• বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

শিল্পের ক্যানভাসে ভিন্ন আঁচড় কাটা এক শিল্পী

  নিশীতা মিতু

০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:২২
ছবি
ছবি : প্রখ্যাত চিত্রকর মুস্তফা মনোয়ার

৯০’র দশকের শিশুরা বিটিভির সামনে মনোযোগ দিয়ে যে ক’টি অনুষ্ঠান দেখতে বসতো তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘মনের কথা’। পারুল নামের একটি মেয়ে পুতুল হাত পা নেড়ে গান গাইত, অজানা জানাত। তার সঙ্গী থাকতো একজন শুভ্র হাসির শিল্পী। যিনি ক্যানভাসে আঁচড় এঁকে শেখাতেন কিভাবে ছবি আঁকতে হয়। যিনি জানাতেন দেশ, শিল্প নিয়ে অনেক অজানা কথা। পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে দেখা যেত একজন বাউল ও একটি গরুকে।

মনের কথা অনুষ্ঠানে শিল্পী ছাড়া সবাই হাতে বানানো পুতুল। তবে সেই পুতুলকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন যিনি তিনি হলেন শিল্পী স্বয়ং নিজেই। ৯০’র দশকের শিশুদের শৈশবকে বর্ণিল করা এই শিল্পী হলেন মুস্তাফা মনোয়ার। কলকাতা আর্ট কলেজের কৃতি ছাত্র মুস্তাফা মনোয়ার চিত্রকলায় যেমন পারদর্শী ছিলেন, তেমনই পারদর্শী ছিলেন সঙ্গীতে। পুরো জীবনই তিনি পার করছেন ভিন্ন চিন্তায়, ভিন্ন সৃজনে।

১৯৩৫ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার অন্তর্ভুক্ত মনোহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তফা মনোয়ার। মা জামিলা খাতুনকে হারিয়েছেন খুব ছোট বয়সেই। বাবা গোলাম মোস্তফা ছিলেন কবি। শৈশব, কৈশোর পুরোটা জুড়ে বাংলার প্রকৃতির সজীবতাকে গ্রহণ করেছেন তিনি ভালোবেসে। বড় হয়ে শিল্পী হওয়ার ইচ্ছা থাকায় তার শিল্পীমন খুঁজে নিতে থাকল সবুজ শস্যক্ষেত, প্রকৃতি, নদীর মায়া আর সে সঙ্গে কৈশোরের দুরন্তপনা।

বাবা গোলাম মোস্তফা পেশায় ছিলেন শিক্ষক। তাই শিক্ষকতার সূত্রে নানা জায়গায় থাকতে হয়েছে তাকে। বাবার সঙ্গে ছেলেও ঘুরেছে সবখানে। মুস্তাফা মনোয়ারের শিক্ষাজীবনের শুরু কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে। এই স্কুলে পড়ার সময় তিনি বাবা ও বড় ভাইয়ের কাছ থেকে সংগীতের তালিম নেন। পরবর্তীকালে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নতুন করে আবার সংগীতে মনোযোগী হন। তালিম নেন ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য ওস্তাদ সন্তোষ রায়ের কাছে।

মুস্তাফা মনোয়ারের আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে দারুণ একটি গল্প। নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি ভর্তি হন সায়েন্সে, কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে। ভর্তি হলেন সায়েন্সে, অথচ অঙ্কে ভীষণ কাঁচা। পাশের ফ্ল্যাটেই থাকতেন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি প্রায়শই মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি দেখে প্রশংসা করতেন।

তিনি কলকাতা আর্ট কলেজে নিয়ে গেলেন, সঙ্গে বড় ভাবী। শিল্পচার্য রমেন চক্রবর্তী ছবি দেখে খুশি হয়ে তাঁর ভর্তির ব্যবস্থা করলেন। এখানে তিনি দারুণ কৃতিত্ব দেখান, ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টস-এ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।

চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন মুস্তফা মনোয়ার। সেটিও হয় জয়নুল আবেদিনের অনুরোধে। ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত থাকার পর দেশে নতুন এক গণমাধ্যমের সূচনা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন ১৯৬৪ সালে যাত্রা করলে, সেখান থেকে অনুরোধ করা হয় তাঁকে যোগদানের। তিনি সানন্দে এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন। স্টেশন প্রডিউসার হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীসময়ে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও পাপেট প্রদর্শনের পথপ্রদর্শক মুস্তফা মনোয়ার। কৈশোরে দেখা পুতুল নাচ নতুনরূপে ধরা দেয় তার তৈরি পাপেটে। ছাত্র থাকাকালীন এ বিষয়ে তিনি বিস্তর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। তখন তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেন। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনে কাজ করার সুবাদে পাপেট প্রদর্শনের বিরাট এক ক্ষেত্র পেয়ে গেলেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ নামে দুই চরিত্রের জন্ম দেন, শুরু করেন পাপেটের প্রদর্শনী। এ প্রর্দশনী বা আয়োজন বহু বছর দর্শকদের মনে থেকে গেছে।

কেবল ‘আজব দেশে’ নয়, ‘মনের কথা’, ‘মীনা কার্টুন’, ‘নতুন কুঁড়ি’সহ আরও অনেক অনুষ্ঠানে পরিকল্পক হিসবে অনন্য অবদান রাখেন তিনি।

মুস্তফা মনোয়ার ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে সারা জীবনভর অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। পুরো বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ, দেশের প্রকৃতি আর ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন নিজের মতো করে। তার বানানো পাপেটগুলোতে স্থান পায় বাউল, গরু, শামুকভাঙা, চেগাপাখি, পানকৌড়ি, হাঁস, লম্বা গলার বক আরও অনেককিছু।

আমাদের দেখা আর ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করে দিয়েছেন যে মানুষটি তিনি মুস্তফা মনোয়ার। এখনো যিনি কাজ করে যাচ্ছেন নিভৃতে। ৮৩ পেরোনো এই সৃজনশীল মানুষটি হোক দীর্ঘজীবী, আমাদের দিয়ে যাক আরও কিছু।

jachai
nite
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
jachai

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড