• রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বিমান দুর্ঘটনা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানানো ‘ব্ল্যাক বক্স’

  মো. সাইফুল ইসলাম

৩১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:৫৫
ব্ল্যাক বক্স
ব্ল্যাক বক্সে থাকা ককপিট ভয়েস রেকর্ডার মূলত ককপিটের শব্দ ধারণ করে (ছবি- ইন্টারনেট)

বিশ্বে মাঝে মাঝেই বিমান দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনার কারণ জানতে হলে যে বাক্সটি উদ্ধার করতে হয় সেটিই হচ্ছে ব্ল্যাক বক্স। এটিকে ব্ল্যাক বক্স বলা হলেও এভিয়েশন বা বিমান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ব্লাক বক্স বলেন না। তারা এটিকে ফ্লাইট রেকর্ডার বলেন।

ব্ল্যাক বক্স নামে পরিচিত হলেও এটি কিন্তু দেখতে কালো নয়। এটি দেখতে মূলত সানফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত ‘গোল্ডেন গেট সেতুর’ মতো। তবে গোল্ডেন গেট সেতুর বর্ণ গাঢ় কমলা বর্ণের হলেও ব্ল্যাক বক্সের রং উজ্জ্বল কমলা বর্ণের। বিমান দুর্ঘটনার পর এই বক্স পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে দ্রুত আলাদা করে দেখার জন্য এমন বর্ণ ব্যবহার করা হয়।

দেখতে কালো না হলেও ব্ল্যাক বা কালো বক্স বলার কারণটা এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হয় পূর্বে এটি কালো রংয়ের ছিল। আবার অনেকে মনে করেন দুর্ঘটনা, মৃত্যু ইত্যাদির সঙ্গে কালোর একটা সম্পর্ক রয়েছে বিধায় এমন নাম। এছাড়াও কেউ কেউ মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবিষ্কৃত যে কোনো ধাতব প্রযুক্তিকে কালো রং দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। আবার অনেকেই মনে করেন, অনেক সময় দুর্ঘটনার পর বক্সটি পুড়ে কালো হয়ে যাওয়ায় ব্ল্যাক বক্স বলা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার গবেষক ডেভিড ওয়ারেনের মাথায় প্রথম ব্ল্যাক বক্স তৈরির চিন্তা আসে। ওয়ারেনের বয়স যখন মাত্র ৯ বছর তখন ১৯৩৪ সালে বিমান দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা যান। গবেষক ওয়ারেন এরপর ১৯৫০ সালের দিকে চিন্তা করতে থাকেন যে বিমান ওড়ার তথ্য রেকর্ড করে রাখার কোনো যন্ত্র তৈরি করা যায় কি না। এই ভাবনা থেকেই তিনি ১৯৫৬ সালে ব্ল্যাক বক্স আবিষ্কার করেন। ১৯৬২ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি বিমানে পরীক্ষামূলকভাবে তার তৈরিকৃত যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়।

ব্ল্যাক বক্সে সাধারণত দুটি অংশ থাকে। একটি হচ্ছে ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) এবং অপরটি হচ্ছে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর)। যে কোনো ধরনের বিমানের ব্ল্যাক বক্স এ দুটির সমন্বয়ে গঠিত হয় এবং পিছনের দিকে রাখা হয়। পিছনে রাখার ফলে বিমান ধ্বংস হলেও ব্ল্যাক বক্সের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না।

শুধু পিছনে রেখেই ব্ল্যাক বক্সের ক্ষতি কমানো হয় না। এই ব্ল্যাক বক্স এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে বিমান ধ্বংস হলেও ব্ল্যাক বক্সের ক্ষতি না হয়। আবার ব্ল্যাক বক্স হারিয়ে গেলেও খুঁজে পাওয়া যাতে সহজ হয় তেমন কৌশলও থাকে। এমনকি গভীর সমুদ্রে তলিয়ে গেলেও যেন তা খুঁজে পাওয়া যায় সে ব্যবস্থা রাখা হয়। ২০০৯ সালে ধ্বংস হওয়া ‘এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট-৪৪৭’ এর ব্ল্যাক বক্স দুই বছর পর ১৩ হাজার ফুট গভীর লবণাক্ত ও ক্ষয়কারক পানির তলদেশে পাওয়া গিয়েছিল। যা থেকে বিমান দুর্ঘটনার কারণ বের করাও সম্ভব হয়েছিল।

পানির তলদেশে চলে গেলেও ব্ল্যাক বক্স যাতে সংকেত পাঠাতে পারে তেমন ব্যবস্থা করা থাকে এতে। সেন্সর পানির সংস্পর্শ পেলেই সংকেত পাঠাতে থাকে। এরপর ৪ কিলোমিটার গভীর সমুদ্রতলদেশ থেকেও প্রতি সেকেন্ডে একবার শব্দ প্রেরণ করে। ব্যাটারি অচল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এভাবে টানা ত্রিশ দিন শব্দ করে। মালয়েশিয়ার ‘এমএইচ-৩৭০’ বিমানের ব্ল্যাক বক্স এক মাস শব্দ করেছিল। সাধারণত ব্যবসায়িক বিমানগুলো ২০ হাজার ফুট গভীর থেকে সংকেত পাঠাতে পারে।

সমুদ্রের তলদেশে গেলেও সংকেত দেয় জানলাম কিন্তু আগুন ধরলে কী হবে ব্ল্যাক বক্সের সেটাও তো জানতে হবে। ব্ল্যাক টাইটেনিয়াম অথবা স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি করা হয় এই বাক্স। এর ভেতর থাকে মেমোরি বোর্ড বা স্মৃতিধারক। গবেষকরা ১ ঘণ্টা ধরে ১১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে পোড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তা পোড়া যায় না। এরপর তিন মিটার উচ্চতায় তুলে ২২৭ কেজি ওজনের সাথে বেঁধে একটি পিন সংযুক্ত করে ফেলে দেন। তারা দেখতে চান ছিদ্র হয় কি না। কিন্তু সেটি ছিদ্রও হয়নি।

মেমোরি অংশ পূর্বে ম্যাগনেটিক টেপ বা ফিতার তৈরি ছিল। যেটি টেপরেকর্ডারের মতো কাজ করে। তবে ১৯৯০ সালের পর থেকে বর্তমানের মেমোরি বোর্ড স্থাপন করা হয়। যা মেমোরি কার্ড বা হার্ড ডিস্কের মতো তথ্য ধারণ করে। মেমোরি বোর্ডটি অ্যালুমিনিয়ামের পাতলা পর্দা দ্বারা মোড়ানো থাকে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা থেকে রক্ষা করতে ১ ইঞ্চি পরিমাণ শুষ্ক সিলিকা ব্যবহার করা হয়।

ব্ল্যাক বক্সে থাকা ককপিট ভয়েস রেকর্ডার মূলত ককপিটের শব্দ ধারণ করে। সেখানে পাইলট ও যাত্রীদের কথোপকথন ধারণ হয়। তথ্য যেন হারিয়ে না যায় এজন্য মেমোরি কার্ডকে নিয়ে খুবই সতর্কতার সাথে কাজ করতে হয়। সাধারণত ককপিট ভয়েস রেকর্ডার বর্তমানে ১২০ মিনিট ভয়েস রেকর্ড করতে পারে। পূর্বের ব্ল্যাক বক্স মাত্র ৩০ মিনিট ভয়েস রেকর্ড করতে পারত।

আরও পড়ুন : ক্ষেপণাস্ত্র যেভাবে ধ্বংসাত্মক কাজ করে

ব্লাক বক্সে থাকা ফ্লাইট রেকর্ডার শত শত তথ্য ধারণ করতে পারে। এটি মূলত বিমান চলার পথ, উচ্চতা, বিমানের অবস্থান, গতি, মেশিনের তাপমাত্রা, পাখার অবস্থাসহ আরও অনেক তথ্যই ধারণ করে।

এক কথায় একটি বিমান কেন দুর্ঘটনায় পতিত হলো সেসব বিষয়ে নির্ভুল তথ্য পাওয়ার জন্য সকল ব্যবস্থা ব্ল্যাক বক্সে করা হয়েছে। কারণ একটি বিমান কেন ধ্বংস হলো তা জানা গবেষকদের জন্য ও নিরাপদ বিমান যাত্রা নিশ্চিত করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনাদের সবধরনের বিমান যাত্রা শুভ হোক এই কামনায় শেষ করছি।

সূত্র- এবিসি.নেট.এউ, ডিডব্লিউ.কম, হাউস্টাফ ওয়ার্কস ডট কম, বিবিসি

ওডি/এনএম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড