্রতিটি টিমে। আলাদা আলাদা মিশন দেয়া হয় প্রত্যেক দলকে। আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় জাপানের ৩ জন তরুণ উদ্যোক্তার সাথে। যারা নতুন আইডিয়া নিয়ে সমাজের জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

আমাদের মিশন ছিল তাদের এই আইডিয়াগুলো কাজে লাগিয়ে নিজ নিজ দেশে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। কীভাবে সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়। এর জন্যে আমাদের অনেক রিসার্চ করতে হয়েছে, ফিল্ডওয়ার্ক করতে হয়েছে। একই সাথে টিম হয়ে কাজ করার ফলে আমাদের মাঝে আন্ডারস্ট্যান্ডিং অনেক বেড়েছে। বন্ধুত্ব হয়েছে অনেকের সাথে। ৫ দিন নিরলস পরিশ্রম শেষে ১৪ তারিখ আমরা একটা ফাইনাল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে আমাদের আইডিয়া তুলে ধরি। ফাইনাল প্রেজেন্টেশনের পর আমরা একদিন পাই ঘুরে দেখার জন্যে। আর সে সময়টাই আমি কাজে লাগাই।

জাপান

আহ! অর্জন! (ছবি : লেখক )

জাপানে যে কয়টা দিন ছিলাম আমার কাছে মনে হয়েছে আসলে অর্থ বা স্থাপনার দিক থেকেই তারা এগিয়ে না। চিন্তা ভাবনায়ও অনেক এগিয়ে আমাদের চেয়ে। রাস্তায় ডাস্টবিন নেই তাও কেউ ময়লা রাস্তায় ফেলে না। হাতে করে বাসায় নিয়ে যায়। অথচ আমাদের পাশেই ডাস্টবিন পেয়েও সেখানে না ফেলে ময়লা রাস্তায় ফেলি।

আরেকটি ব্যাপার ছিল সময়ের মূল্য দেয়া। তাদের কাছে সময়ের মূল্য অনেক। মিটিং ৮টায় মানে ৮টায়। ১ মিনিটের লেটের জন্যেও কঠিনভাবে জবাবদিহি করতে হয়। মজার ব্যাপার হলো, জাপানে এই ৮ দিন থাকাকালে একটি গাড়ির হর্ন শুনতে পাইনি। আর ঢাকার কথা তো সবাই জানেনই।

জাপানে গিয়ে আমি বেশ কিছু বন্ধু পেয়ে যাই। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ সংগ্রহ এবং বিতরণে আমার অবদান নিয়ে জাপানের জাতীয় টেলিভিশন এনএইচকে চ্যানেলে একটি ডকুমেন্টারি প্রচারিত হয়। তখন ৩ জন জাপানি সাংবাদিক ৩ দিন ধরে আমার সাথে থেকে আমার সকল কার্যক্রম রেকর্ড করে।

আমার কাছে আরেকটি প্রাপ্তির বিষয় ছিল যে, জাপান অ্যাম্বেসি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেইজে আমার তোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিছু ছবি প্রকাশ করে যা জাপানেও খুব প্রসংশিত হয়। এগুলোর ফলে ওখানে আমাকে অনেকেই চিনেছিল। যারা আমাকে বেশ সহায়তা করেছে। ব্যাপারটা এত ভালো লেগেছে বলার মতো নয়।

জাপান

আমরা সবাই বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। (ছবি : লেখক )

আমাদের টিমের প্রত্যেকের জন্যই একটি বড় অভিজ্ঞতা ছিল এই ট্যুরটি। বিশেষ করে আমার জন্য এটি ছিল আরও বিশেষ কিছু। আমি প্রায় ৫ বছর ধরে জাপানিদের সাথে কাজ করছি। আমার অসংখ্য জাপানি ফ্রেন্ড রয়েছে। হিসাব করলে ২০০-র কম হবে না। এই প্রোগ্রামের ফলে তাদের অনেকের সাথেই দেখা করার সুযোগ হয়। যাদের কল্যাণে পুরো টোকিও শহরটা ফ্রিতে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। পুরোনো এই বন্ধুগুলো জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাবার সুশির স্বাদ নেবার সুযোগ করে দিয়েছিল আমায়।

যতগুলো জায়গা ঘুরেছি তারমধ্যে সেরা ছিল টোকিও টাওয়ার আর টিম ল্যাব আর্ট এক্সিবিশন। এই দুইটি জায়গা এতটাই ভালো লেগেছে আমি যতবার জাপান যাব এখানে একবার হলেও ঢুঁ মেরে আসব। আর ফেরার বেলায় তুষারপাত দর্শনের ভাগ্যটাও যেন ফিরে ফিরে আসে।

এই প্রোগ্রামের ২য় পর্বটি আগামী ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ থেকে ১লা মে পর্যন্ত মায়ানমারে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জাপানের একটি দল ও বাংলাদেশ থেকে আমরা ৫ জনের প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করব।

আর ৩য় পর্বটি হবে বাংলাদেশে। আগামী জুন বা জুলাই মাসে জাপান ও মায়ানমার থেকে টিম আসবে বাংলাদেশে।

ওডি/এসএম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: info@odhikar.news

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড