• রোববার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কার্ল স্মিট : মৃত্যুর পূর্বে নিজের অনুভূতি লিখেছিলেন যিনি

১৭ জানুয়ারি ২০২০, ১৭:৩৪
কার্ল প্যাটারসন স্মিট
কার্ল প্যাটারসন স্মিট; (ছবি- সংগৃহীত)

 কথিত আছে জাত সাপুড়েরও মৃত্যু হয় সাপের কামড়েই। যিনি নিয়মিত সাপ ধরেন, খেলা দেখান এমন সাপুড়ে, সাপের কবিরাজ এদের মৃত্যু হয় সাপের কাছেই। এমনকি যিনি সাপ লালন-পালন করেন তারও মৃত্যু হতে পারে সাপের কামড়েই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর বিশ্বে ৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন লোক সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়। যাদের মধ্যে অর্ধেকেই আক্রান্ত হয় বিষাক্ত সাপের কামড়ে। আবার বিষক্রিয়ায় প্রতি বছর ৮১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজার লোক মারা যায়। যদিও সাপের কামড়ের রোগীর সংখ্যার হিসাবটা পুরোপুরি সঠিকভাবে তুলে ধরা যায় না তথাপিও বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৭ লক্ষ লোক সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন। আর এদের মধ্যে ৬ হাজারের মতো লোক মারা যান।

এই যে এত সংখ্যক লোক সাপের কামড়ে মারা যান, তাদের কেউই কি নিজের মৃত্যুর কথাগুলো নিজেই কোনো পত্রিকা, ডায়েরি কিংবা কোনো জার্নালে লিখে গেছেন? চলুন জানা যাক এমন একজনের কথা যিনি সাপের কামড়ে মারা যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার সাথে ঘটা বিষয়গুলো লিখে গেছেন। আর তার এই লেখার উদ্দেশ্য ছিল সাপের কামড়ে রোগীর মাঝে কী ধরনের অনুভূতির উদ্রেক হয় তা তুলে ধরা।

বলছি আমেরিকার বিখ্যাত সরীসৃপ প্রাণিবিদ কার্ল প্যাটারসন স্মিটের কথা। স্মিট উভচর ও সরীসৃপ প্রাণী নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। তিনি নিউ ইয়র্কে ‘আমেরিকান ন্যাচারাল হিস্ট্রি জাদুঘরে’ কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে তিনি শিকাগোর জাদুঘরের উন্নয়নে কাজ করেন। সে সময় জাদুঘরের জন্য নমুনা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মধ্য আমেরিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেরিয়েছেন। তিনি আমেরিকার ইকথিওলোজিস্ট ও হার্পেটোলজিস্ট সোসাইটির সভাপতিও ছিলেন।

তার দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক পেশার জীবনে তিনি অসংখ্য বিষধর সাপ নাড়াচাড়া করেছেন। কিন্তু ১৯৫৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, দুর্ভাগ্যবশত সাপের কামড়েই তার মৃত্যু হয়। ড. স্মিট তার জীবন হয়তো বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু বিজ্ঞানের জন্য জীবন উৎসর্গ করার অভিপ্রায়ে তিনি কোনো চিকিৎসকের কাছে যাননি। এর পরিবর্তে তিনি তার মৃত্যুর সময়কার অনুভূতি তার মৃত্যুর ডায়েরিতে লিখে যান। তিনি বিজ্ঞানকে জানাতে চান সাপের কামড়ে রোগীর অবস্থা কেমন হয় সে বিষয়ে।

স্মিটকে যে সাপ কামড় দিয়েছিল সেটি ছিল আফ্রিকার ব্লুমস্লাং সাপ। Dispholidus typus হচ্ছে বিষধর এই সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম। এই সাপটির পরিচয় জানার জন্য তা স্মিটের কাছে পাঠিয়েছিলেন শিকাগোর লিংকন পার্ক চিড়িয়াখানার পরিচালক রবার্ট ইনগার। নতুন নতুন সাপ নিয়ে অদম্য কৌতূহল কাজ করায় অনেকটা অসাবধানতায় স্মিট তার সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সাপটি নাড়াচাড়া করছিলেন। হঠাৎ সাপটি তার বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে তীক্ষ্ণ বিষদাঁত বসিয়ে দেয়।

কার্ল স্মিটসহ তৎকালীন অনেক সরীসৃপ প্রাণিবিদরা ব্লুমস্লাং সাপকে বিষাক্ত মনে করতেন না। তাই সাপের দংশনের পর বিকালে কার্ল স্মিট ট্রেনযোগে নিজের বাসায় চলে যান। এরপর বসে পড়েন তার সাথে চলমান ঘটনাপ্রবাহ লিপিবদ্ধের কাজে। তিনি লেখন– 

কামড়ের পর থেকে প্রথম ঘণ্টায় তার বমিবমি ভাব হয় কিন্তু বমি হয় না।

দ্বিতীয় ঘণ্টা থেকে শরীর শীতল হয় ও তার কাঁপুনি ধরে। কাঁপুনি ছেড়ে গেলে জ্বর আসে। মুখের মিউকাস বা শ্লেষ্মা ঝিল্লি বিশেষত মাড়ি থেকে রক্তপাত হতে থাকে।

কামড়ের তিন থেকে চার ঘণ্টা পর তিনি দুধ দিয়ে দুই টুকরো টোস্ট খান।

রাত নয়টার দিকে ঘুমিয়ে পড়েন এবং ১২টা ২০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে প্রস্রাবের জন্য যান। তার প্রস্রাবের সাথে হালকা রক্ত আসতে থাকে। তিনি এক গ্লাস পানি পান করে ঘুমিয়ে যান এবং ভোর সাড়ে চারটায় ওঠেন। সে সময় মারাত্মক বমি বমি ভাব হয় ও বমি করেন। তিনি দেখেন রাতের খাবারগুলো হজম না হয়েই বমির সাথে বেরিয়ে আসে। এরপর কিছুটা আরামবোধ করলে ঘুমিয়ে যান ও সকাল সাড়ে ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠেন।

সকালে তিনি প্রতিদিনের মতো কিছুটা হাঁটাহাঁটিও করেন। এরপর পুনরায় লেখা শুরু করেন। তিনি লেখেন সকাল সাড়ে ছয়টার তার শরীরের তাপমাত্রা দাঁড়ায় ৯৮ দশমিক ২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এরপর ডিম, দানাদার খাবার, আপেল, কফি ইত্যাদি দ্বারা সকালের নাস্তা করেন। সে সময় রক্তযুক্ত প্রস্রাব বন্ধ হয়। কিন্তু মুখ থেকে তখনও হালকা রক্তপাত হতে থাকে।

আরও পড়ুন- অন্যের বিষ চুরি করে বিষাক্ত হয় যে সাপ!

দুপুরে খাবারের পর থেকে স্মিটের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। তিনি তার স্ত্রীকে ডাকেন। এরপর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন। এছাড়াও অচেতন হয়ে পড়েন ও তার সাড়া দেওয়া বন্ধ হয়। এভাবেই বিকেল তিনটার দিকে তিনি মারা যান। তার ময়নাতদন্ত রিপোর্টে খুবই ভয়াবহ অবস্থা দেখা যায়। জানা যায় তার শরীরের অভ্যন্তরে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল।

কার্ল প্যাটারসন স্মিট ২০ শতকের অন্যতম একজন সরীসৃপ প্রাণিবিদ ছিলেন। তিনি ২০০র অধিক প্রজাতির নামকরণ করেন। এছাড়াও সরীসৃপ প্রাণিবিদ্যার ওপর তিনি ১৫ হাজারের অধিক শিরোনাম যুক্ত করে গঠন করেছিলেন ‘কার্ল প্যাটারসন স্মিট স্মৃতি সরীসৃপ প্রাণিবিদ্যা লাইব্রেরি’। তবে তার দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর অনেক সমালোচকই মনে করেন স্মিট হয়তো আগেই জানতেন তিনি তার জীবন বাঁচাতে পারবেন না। কারণ সে সময় ব্লুমস্লাং সাপের বিষের জন্য নির্দিষ্ট কোনো এন্টি-ভেনম ছিল বলে জানা যায় না। 

সমালোচকরা যাই বলুক, স্মিটের মতো বিখ্যাত একজন সরীসৃপ প্রাণিবিদের বিজ্ঞানের জন্য জীবন উৎসর্গ করাকে ছোট করে দেখা যায় না।

সূত্র- অ্যামিউজিং প্লানেট, ইন্ডিয়া টুডে, ইনডিপেনডেন্ট.কো.ইউকে

ওডি/এনএম 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড