• সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

যুদ্ধাহত সৈন্যদের পেটে গ্যাস ভরাতেন যে চিকিৎসক!

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:৩৮
ড. নিকোলাস সেন
ড. নিকোলাস সেন ছিলেন শল্যচিকিৎসকদের অগ্রদূত

অসুস্থ হলে আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। ডাক্তাররা রোগীকে মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। রোগীর সমস্যার কথা জেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী পরামর্শ দেন। রোগ নির্ণয় ও ওষুধ দেওয়ার জন্য কেউ তড়িঘড়ি করেন না।

কিন্তু আমেরিকার শল্যচিকিৎসক ড. নিকোলাস সেনের চিকিৎসার ধরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপাত দৃষ্টিতে অনেকের মনেও হয়েছিল তড়িঘড়ি করে রোগ নির্ণয়ের কাজ করতেন নিকোলাস। তার কাছে রোগী যাওয়ামাত্রই দ্রুত পরনের কাপড় খুলে ফেলতেন। অতঃপর পায়ুপথ দিয়ে গ্যাস প্রবেশ করিয়ে রোগীর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতেন।

অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনা কিন্তু সত্যি। ১৮৯৮ সালে স্পেন ও আমেরিকার মাঝে যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল। সেই যুদ্ধের সময় নিকোলাস সেন প্রধান শল্যচিকিৎসক হিসেবে আমেরিকার সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন।

নিকোলাস যখন যুদ্ধাহত সৈন্যদের চিকিৎসা করেন তখন প্রচুর সৈন্য পেটে গুলি দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আসতেন। যদিও ১৮৯৫ সালে এক্সরে আবিষ্কৃত হয় তথাপিও এক্সরে সে সময় বহুল প্রচলিত ছিল না। এ কথাও ঠিক নিকোলাস অগ্নাশয়ের প্রদাহ, প্লাস্টিক সার্জারি, মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার শনাক্তকরণ, অন্ত্রের রোগ, লিউকেমিয়ার চিকিৎসায় এক্সরে দ্বারা পরীক্ষামূলক গবেষণা করেছিলেন।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এক্সরের সুবিধা তেমন না থাকায় সৈন্যদের পাকস্থলী ও অন্ত্র গুলির দ্বারা ছিদ্র হয়েছে কিনা তা জানা অনেক কঠিনই ছিল। নিকোলাস ও তার দলের সদস্যরা রোগীর পাকস্থলীর অবস্থা বোঝার জন্য ব্যাপক সংগ্রাম করতেন। পাকস্থলী ও অন্ত্র ছিদ্র হলে সাধারণ শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা কঠিনই ছিল।

কোনো গ্যাস লাইনের ছিদ্র পরীক্ষার জন্য পাইপ নির্মাতারা তখন ভেতরে গ্যাস চালনা করত। সেখান থেকেই নিকোলাস একটি সুন্দর ধারণা পান। তিনি সৈন্যদের পাকস্থলী ও অন্ত্রে গ্যাস ভরিয়ে ছিদ্র শনাক্ত করার চিন্তাভাবনা করেন।

চিন্তাভাবনার পর নিকোলাস রোগীর পায়ুপথে গ্যাস প্রবেশ করান। গ্যাস প্রবেশের পর যদি পাকস্থলী ফুলে ওঠে তবে ধরে নিতেন রোগীর পাকস্থলী ছিদ্র হয়নি। তবে নিকোলাস ভেবে-চিন্তে হাইড্রোজেন গ্যাস প্রবেশ করাতেন। এই গ্যাসে কোনো বিষাক্ত উপাদান ছিল না। এছাড়াও পেটের ভেতরে কোনো জ্বলনও সৃষ্টি করত না। 

অন্য দিকে এই গ্যাস দ্রুত শরীরের টিস্যু দ্বারা শোষিত হতো। আরও একটি সুবিধা ছিল এই গ্যাস ব্যবহারের। যেহেতু এই গ্যাস আগুনের সংস্পর্শে জ্বলে ওঠে তাই নিকোলাস ম্যাচ দ্বারা আগুন জ্বালিয়েও সুক্ষ্ম ছিদ্র আছে কিনা পরীক্ষা করতেন। এমনকি আহত সৈন্যদের পেট আগুনের উপরও ধরতেন। নিকোলাসের মতে, এর দ্বারা ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্তও হতো।

মানুষের শরীরের গ্যাস প্রবেশ করিয়ে ছিদ্র পরীক্ষার জন্য নিকোলাস প্রথমে কুকুরের ওপর বেশকিছু পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। প্রথমে কুকুরকে বেঁধে নিতেন। পরে চেতনানাশক প্রয়োগ করতেন। চেতনানাশক দেওয়ার পর রিভলবার দিয়ে গুলি করতেন। এরপর হাইড্রোজেন গ্যাস পায়ুপথ দিয়ে প্রবেশ করাতেন। যদি কুকুরের পাকস্থলী ছিদ্র হতো, তবে পাশে আগুন নেওয়া মাত্রই নীল শিখাসহ জ্বলে উঠত। এখনও বিভিন্ন গবেষণাকাজে বহু প্রাণী ব্যবহৃত হয়।

নিকোলাস সেন ছিলেন শল্যচিকিৎসকদের অগ্রদূত। তিনি বহু জটিল রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। ৩১ অক্টোবর, ১৮৪৪ সালে সুইজারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। আট বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিলেন। শিকাগো মেডিকেল কলেজ থেকে ১৮৬৮ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। 

আরও পড়ুন : গুজবের শিকারে কোটিপতি থেকে দরিদ্র হয়ে গিয়েছিলেন যে নারী

তিনি ১৮৯৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। মিলিটারি মেডিসিনের ওপর তার আলাদা আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই মিলিটারি শল্যচিকিৎসকদের সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে দুই বছরের জন্য সভাপতিও ছিলেন। স্পেন-আমেরিকার যুদ্ধের সময় তিনি সৈনিকদের চিকিৎসায় কিউবায় কাজ করতেন। জীবদ্দশায় নিকোলাস ২৫টি বই ও অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। ২ জানুয়ারি, ১৯০৮ সালে নিকোলাস সেন মারা যান।

নিকোলাস সেনের গ্যাস প্রবেশকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে অনেক সৈনিকের জীবন রক্ষা পেয়েছিল। তবে এক্সরে মেশিনের জনপ্রিয় ও ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই পরীক্ষারও প্রয়োজনীয় ফুরিয়ে যায়। এখন হয়তো এই পদ্ধতি আর ব্যবহারই হচ্ছে না।

সূত্র- অ্যামিউজিং প্লানেট, সেন অ্যালামনাই ডট অর্গ

ওডি/এনএম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড