• বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গুজবের শিকারে কোটিপতি থেকে দরিদ্র হয়ে গিয়েছিলেন যে নারী

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:২১
মেরি অ্যালেন প্লেজেন্ট
মেরি অ্যালেন প্লেজেন্ট (ছবি- ইন্টারনেট)

হিংসা বিদ্বেষ, কুৎসা রটনা মানব সমাজকে নিমিষেই ধ্বংস করতে পারে। এছাড়াও গুজব ছড়ানো যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা কিন্তু আমাদের দেশে গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখেই আসছি। এমনই এক গুজব ও হিংসার শিকার হয়ে কোটিপতি থেকে শেষকালে দরিদ্র অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন মেরি অ্যালেন প্লেজেন্ট। 

মেরি অ্যালেন প্লেজেন্ট নামটি হয়তো তার পরিবারের দেওয়া নয়। তবে এই মহিলার গল্প আমেরিকার যে কোনো উদ্যোক্তার জীবনের গল্পকে হার মানায়। অষ্টাদশ শতকে প্লেজেন্ট প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান হিসেবে নিজেকে মিলিয়নিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যদিও কালো হিসেবে যথেষ্ট বাঁধা বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি।

মেরি অ্যালেন প্লেজেন্ট ১৮১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অনেক জীবনীকারকদের মতে, তিনি জর্জিয়ার একটি দাস পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি জানিয়েছিলেন তার জন্মস্থান ছিল ফিলাডেলফিয়া। তাছাড়াও তিনি কখনো দাস পরিবারের কেউ ছিলেন না।

প্লেজেন্ট খুবই ছোটবেলায় বাবা মা থেকে আলাদা হয়ে যান। ছোটবেলাতেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে একটি সাদা পরিবারে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করতে হয়। ম্যাসাচুসেটসে অষ্টাদশ শতকের শেষকাল অব্দি দাস প্রথা বৈধ ছিল।

গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করলেও প্লেজেন্টের ভাগ্যটা অনেক ভালো ছিল বলা যায়। তিনি সেখানে লেখাপড়া শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। পাশাপাশি তাকে একটি দোকানে কাজ করতে হতো। তবে এই পড়াশোনা কখনোই আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা ছিল না। আর এই পড়াশোনাও তিনি বেশিদিন করেননি। এক সময় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে তিনি নারী-পুরুষের সততাপরায়ণ আচরণ নিয়ে পড়াশোনা করেন।

১৮৫২ সালে প্লেজেন্টকে সান ফ্রান্সিসকোতে যেতে হয়। সান ফ্রান্সিসকোতে সবেমাত্র দাস প্রথা বন্ধ হয়েছে। জানা যায়, সেখানে ১৮৫০ সালে দাস প্রথা বন্ধ হয়েছিল। সেখানেই প্লেজেন্ট আবারও গৃহপরিচারিকার কাজ শুরু করেন। তবে এবার তার ভাগ্যটা আরেকটু খুলে গিয়েছিল। এখানে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের জন্য রান্নারও কাজ করতেন।

ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের জন্য রান্না ও খাবার পরিবেশনের সময় তিনি তাদের কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, প্লেজেন্ট গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন মূলত বিনিয়োগের ধারণা পাওয়ার জন্য। আবার ইলিনয়েস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিন মারিয়া হাডসনের মতে, গৃহকর্মীর কাজ প্লেজেন্টের একটা ছদ্মবেশী আবরণ ছিল মাত্র। মূলত তিনি তার টাকা-পয়সা বিনিয়োগের উপায় খুঁজেছিলেন।

৩৮ বছর বয়সে প্লেজেন্ট সান ফ্রান্সিসকোতে মাসিক ৫০০ ডলার বেতন পেতেন। সেই বেতনের টাকা তিনি আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। এছাড়াও তার সুযোগ যেদিকে বেশি আসত সেদিকেই বিনিয়োগ করতেন। তিনি সুযোগ বুঝে সোনা ও রুপার খনিতেও বিনিয়োগ করতেন।

বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন স্থানীয় ছোটখাটো ব্যবসা করেছিলেন। ১৮৬০ সালে লন্ড্রির ব্যবসা থেকে ভালো আয় করতে শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি একজন ব্যাংক কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন।

আপন মেধা ও ব্যবসায়িক কৌশল প্রয়োগ করে তিনি ব্যাংক কর্মী থমাস বেলের সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করেন। এই বেল প্লেজেন্টকে কিছু বিনিয়োগপত্র কেনায় সহায়তা করেছিলেন। কালো বর্ণের বলে বিনিয়োগপত্র কেনায় যাতে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সেই জন্য বেলের নামে অনেকগুলো বিনিয়োগপত্র কিনেছিলেন প্লেজেন্ট।

কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, তাদের যৌথ বিনিয়োগ থেকে প্রচুর টাকা উপার্জিত হয়েছিল। লন্ড্রি, দুগ্ধজাত পণ্য এমনকি ব্যাংক বিনিয়োগ থেকে তৎকালে ৩০ মিলিয়ন ডলারের অধিক উপার্জিত হয়েছিল। এই সম্পত্তি বর্তমান সময়ের ৮৬৪ মিলিয়ন ডলারের মতো হবে।

অষ্টাদশ শতকে একজন আফ্রিকান আমেরিকান কালো মহিলার জন্য তার সম্পত্তির বহিঃপ্রকাশ করা সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু প্লেজেন্ট তা গোপনও রাখতে চাননি। তিনি তৎকালীন ১ লক্ষ মিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে আনুমানিক প্রায় ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন) অর্থ ব্যয় করে সুবৃহৎ ও জাঁকালো অট্টালিকা তৈরি করেছিলেন।

এই অট্টালিকায় বেল ও তার পরিবারের সঙ্গে বাস করতে থাকেন প্লেজেন্ট। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সম্পত্তি ক্রয় করতে থাকেন। অষ্টাদশ শতকের শেষে তিনি সান ফ্রান্সিসকোতে ৯৮৫ একরের গবাদি পশুর খামার ক্রয় করেন। 

একজন দাস কিংবা গৃহকর্মী থেকে অঢেল সম্পত্তির মালিক হওয়ার বিষয়টি অনেকেরই সহ্য হতো না। তাই তার প্রতি হিংসায় অনেকেই কুৎসা ও গুজব রটাতে থাকে। প্লেজেন্টকে বেলের উপপত্নী হিসেবে প্রচার করতে থাকে। তার জাঁকালো অট্টালিকা পতিতালয়ে পরিণত করেছেন। এছাড়াও তিনি জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। এসব কথাও প্রতিনিয়ত ছড়াতে থাকে।

প্লেজেন্টের বিরুদ্ধে গুজব প্রমাণে তার কিছু কর্মকাণ্ডকে সামনে আনা হতো। প্লেজেন্ট ভূগর্ভস্থ রেলপথে কাজ করতেন দাসদের মুক্ত করতে। প্লেজেন্ট প্রথমবার সম্পদশালী এক ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যিনি মারা যাওয়ার সময় প্রচুর সম্পত্তি প্লেজেন্টের নামে লিখে রেখে যান। তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু তার কোনো সন্তান হয়নি। প্লেজেন্ট তার স্বামীর দেওয়া সম্পত্তি দিয়ে দাসদের মুক্ত করতেন, সংগ্রাম করতেন মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করতে। এছাড়াও দাসদের আবাসনের ব্যবস্থা করতেন। হয়তো এসব কারণেই তার নামে পতিতালয় চালানোর গুজব রটানো সহজ হয়েছিল। তবে তিনি পরবর্তীকালে তার মহতী কাজের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘মাদার অব সিভিল রাইট’ উপাধি পেয়েছিলেন।

প্রচুর ধন-সম্পত্তির মালিক হলেও প্লেজেন্টের শেষকাল কাটে দরিদ্রতায়। ১৮৯২ সালে তার বিনিয়োগের অংশীদার বেল মারা যান। বেলের মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী প্লেজেন্টের নামে লক্ষ লক্ষ ডলার সম্পত্তির অংশ জোরপূর্বক দখল করার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। প্লেজেন্ট মামলায় হেরে যান।

আরও পড়ুন- সেকমল বিশ্ববিদ্যালয় : ব্যর্থদের সফল করার এক জাদুকরী প্রতিষ্ঠান

প্লেজেন্টের খ্যাতিও দ্রুত কমে যেতে থাকে। কিছু পত্রপত্রিকা নিয়মিত লিখতে থাকে জাদুবিদ্যা ও পতিতাবৃত্তিকে আশ্রয় করে বেলের ওপর প্রভাব খাটিয়ে রেখেছিল প্লেজেন্ট। যাবতীয় কুৎসা রটনা এবং বেলের স্ত্রীর প্রদত্ত মামলার ফলে একসময় সান ফ্রান্সিসকোর সেই জাঁকালো অট্টালিকা থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। যদিও তিনি ভবন নির্মাণে তার নিজস্ব অর্থ ব্যয়ের প্রমাণ দেখাতে পেরেছিলেন।

১৯০৪ সালে প্লেজেন্ট ৯০ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাকে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে কাটাতে হয়েছিল। আর শেষকালে দরিদ্রতাই ছিল তার বড় সঙ্গী। কুৎসা রটনা, গুজব, হিংসা, দালিলিক প্রমাণবিহীন ব্যবসা কীভাবে একজন মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে, মেরি অ্যালেন প্লেজেন্টের জীবনী হয়তো তাই শিখিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সমাজকে।

সূত্র- সিএনবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস

ওডি/এনএম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড