• রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৯ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বুড়িগঙ্গার ভাসমান হোটেল

অস্তিত্ব হারানোর স্রোতে ভাসছে নিম্ন আয়ের মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই

  রিয়াজুল ইসলাম

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:৩৩
বুড়িগঙ্গার ভাসমান হোটেল
বুড়িগঙ্গার ভাসমান হোটেল (ছবি : অধিকার)

ষাটোর্ধ মোশারফ হোসেনের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং এর আশেপাশের এলাকাতে পান, সিগারেট ফেরি করে বিক্রি করেন তিনি। বাড়িতে পরিবারের দেখাশোনা করার দায়িত্ব তার ওপরেই। ঢাকা শহরে তার টিকে থাকাটাই যেন সংগ্রামের গল্প। আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় তিনবেলা খাবারে। পরিবারের সাথে সাথে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিম্ন আয়ের এই মানুষ সবসময় চেষ্টা করেছে এই ঢাকা শহরে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজার। মোশারফ হোসেনের মতো স্বল্প আয়ের মানুষগুলো কোথায় থাকেন, কীভাবে থাকেন সেটি এক বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে বাসস্থান অন্যতম। ঢাকা শহরে কম মূল্যে আবাসিক সুবিধা কোথায় পাওয়া যায় এ প্রশ্ন আসলেই বলা যেতে পারে সদরঘাটের ভাসমান হোটেল বা বোর্ডিং এ একমাত্র এই সুবিধা পাওয়া যায় যেখানে প্রতিরাত থাকার জন্য খরচ করতে হয় মাত্র ৪০ টাকা। উপরে উল্লেখিত মোশারফ হোসেনের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য যেন এই ভাসমান হোটেলগুলো যেন আশীর্বাদস্বরূপ।

রিপন মিয়ার গ্রামের বাড়ি বরিশালে। সদরঘাটে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা রিপনের প্রতিদিনের খাবার খরচ প্রায় ২০০ টাকা। উপার্জনের বড় একটা অংশ চলে যায় তিন বেলার খাবারে। ফলশ্রুতিতে ঢাকা শহরের উচ্চমূল্যের বাসাবাড়িতে থাকাটা তার পক্ষে দুরূহ। তিনি প্রায় দুই বছর যাবৎ থাকছেন ফরিদপুর মুসলিম বোর্ডিং এ। কথা বলে জানা যায় তিনি অসুস্থ হবার ফলে গত কয়েকদিন কাজে যেতে পারেন না। বোর্ডিং এর মালিক মো. মোস্তফা মিয়ার থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়েই দিন পার করছেন। এখানে আবাসিক সকল ধরণের সুবিধাই তিনি পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন এখানে থাকার কারণে বোর্ডিং মালিকের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জরুরী কোনো প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলেও তিনি মালিকের থেকে সেই সুবিধা পেয়ে থাকেন।

১১ বছর বয়সী সুমন তার মামার সাথে এই বোর্ডিং এ থাকেন। তার মামা সদরঘাটগামী একটি লঞ্চের বাবুর্চি। সে সবসময়ই এখানে থাকে। খাবার সময় বাইরে গিয়ে আশেপাশের হোটেল থেকে খেয়ে আসে। তার মামা ফিরলে মামার সাথেই বাকিটা সময় কাটায়। নিজের গ্রামের বাড়ি থেকে দূরে থাকার কারণে পড়ালেখা করার মৌলিক অধিকার হারালেও বাসস্থান আর খাদ্যের অধিকার অন্তত নিশ্চিত করতে পারছে সে।

ভাসমান হোটেলের অবস্থান-

পূর্বে ভাসমান হোটেলগুলো সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের সাথে থাকলেও বিআইডব্লিউটি এর নির্দেশে হোটেলগুলো নিয়ে আসা হয় ওয়াইজঘাটে। এখানে কিছুদিন থাকার পর স্থানান্তরিত করা হয় বাদামতলী ফলের আড়তের সামনে। বর্তমানে এটি স্থান পরিবর্তন করে মিটফোর্ড হাসপাতালের বিপরীত দিকে অবস্থান করছে। বাবুবাজার ব্রিজ থেকে তাকালেই দেখা যায় ছইওয়ালা ৫টি বড় নৌকা একসাথে বাঁধা। প্রায় অর্ধশত বছরের পুরাতন এই হোটেলগুলো অনেকটা জীর্ণ অবস্থাতে আছে। পাঁচটি হোটেলের মাঝে দুইটি শরিয়তপুর মুসলিম বোর্ডিং নামের। একটি ফরিদপুর মুসলিম বোর্ডিং ও অপর দুইটির নাম উমা-উজালা বোর্ডিং। এর মধ্যে শরিয়তপুর মুসলিম বোর্ডিং নামের ভাসমান হোটেলটি সব থেকে পুরাতন।

সুযোগ সুবিধা-

খাবারের সুবিধা ব্যতীত আবাসিক হোটেলের সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন এখানে অবস্থানকারীরা। বিদ্যুতের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা রয়েছে। গরমকালের জন্য রয়েছে ফ্যানের ব্যবস্থাও। বোর্ডিং এর পিছনের দিকে রয়েছে গোসল করার জায়গা ও শৌচাগার। পানিতে ভাসমান হোটেল হলেও সামান্য টাকার বিনিময়ে মাথা গোজার যে ঠাঁই পাওয়া যায় এখানে তা ঢাকা শহরের মাঝে এক বিরল ঘটনা বলা যায়। সিংগেল, ডাবল ও ঢালাওভাবে থাকার জন্য কেবিন রয়েছে এই হোটেলগুলোতে।

খরচ কেমন?

ঢালাওভাবে পাটাতনের ওপর থাকার জন্য প্রতিরাত খরচ করতে হয় ৪০ টাকা। সিংগেল কেবিনে খরচ হয় ১০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের মূল্য ১৫০ টাকা। সিংগেল ও ডাবল কেবিনে যারা থাকেন তাদের তোশক, বালিশ ও শীতকালের কম্বলের ব্যবস্থা হোটেল থেকেই করা হয়।

ফরিদপুর মুসলিম বোর্ডিং এর মালিক মো. মোস্তফা মিয়া। ফরিদপুরের বোয়ালমারিতে স্থায়ী বসবাস। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের পর থেকেই সূচনা হয় এই ভাসমান হোটেলের। পূর্বে তার মামা এটি পরিচালনা করলেও বিগত ৩৬ বছর ধরে তিনি এই ভাসমান হোটেল পরিচালনার দায়িত্বে আছেন।

তিনি জানান, এখানে যারা থাকতে আসেন তারা সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রতিটা হোটেলে ৫০টির মতো কেবিন থাকলেও এখন অনেকটাই ফাঁকা পড়ে থাকে। তার হোটেলটি যখন সদরঘাটের কাছাকাছি ছিল তখন যথেষ্ট উপার্জন হতো এবং প্রতিটা কেবিনেই লোক উঠত। ১৯৭৫ সালের পর যখন এই হোটেলের উদ্ভাবন হয় তখন থেকে বিআইডব্লিউটিএ এর থেকে লাইসেন্স নিয়ে গড়ে তোলা হয়। পরিশোধ করেন নিয়মিত ইজারাও। কিন্তু সদরঘাটের থেকে অনেক দূরে স্থানান্তরিত করায় তার ব্যবসায়িক মন্দা চলছে। পরিবার নিয়ে কোনোভাবে কায়ক্লেশে দিন যাপন করছেন তিনি।

একই বক্তব্য উমা-উজালা বোর্ডিং এর ম্যানেজারের। তিনি বলেন, আগে আমাদের এই হোটেলগুলোর সিট হাউজফুল হতো কিন্তু বর্তমানে এই সুনসান জায়গাতে স্থানান্তরিত করার ফলে প্রায় ফাঁকা অবস্থাতেই থাকে হোটেলগুলো। নিয়মিত ইজারা পরিশোধের পরও আমাদের একের পর এক স্থানান্তরিত করার কারণ কেউই জানি না।

এক সময়ের ইংরেজ সাহেব এবং বাঙালি জমিদারদের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল ভাসমান বজরায় দিন-রাত্রি যাপন করা। সেই সূত্র থেকেই মূলত এই ভাসমান হোটেলের উদ্ভব। কিন্তু স্থানান্তরিত করে রাখার কারণে দীর্ঘদিনের এই নিম্ন আয়ের মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও বিপন্ন হতে পারে যেকোনো মুহূর্তে।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড