• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

সাক্ষাৎকার

একজন সাধকের আত্মকথন

  বঙ্গ রাখাল

০৯ আগস্ট ২০১৯, ১৪:২৬
ছবি
ছবি : সাইদুর রহমান বয়াতি

যে মানুষটাকে বারবার ফোন করলেই কোন কারণ না দর্শীয়ে (মানিকগঞ্জ থেকে সাভার) আমার বাসায় এসে হাজির হতেন এবং নিজে কঠোর শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে লোকসাহিত্য সম্পর্কে নানা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে পাঠের মাধ্যমে সত্য এবং সঠিক পথটিকেই দেখিয়ে দিতেন। কেননা, লোকসঙ্গীতের নানা অসংগতি রয়েছে যে গুলো সম্পর্কে আজ অবধি কোন আলোচনা হয়নি যা আলোচনা হওয়া  খুবই দরকারি বলে তিনি মনে করেন। তিনি নিজেই তো একজন লোকসাহিত্যের ভান্ডারস্বরূপ পালাকার, অভিনেতা, যাত্রাশিল্পী, গীত রচয়িতা, সুরকার, নাট্যকার। প্রিয় পাঠক আপনাদের বুঝতে হয়তো বাকি নেই আমি বলছি- ‘মাটির খাচায় নূরের পাখি বিরাজ করে দুনিয়ায়’ এ বিখ্যাত গানটির রচয়িতা সাইদুর রহমান বয়াতির কথা। 

যিনি অত্যন্ত আত্মসচেতন ভাবে এ আধ্যাত্মিক গানগুলো রচনা করে থাকেন। আমরা দেখেছি সাইদুর রহমানের পূর্ববর্তী লোককবি, দার্শনিক কবি, দেহবাদীকবি, তান্ত্রিক কবি যা কিছুই লালন সাঁইজিকে বলি না কেন, তার তুলনা তিনি নিজেই। তিনি রচনা করেছিলেন ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’। এ দেহবাদী গান তখনকার মানুষদের নানা ভাবে ভাবতাড়িত করেছিল- কেননা, কেউ ভাবতেও পারে নি যে, কিভাবে এ চিরন্তন সত্য কথাকে উচ্চারণ করা যায়। কিন্তু লালন সাঁইজি সেই সাহস তার গানের মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন। তারই পরবর্তীসূরী হয়ে সাইদুর রহমান ও একই কথা ভিন্ন ভাবে উচ্চারণ করলেন, ‘মাটির খাচায় নূরের পাখি বিরাজ করে দুনিয়ায়’। রূহ, জান, প্রাণ বা আত্মা যা কিছুই আমরা বলি না কেন, এটাকে লালন বললেন ‘অচিন পাখি’ কিন্তু সাইদুর রহমান বয়াতী বললেন ‘নূরের পাখি’। দু’জন সাধকই একই কথা বলছেন কিন্তু বোঝানোর ক্ষেত্রে বা একই বিষয়কে বোঝানোর জন্য ভিন্নতার আশ্রয় নিয়েছেন।

সাইদুর রহমান বয়াতি তার দীর্ঘসাধনার জীবন ধরেই তিনি অন্বেষণ করে চলেছেন আপন আত্মাকে যে তাকে সন্ধান দিবে পরমপুরুষের। তাই তো জীবনভর তিনি স্বপ্ন বুনেছেন। নতুন নতুন গান রচনা করে জীবজগতের সেরা মানুষ ভজনায়। রচনা করে চলেছেন আত্ম শক্তি আর আত্মতৃপ্তির বহুগান। যে গানে গানে তালাশ করেছেন বীর্যরূপি ঈশ্বরকে, যে নিজেই পরম শক্তি পুরুষ হিসেবে বান্দার দেহের মধ্যেই বিরাজ করে। এ বীর্যই মানবের পরম শক্তি। বয়াতি ব্যক্তিজীবনে দারিদ্রের মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন এবং অর্থের অভাব তাড়িত হয়ে ছেড়েছেন বই খাতার মমতা। ঘুরে ফিরেছেন সাধক, সন্ন্যাসী, পরম পুরুষের পিছু পিছু। সেখান থেকে অর্জন করেছেন দেহ সাধনের চরমশিক্ষা। যা তাকে সুফি সাধক সাইদুর হতে পরবর্তীতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। এ পোড় খাওয়া হাজারো অভিজ্ঞতার নানা বর্ণনা মেলে তার গানে। এ জীবন অভিজ্ঞতায় তার তাত্ত্বিক গানের মূল সঞ্জীবনী শক্তি। বর্তমান এ ৮৪ বছরের দীর্ঘজীবন ভরেই নিয়েছেন তত্ত্বের সাধনা। তার তত্ত্বসাধনার গুরু রাধাবল্লব সরকার, চট্রগ্রামের রামানন্দ সন্ন্যাস। এ সাধনার বীজমন্ত্র মিশে আছে তার অস্থিমজ্জার সাথে যা কি না তাকে নিজেকে জানতে সম্মোহনী সেতুবন্ধনের দায়িত্ব পালন করে। তিনি বাস্তব জীবনের নানাবিধ সমস্যা আর জটিলতার গিট ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছেন একজন আধ্যাত্মিক শক্তির সুফিসাধক যা কি না তার সঙ্গীত সাধনায় নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে এবং একজন দেহবাদী শিল্পী হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। এ দেহবাদী সাধনায় তাকে নতুন করে শুদ্ধ পুরুষ হিসেবে পরিচালিত করে তোলে। তাকে আমরা যা কিছুই বলিনা কেন, তিনি একজন প্রান্তিক কৃষিজীবী, তার হালের চাষেই ফলে আউশ-আমনের ধান। কাঁদা জলের বুক চিরে এসে আমাদের চিনিয়ে দেয় শ্যামলীময়, দোদুল্যমান অনাবিল স্নিগ্ধসকাল।

সাইদুর রহমান বয়াতি কামকে রক্ষা করে পেতে চেয়েছেন প্রেম। যে প্রেম তাকে সন্ধান দিবে পরমপুরুষের। এ প্রেমরূপি মুর্শিদই তো তাকে সন্ধান দিবে পরমপুরূষের জানিয়ে দিবে অন্তর্নিহিত গূঢ়ার্থ। যে মনের মানুষকে পাওয়ার জন্য তার মন সর্বদা ব্যথিব্যস্ত। তিনি মিশে যেতে চেয়েছন পরমপুরূষের সাথে যে পুরুষ তাকে পার করে দিবে সত্যের ঘাটে। তাইতো তার সাথে মিলন বাসনার স্বাদ তার সারাজীবনের। আল্লাহ, ঈশ্বর, গড, পপ, আমরা যা কিছুই বলি না কেন, তিনি তো আসমানে থাকেন না, তিনি তো বিরাজ করেন বান্দার অন্তরে। ভগবান বাস করেন ভক্তের হৃদয়ে। এ বয়াতি গান সাধনার মধ্য দিয়েই তো তালাশ করেছেন জ্ঞানদাতাকে, যে তাকে সম্পূর্ণ এবং একজন পরিপূর্ণ সাধন পুরুষ হিসেবে পরিচিত করে তুলবে। 

তিনি সাধনা করেছেন- সৃষ্টিতত্ত্ব, কারতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, যৌনতত্ত্ব, লোকতত্ত্ব  ইত্যাদি বিষয়াদির উপর যা তাকে একজন সুফিসাধন হিসাবে পরিচিত করে দেয়। এজন্য আমাদের ও বলতে দ্বিধা নেই যে তিনি একজন আধ্যাতিক সুফিপীর। যে তাঁর হাজার হাজার শিষ্যদের সত্য ন্যায় ও সাম্যের পথ বাতলে দিচ্ছেন। সে সব গুণ তাকে একজন পরমপুরুষ রুপি সাধক হিসেবেও পরিচিত করে তোলে। তাঁর অন্তর প্রেম তাকে অভেদরূপে চিনিয়ে দেয় আকুন্ঠ অন্তরের গূহ্যসাধনের পথ। প্রেম ক্ষনস্থায়ী নয়, এ প্রেমকে আশ্রয় করেই তো মানুষ পাড়ি দেয়- অনাস্বাদিত চিরন্তন সাধনের পথ। তাইতো বলতে হয়, সাইদুর রহমান বয়াতি সেই প্রেমের পথ ধরেই সাধনা করছেন বীর্য ঈশ্বরের। যে শক্তির মধ্যে নিহিত বিশ্বসৃজনের গূঢ় রহস্য। সাইদুর রহমান বয়াতির সাধনা আত্ম দর্শন, সাধনার জীবন, অভিনয় জীবন, সংগ্রামী জীবন, এক কথায় তার জীবনের সাথে মিশে থাকা সাধনায় জীবন যাপনের পরিপূর্ণ পরিচিতি উঠে এসেছে তার সাথে বিভিন্ন সময়ের আলাপচারিতায়।

বঙ্গ রাখাল : সাইদ ভাই কখনো কি লোকনাটক করেছেন?

সাইদুর রহমান বয়াতি : কত্তো। নিজে লোকনাটক করতাম এবং নিজেও অনেক লোকনাটক রচনা করেছি। যেমন: গাজীযাত্রা, মুল্লকচাঁন যাত্রা, ঈমামযাত্রা, আসমানসিংহের ফাঁসি, দূত মেহের সুরজ জামান, ছোট মা, দস্যু রানী ফুলনদেবী, নির্যাতন ইত্যাদি। এগুলো মঞ্চেও পরিবেশিত হয়েছে এবং প্রশংসাও পেয়েছে প্রচুর।

বঙ্গ রাখাল : সাইদ ভাই, বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত সম্পর্কে জানতে চাই।

সাইদুর রহমান বয়াতি : বাংলাদেশে তো বিভিন্ন লোকসঙ্গীতের প্রচলন রয়েছে। কোনটা নিয়ে বলবো?

বঙ্গ রাখাল : সবগুলোই আপনি একটু ধারাবাহিকভাবে বলেন।

সাইদুর রহমান বয়াতি : জারিগান, এটি একটা বিষয় ভিত্তিক লম্বা সময় ব্যাপ্তি, এর সুর, তাল, বাচনভঙ্গি, লয় আলাদা ধরনের হয়ে থাকে। আমি নিজেও অনেক জারি গান রচনা করেছি এবং বিভিন্ন জায়গায় তা পরিবেশন করেছি। যেমন- খদগীরি (খদ শব্দের অর্থ চিঠি), গঙ্গীনামা (গঙ্গী বলতে গঙ্গাদেবী), মক্কানামা (জন্মবৃত্তান্ত মূলক), ইসমাইল কুরবানী, আইয়ুব নবী, মনসুর হাল্লাজ ইত্যাদি।

সারিগান, সারিবদ্ধ বিশেষ এক ধরনের গান, এ গান শুধুমাত্র বর্ষাকালীন নৌকা বাইচের সময় গাওয়া হয়। তৎকালীন যুগে বিশেষ এক ধরনের শৌখিন নৌকা নিয়ে বাইচ করার সময় এ গান গীত গাওয়া হয়। যেমন- 
সাজাইয়া দেও মা,
গোপাল যদি না যায় গোষ্ঠে
আমরা যাবো না।

উন্নিগান, অন্ন অর্থ ভাত থেকে উন্নি গানের উৎপত্তি। গ্রামের কতগুলো যুবক ছেলেরা মিলিত হয়ে পৌষ মাসে বাড়ি বাড়ি রাতে যেয়ে চাউল এবং টাকা সংগ্রহ করে  (পৌষ-মাঘ) মাসে জমা করে বিশেষ এক বাড়িতে জমা রাখে এবং মাঘ সংক্রান্তির রাতে সিন্নি করার সময় যে গান পরিবেশিত হয় তাকেই উন্নিগান বলে।
আয়রে রাখাল গণ ছল্লোরী* খেলায়
ছল্লোরী খেলায় বা তুমি বাপের বাড়ি যাবো আমি
শামচি কন কালার বাশিরে।                 
মাদার বাঁশ, মাদার বাঁশ এক ধরনের পীর বা দেবতা এ নামের উপরে একটা তরিকা আছে যার নাম ‘মাদারীয়া তরিকা’। এ মাদারী তরিকায় অনুসারিদের বলা হয়। মাদার বাঁশ এক ধরনের পীর বা দেবতা, এ নামের উপর একটা তরিকা আছে যার নাম ‘মাদারীয়া তরিকা’। এ মাদারীয় তরিকায় অনুসারিদের বলা হয় মাদাইরা ফকির। এ গান বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময় পরিবেশন করা হয়। যেমন: নুরুল্লাহপুর মাঘীপূর্ণিমায়, মানিকগঞ্জের কৃষ্ণনগর ছমির দেওয়ান বাড়িতে পৌষসংক্রান্তিতে হয়।
পাঁচ পীরের মাজার বলতে আমরা পাঁচজন পীরকে বুঝে থাকি।
                               ১। গাজী
                               ২। কালু
                               ৩। গঙ্গী
                               ৪। মাদার
                               ৫। মানিক পীর
যে খানে গঙ্গীর মাজার থাকবে সেখানে মাদারের আসন থাকবে এবং যে বাড়িতে মাদারের আসন আছে সেখানে গাজীর আসনও আছে। এ আসনকে বলা হয় পঞ্চপীরের আসন।

এ মাদারের গানের সময় বয়াতি, দোহাররা ঢোল, সানাই, কাসা বাদ্যবাজায় এবং নাচ পরিবেশন করে। এ সময় মাদারের গান ব্যতিত অন্য কোন গান পরিবেশন করা যাবে না।
যেমন: মুখে মাদার মাদার বল সবে
মাদার মস্ত পীর
দেলকোরআন খুলে দেখো
মাদার সেই ফকির
মুখে মাদার মাদার 

বঙ্গ রাখাল : গাজীর গান সম্পর্কে জানতে চাই।

সাইদুর রহমান বয়াতি : গাজীর গান হচ্ছে-লোক কিচ্ছা কাহিনি। গানের সুরে নানাবিধ ঢঙ্গে সুর দিয়ে লোক কিচ্ছা কাহিনি গাওয়া হয়। মাঝে মাঝে কিংবন্তি হিসাবে এই গানে গাজীর মহৎ কথা উল্লেখ করা হয়।
যেমন, গোলে বাকাওয়ালির পালা।
বাকাওয়ালির বাগানে বাকাওয়ালির ফুল
পাহারায় রক্ষিত আছে ষাট হাজার দেও মুর্শিক ইদুর (এরা মাটির নিচে পাহারারত)
বাগানের উপরে পাহারারত আছে ষাট হাজার পরী
এবং মৃত্তিকার উপরে আছে ২০ হাজার দেও দারোয়ান হিসেবে।

জামাল যখন বাকাওলির ফুল চুরি করে নিয়ে আসে তখন যে একটা বিবাদের সৃষ্টি হয় সেই বিবাদ মিটাবার  জন্য ভক্তের ডাকে জিন্দাপীর গাজীর আবির্ভাব হয় এবং ভক্তের বিবাদ মিটিয়ে তার মনস্কামনা মিটিয়ে দেন। এজন্যই তো এর নাম গাজীর গান।গাজীর গান ২ ভাগে বিভক্ত। এ গান উন্নি গানের মত নেচে, গেয়ে গাওয়া হয় এবং অন্যটি পালা। যাকে আমরা গাজীর পালা বলে থাকি। গাজীর গানে কতগুলো পালা আছে। সে সব পালা হলো- কালুগাজীর পালা, মানিকমাঝির পালা, জামাল-কামাল এর পালা, লালচাঁদ বাদশাহ্র পালা, নিজাম বাদশার পালা, মানিক সাধুর পালা, গুলে বাকাওয়ালির পালা, ইয়াকুব নবীর পালা, হেমবেক কেমবেচের পালা, ছয়ফুল মুল্লক বদিউজ্জামানের পালা  ইত্যাদি।

বঙ্গ রাখাল : সাইদ ভাই রাখালিয়া গান বলতে আসলে কি গানকে বোঝায়।

সাইদুর রহমান বয়াতি : রাখাল থেকে রাখালি গানের উৎপত্তি। কতগুলো রাখাল মিলিত হয়ে যে গান করে মূলত সেটাই রাখালি গান। গোষ্ঠ গান বা রাখালি গান একই গান -
এলাম সব রাখাল গণ
তোরে নিতে ওরে কানাই ভাই
নেচে নেচে আয়রে কানাই
তোরে নিয়ে আমরা গোষ্ঠে যাই
গোষ্ঠে গিয়ে করব খেলা
জুড়াইব মনের জ্বালা
তুই যাবি কিনা যাবি রে গোষ্ঠে
বল না কানাই
কাল গিয়েছিলাম গোচারনে
আছে নি তোর মনে...
কানাই হল দলের নেতা। খেলার নায়ক। গানের ভাবার্থ হলো এখানে কানাই হচ্ছে স্রষ্টা বা গুরুদেব।

বঙ্গ রাখাল : আরো কিছু গান সম্পর্কে বলুন-

সাইদুর রহমান বয়াতি : ভাটিয়ালি গান, ভাটিয়াল শব্দের অর্থ নৌকা যোগে নদীর ভাটির দিকে চলা এবং মাঝিরা আপন মনের আনন্দে যে গান করে সেটাই ভাটিয়ালি গান। এ গানে বিরহের ছাপটা খুব বেশি থাকে (বিরহ ব্যতিত কোন গান নায়)।
যেমন: মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে
আমি আর বাইতে পারলাম না।

কবিগান, কবি গানের অর্থ ছন্দ। এর প্রতিটি কথায় ছন্দে বলা হয়। কথায় বলে-হাত কবি, চোখ কবি, মুখ কবি, যা কবি তাই কবি, না পারবিতে থুবি। কবিগানের কথা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন, সহজ, সরল। এ কবিগান শুদ্ধভাষায় পরিবেশন করা হয়। আসরে দাঁড়িয়ে তৎক্ষনাত, উপস্থিত বুদ্ধিবলে এ গান রচিত হয়। এ গান সব ধর্মের সমন্বয়ে রচিত বা গীত হয়ে থাকে। এ গানে দুইটা পক্ষ থাকে। বিপক্ষ  সরকারেরও উপস্থিত বুদ্ধিবলে উত্তর দিতে হয়। কবিগানের বিষয় আসর সম্পর্কে আগেই জানতে হয় এবং এই সম্পর্কে বই পুস্তক পাঠ করতে হয়। এগানে একজন প্রশ্নের পক্ষে এবং অন্যজন জবাবের পক্ষে থাকে। এগানে আবার দোহারও থাকে। একটি কবি গান হলো-
আমি গীতিকাব্যে সাজলাম ভক্ত
তুমি পন্ডিত গোঁসাই
বুঝাইয়া বল আমাকে
বাংলা একাডেমীর কি অর্থ থাকে
এর সত্য তথ্য সব বল গোসাই...

মুর্শিদীগান বা ভাব গান, নিজেদের পীরের উপরে ভক্তি শ্রদ্ধা রেখে যে গান গীত হয় তাই মুর্শিদি গান। এ গানকে আবার ভাব গান ও বলা হয়। এ গান গুরু শিষ্য বিষয়ক গান। একটি মুর্শিদি গান হলো:

তুমি বিনে কে আর আছে রে মুর্শিদ তুমি বিনে
নাইক মাতা, নাইক পিতা, ও মুর্শিদ নাই মোর জোড়ের ভাই.......

তর্জাগান, তর্জাগান বিচার গানের মত। এ গানেও বিচার বিবেচনা করা হয় তবে বিচার গানের মত এত আড়ম্বর করে গাওয়া হয় না। তর্জাগানও এক ধরনের পাল্লা গান।

বিচারগান, বিচার কথাটাইতো সুন্দর। বিচার শব্দের অর্থ বিবেচনা করা, বিশ্লেষণ করা। বিচার গান এমনই এক ধরনের গান- যে গান গুলো বিচার বিশ্লেষণ করেই পরিবেশন করা হয় এবং সুন্দর ভাবে শ্রবন করতে হয়, অনুধাবন করতে হয়। এ বিচার গানের মূলকথা এ গানেই এর প্রশ্ন আবার এ গানেই এর জবাব। শরিয়ত-মারফত, মেয়ে-পুরুষ, জীব-পরম, আদম-শয়তান, কেয়ামত-হাশর, শহর-পল্লী, ছনের ঘর-দালান, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিচার গান গাওয়া হয়।

বঙ্গ রাখাল : বাউল গান কি বা এর উৎপত্তি কিভাবে বা এর মূল কথাই বা কি?

সাইদুর রহমান বয়াতি : বাউলের বেশ ধরলেই বাউল হওয়া যায় না বা আমরা তাকে বাউল বলতে পারি না। অনেক সময় আমরা অনেককে বাজান বলি এটাও বলা উচিৎ না। কেননা, বাজান অর্থ জন্মদাতা। বাজান- বীর্যপুতকে বাজান বলা হয়। তাহলে আপনিই বোঝেন আমরা কি যাকে তাকে বাজান বলতে পারি? আর বাউল শব্দের অর্থ বাউ (বায়ু) বা বাতাস, উল অর্থ সন্ধান করা। বায়ুতত্ত্ব জানার জন্য যিনি সর্বদা ব্যথিব্যস্ত থাকেন তাকেই আমরা বলতে পারি বাউল। এ বাতাসটাই পরম সত্তার একটা অংশ। মানব দেহ থেকেই এ বাতাসটা আসা-যাওয়া করে। মানব দেহে নাসিকা পথে যে বাতাস আসা-যাওয়া করে তার পরিধি হচ্ছে দশ আঙ্গুল এবং ব্যাস হচ্ছে বারো আঙ্গুল। প্রতিদিন বারো ঘন্টায় মানুষ একুশ হাজার ছয়শ বার বাঁচে এবং মারা যায়। বাউল, বৈষ্ণব, সূফি সাধনায় আত্মসংযমের অর্থ বীর্যধারন ও অটল থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। এ মানব দেহের বীর্যই তাদের পরম শক্তি বা ঈশ্বর। কঠোর সাধনার মধ্যে দিয়ে এ পরম ঈশ্বর বা শক্তিকে রক্ষা করতে হয়। বীর্য বা এ বীজ রক্ষা করতে পারলেই মানবাত্মা মুক্তি পেয়ে পরমআত্মার সঙ্গে মিশতে পারবে। এ বীর্য সম্পর্কে আমার গুরুর একটা গান আছে -
বীর্যায়ন: ব্রক্ষায়ন:
বীর্য পাতনং ও মরণ:
বীর্য ধারনং ও বাঁচন:
বীর্যরুপে ব্রক্ষা
যে বীর্য পাত করে
সে মরে
বীর্যকে যে ধরে রাখতে পারে
সে জন অমর।

বঙ্গ রাখাল : ভাই, এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, আপনার কয় ছেলে মেয়ে?

সাইদুর রহমান বয়াতি : তিন ছেলে এক মেয়ে।

বঙ্গ রাখাল : আপনি বেতারে গান করেছেন কবে থেকে।

সাইদুর রহমান বয়াতি : পাকিস্থান আমল থেকে।

বঙ্গ রাখাল : জীবন-মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাই।

সাইদুর রহমান বয়াতি : মানুষের জীবন মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন বিধানে বিভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে। মানুষ যে মরে তা আমরা চোখেই দেখি। কিন্তু যারা বিভিন্ন তত্ত্ব নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে তারা বুঝতে পারে যে মানুষের মরন নাই। মানুষের পাঁচটি উপাদানের সমন্বয়ে এই দেহ খানি গঠিত- মাটি, পানি, আগুন, হাওয়া ও পরমসত্ত্বা। যতদিন এগুলো সতেজ থাকে ততদিন পরমসত্ত্বাও দেহে জীবিত ও সজিব থাকে। দেহ জরাজীর্ণ হওয়ার পর মানবআত্মা দেহ পরিবর্তন করে। ইসলামি মতানুযায়ী পরমসত্ত্বা পরমের সঙ্গে মিশে যায়। আর চারটি উপাদান মাটি মাটির সাথে, পানি পানির সাথে, আগুন আগুনের সাথে এবং হাওয়া হাওয়ার সাথে মিশে যায়। কোন জিনিসই মরে না বা কোন কিছুর মৃত্যু নাই। কোরআনে বলা হয়েছে ইন্না-লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হে রাজিউন অর্থাৎ যেখান থেকে যে বস্তু এসেছে সে বস্তু সেখানে ফিরে যায়। এভাবেই মানুষের পরিবর্তন হয়। যেমন: কার তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষ এক কার থেকে অন্য কারে পরিবর্তিত হয়। প্রত্যেক সাধকই এ কথা মেনে চলেন যে মানুষের মরণ নাই। পরকাল বলে কিছু নেই। শান্তি সুখ, বেহেস্ত, দোযখ সবই এখানে। 

সুফি- দরবেশদের মতে মৃত্যুর পর মানুষের এই পৃথিবীতে আর পুনর্জন্ম হবে না। বাউল, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ ও হিন্দু মতে যে আত্মা মুক্তি পাবে না, কর্মফল ভোগ করার জন্য সে আত্মা পুনরায় জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে আসবে। সুফি-দরবেশদের মতে মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা দুটি জায়গায় অবস্থান করবে। ইল্লিন ও সিজ্জিন। ইল্লিন হচ্ছে শান্তির জায়গা আর সিজ্জিন হচ্ছে দুঃখের জায়গা। কিন্তু এ দেহটা থাকবে না। এই দেহটা একটা ভান্ডস্বরুপ। কি ভান্ড এটি? সেই পরমসত্ত্বার ভান্ড। পরমসত্ত্বায় আত্মরুপে প্রতিটি জীবের মধ্যেই আছে। মানুষ একটা জীবন। মানুষের ভিতর যে বস্তুটা আছে সেটি অন্য কোন প্রাণির ভিতর থাকে না বলেই মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। মানুষকে আল্লাহতালা একটা আলাদা রুপে, প্যাঠানে, অবয়বে, সৃষ্টি করেছে। মানুষ বিশেষ এক প্রক্রিয়াস্বরুপ। আমরা যাকে আল্লাহ বলি সেই আল্লার পরম অংশের থেকে ক্ষুদ্র অংশ হতেই মানুষের সৃষ্টি। তার কোন মরন নাই, কোন ক্ষয় নাই। সে যেখান থেকে আসে সেখানে চলে যায়। বেহেস্ত-দোযখ আরবি ভাষা আর  আমাদের বাংলা ভাষায় শান্তি আর অশান্তি। আগেও বলেছি মানুষের কোন পুর্নজন্ম হবে না। মানুষের দেহ ১০টি উপাদান দ্বারা গঠিত। ১০টা উপাদান এবং ৮টা নিয়ে মোট ১৮টি দিয়ে মানুষের দেহ গঠিত।  প্রথম আগুন, পানি, বাতাস, নূর, মাটি এগুলো ছাড়াও আল্লা অন্য কিছু দিয়েছেন যা দর্শন, পরক্ষন, শ্রবণ, আস্বাদন এমন আরো কিছু উপাদান দিয়ে মানুষের দেহ গঠিত। এগুলোর সব ধ্বংস হলেও একটা উপাদান কোনদিন ধ্বংস হবে না তা হলো পরমআত্মা। যাকে আমরা প্রাণ, জান, আত্মা বলি, এটার কোন ধ্বংস নাই।

বঙ্গ রাখাল : সৃষ্টিতত্ত্ব বলতে কি বোঝায়?

সাইদুর রহমান বয়াতি : সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে চিন্তা করলে স্রষ্টার দর্শন পাওয়া যায়। আঠার হাজার মাখলুকাতের মধ্যে ইনসানি আত্মার অধিকারী কেবলমাত্র মানুষ। সৃষ্টিকর্তা মানুষের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। আল্লার গোপন রহস্যাগার মানুষ। মানুষ রতনের সন্ধান পেলে আল্লার সন্ধান মেলে। এজন্যইতো  জ্ঞানীয় সংস্পর্শে গেলে জ্ঞান চক্ষুলাভ ঘটে এবং সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায়। সৃষ্টিতত্ত্ব দুইভাগে বিভক্ত। সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে যে সত্য উৎঘাটন  করা হয় তাই সৃষ্টিতত্ত্ব। ব্রক্ষান্ড কোথা থেকে সৃষ্টি হলো, কে সৃষ্টি করল ? অনুরুপ আমার দেহ ব্রক্ষান্ড। আমার এ দেহও একটা রহস্যময় বিষয়। মানুষ কোথায় ছিল, কোথা থেকে আসল, আবার মরার পর কোথায় যাবে। এসব নিয়ে জানা শুনা করার নামই সৃষ্টিতত্ত্ব। আর বিষয় ভিত্তিক জানার নামই তত্ত্ব। কে সৃষ্টি করল? কিভাবে সৃষ্টি করল। আবার কোন দিন বা প্রলয় হয়ে সব কিছু শেষ হয়ে যাবে এসব জানা শুনার নাম সৃষ্টিতত্ত্ব।

বঙ্গ রাখাল : নূরতত্ত্ব কি ?

সাইদুর রহমান বয়াতি : নূর শব্দের অর্থ আলো। আলোটা কি? এটা কোথা থেকে এলো? মানুষ কিন্তু একটা আলো। মানুষ যদি সৃষ্টি না হতো এ মানুষ (ভগবান, পপ, গড, আল্লাহ্) সৃষ্টিকর্তাকে কেউ চিনত না। নূর মানে আলো যা সবকিছুকে আলোকিত করে। আল্লাহ আলোকিত হলো কাকে দিয়ে। এজন্য মানুষ একজন নূর। এজন্য এসব নিয়ে জানাশুনা করতে গেলে আগে জানতে হবে আদি নূর কি? কোন নূরে এ পৃথিবী সৃষ্টি হলো এবং হাদিসে বলা হয়েছে নবীজির যখন জন্ম হয় তখন সেটিও একটি নূর। এসব সম্পর্কে জানা শোনা করার নামই নূরতত্ত্ব।

বঙ্গ রাখাল : ‘কারতত্ত’ বলতে কি বোঝাচ্ছেন?

সাইদুর রহমান বয়তি : কার মানে রুপান্তরিত হওয়া। পৃথিবী প্রথমে কি রুপে ছিল এবং  সেটা পরিবর্তন হতে হতে বর্তমানে কি অবস্থায় আছে। আমি জন্মের সময় কিভাবে ছিলাম এবং পরিবর্তন হতে হতে বর্তমান কিভাবে আছি এসব সম্পর্কে যারা জানাশুনা করেছে তাদের বলা হয় সুফি। সুফি শব্দের অর্থ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন এবং নিষ্ঠাবান। যে ভাবেই তারা থাকুক না কেন সে অবস্থাতেই তারা খুশি। তাদের কোন লোভ লালসা নেই। এ দর্শনকেই সুফিজন বলে। এ সুফিজম সম্পর্কে একজন মানুষের জানা থাকলে ঠিকই সে একজন খাটি মানুষে রুপান্তরিত হবে।

বঙ্গ রাখাল : সাইদ ভাই, একটা বিষয় সম্পর্কে খুব জানতে ইচ্ছে করছে সেটা হলো ‘যৌনতত্ত’ বা ‘কামতত্ত্ব’ সম্পর্কে?

সাইদুর রহমান বয়াতি : সারাটা দুনিয়া চলে মাত্র দুইটা জিনিসের উপরে। তার মধ্যে একটা প্রেম আর একটা হলো কাম। কাম শব্দের সার্বিক অর্থ দুইটা। এর মধ্যে একটা কাম বলতে কর্মকে বোঝায় আর অন্যটি বলতে বোঝায় যৌনতা। অন্যভাবে আমরা কামকে বোঝাতে পারি। নারী পুরুষের মিলনের ফলে যে জগৎ সৃষ্টি হয় তাকেও আমরা কাম বলে থাকি। এ কাম আবার দুভাগে বিভক্ত -
    ১। সুদ্ধকাম
    ২। বাজেকাম বা খারাপকাম
সুদ্ধকাম বলতে আমরা বুঝি যে কাজের হুকুম আছে। স্বামী স্ত্রীর সঙ্গম বা মিলন। এটা অবশ্যই কর্তব্য, করতে হবে।

বাজেকাম- যে কাজকে উর্দুতে বলা হয় ‘বেয়াদাত’। যেমন: পরস্ত্রীর সাথে সঙ্গমরত হওয়া বা অন্যের সাথে মিলিত হওয়া। এই কামকে রক্ষা করে নিজের দেহটাকে বাঁচাতে হবে এবং সৃষ্টিকেও রক্ষা করতে হবে সেই সম্পর্কে জানা-শুনা করতে গেলে অবশ্যই ‘কামতত্ত’ সম্পর্কে জানা উচিত। কামে থাকে পাঁচ শক্তি। এ পাঁচ শক্তিকে আবার বান ও বলা হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে সব থেকে কঠিন হল ‘মন্থন’। যৌবনকালে পুরুষের দেহে একপ্রকার জোয়ার আসে তখন তারা তাদের জীবনের এ শক্তিকে নানাভাবে অবচয় করে থাকে একে বলে ‘মৈথুন’। এটা করা উচিৎ নয়। ‘মাদন’ শব্দের অর্থ পাগল হয়ে যাওয়া ‘মদন’ শব্দ বলতে পুরুষের “শিশ্ন” কে বুঝিয়ে থাকে। এসব তাত্ত্বিক ব্যাপার সম্পর্কে জানতে হলে একজন সুফি মানুষের কাছে গিয়ে  তার সঙ্গ নিতে হবে। এ কামের মূল বিষয় শারিরীক এবং অন্যটি সৃষ্টিকে রক্ষা করা। এ বীর্য সম্পর্কে শাস্ত্রেও বলা হয়েছে - ‘বীর্যায়াং অব্রায়ম’ এর অর্থ হলো স্বয়ং বীর্যই হলো যেন পরম ব্রক্ষ্ম। এটাকে যদি কেউ অবহেলা করে  সে যেন স্বয়ং ব্রক্ষ্মের মাথায় বাড়ি দিল। ব্রক্ষ্ম বলতে বোঝায় স্রষ্টা। এ বীর্যকে তো ক্ষতি করাই যাবে না বরং একে ধারন, লালন, পালন, বৃদ্ধায়ন করতে হবে। সে হিসেবে ইসলামি বা হিন্দু শাস্ত্রে কিছু কিছু মন্ত্রেও ব্যবস্থা রয়েছে এ মন্ত্রকে সাধনা মন্ত্র বলা হয়। এ গুলো জেনে কাজ করলে তাদের কোন ক্ষতি হবেনা। এ সম্পর্কে আবার কিছু গানও রয়েছে- 
অষ্ট আঙ্গুল নদীর ধারা
নাইকো তাতে কূল কিনারা
ষোল আঙ্গুলে যাও তরী বাইয়া
রসিক নাইয়ারে...।

কোন নারী পুরুষ যদি সুফিবাদের দলভুক্ত হয়ে যায় তখন আর কারও এ লিপ্সা থাকে না। ‘যার কাম নদীতে চর পরেছে প্রেম নদেিত বাধ মানে না’। যার এ নদীতে চর পড়েছে সে আর কোনদিন কামকে কামনা করবে না। সে শুধু চাবে প্রেম, প্রেম, প্রেম। তার কাছে তখন আর কামের গুরুত্ব থাকে না। তখন সে প্রেম পাগলা হয়ে উঠে।

বঙ্গ রাখাল : প্রেম এবং কামের মধ্যে পার্থ্যক্য কি?

সাইদুর রহমান বয়াতি : পার্থক্য হলো উভয়টাকেই রক্ষা করতে হবে। একই ভান্ডে বিষও থাকে আবার অমৃতও থাকে। যেমন: কোন ফুলের মধ্যে মধুও থাকে আবার বিষও থাকে। ফুলের মধ্যে যখন মধু থাকে তখন ভ্রমর এসে সেটাই গ্রহণ করে আর বাকী বিষ গোবরা পোকা এসে গ্রহন করে। তেমনই একই ভান্ডে স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে অমৃত ও বিষ দুই-ই আছে। এগুলো জেনে বুঝে স্বামী-স্ত্রীর রতিক্রিয়ায় গেলে তারা লাভবান হবেন।

বঙ্গ রাখাল : সাইদ ভাই, তাহলে ‘দেহতত্ত’ এবং ‘কামতত্ত’ একই বিষয় না কি এদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে?

সাইদুর রহমান বয়াতি : দুইটা একই আবার ‘কামতত্ত’ এবং ‘দেহতত্ত’ দুইটি আলাদা আলাদা বিষয়। আমাদের দেহের মধ্যে কি কি জিনিস আছে এবং তা কোন কোন জায়গায় অবস্থিত তা সম্পর্কে জানা বোঝার নাম দেহতত্ত্ব আর কামতত্ত্ব সম্পর্কে তো পূর্বেই বলেছি। তারপরও বলি-কাম বলতে একটি বস্তু বিশেষকে বোঝায়। কোথায় এ বস্তুটি থাকে। যেমন: কোন মানুষকে যদি আমরা চিরে চিরে খন্ড বিখন্ড করে ফেলি তারপর কোথায়ও একফোটা বা একবিন্দু বীর্যের সন্ধান পাওয়া যাবে না। কিন্তু এটা আসে কোথা থেকে। এ বস্তুটি মানুষের সর্বাঙ্গে জড়িত থাকে। যখন মানুষের শরীর গরম হয় তখন এগুলো মানবরস থেকে পয়দা হয়। যেমন- মানুষের বৃদ্ধা আঙ্গুল থেকে মাথার চান্দি পর্যন্ত এটা ‘মন্থন’ করে। এগুলো ‘মন্থন’ করতে করতে শাস্ত্রে লেখা আছে ১০০ ফোটা রক্ত থেকে এক ফোটা বীর্য তৈরি হয়। এরকম চলতে চলতে এ বস্তুটা যখন ঘনীভূত হয়ে যায় তখন আর সেটা ধরে রাখা যায় না। তখন আমরা এ বস্তুকে ফেলে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যাই। তখন আমরা একে ছেড়ে দেই। এ ছেড়ে দেওয়ার কারনে কিন্তু আমাদের বিপদ হয়ে গেল। দেহতত্ত্বের মূল বিষয়- আমার যে তৈরি সে মাটিটা কোথাকার, আমার দেহের মধ্যে ‘দম’ কিভাবে আসে যায়। এ দমটা কয় ভাগে বিভক্ত। কোন জায়গায় কয়টা হাড়, কয়টা জোড়া এসবই হলো ‘দেহতত্ত’। দেহের যে সব ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে তা ‘দেহতত্তে’ আলোচিত হয়। আর কাম বিষয়ক ব্যাপার হলো ‘কামতত্ত’। কিন্তু ‘দেহতত্ত’ নিয়ে আলাপ করতে করতে ‘কামতত্ত’ আসতে পারে আবার ‘কামতত্ত’ নিয়ে আলোচনার সময় তো ‘দেহতত্ত’ নিয়ে আলোচনা করতে হয়। যেমন: দেহের মধ্যে নারী আছে। এ নারীয় সংখ্যা হলো ৭২,০০০ হাজার টা। এটা হলো ‘দেহতত্ত’। এর মধ্যে আবার ৩ টা নারী প্রধান। তার মধ্যে একটার মধ্য দিয়ে এই যে বীর্য তা আসা যাওয়া করে। তাহলে দেখা গেল এই যে দেহের সাথে সম্পর্ক রয়ে গেল। 

বঙ্গ রাখাল : বাউল এবং সুফিদের মধ্যে পার্থক্য কি? নাকি এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই?

সাইদুর রহমান বয়াতি : বাউল হলো একটি আলাদা ধর্ম। হিন্দু ধর্মের গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু হতে এ ধর্মের উৎপত্তি। বাউল এবং সুফিদের ধর্ম এক না। কেননা কিছু কিছু মানুষ বাউল এবং সুফিদের এক করে ফেলে। কিন্তু এরা দুজন দুই পথের মানুষ। বাউলরা আবার দুইভাগে বিভক্ত। একভাগ রসতত্ত্ববিদ অন্যভাগ বায়ুতত্ত্ববিদ। এ রসতত্ত্ববিদরা বীর্যপান করে। এ তত্ত্বের পুরুষ  বাউলেরা তার সাধনার অপরিহার্য অংশ হিসেবে নারী গ্রহন করেন এবং যৌন মিলন করে থাকেন। যৌন মিলনের চরম মুহূর্তে বীর্য নারীর যৌনাঙ্গে প্রবেশ না করিয়ে ঐ বীর্য একটি পাত্রে বা মরা মানুষের খুলিতে সংরক্ষন করেন। এই বীর্য মন্ত্র দ্বারা বিশুদ্ধ করে নেন। মন্ত্রটি হল (বীর্য) চন্দ্র কাঁচা, সূর্য কাঁচা, কাঁচা চন্দ্র সাধারন লালে চাঁপায় মুরশিদ যে মুখে পিয়াত্ত মুরশিদ তুমি সেই মুখে পিয়াই আজ আমি সর্বাঙ্গ কাঁচা, কাঁচা, কাঁচা। এ মন্ত্র বীর্য পান করার সময় পাঠ করে তা পান করা হয়। এ বীর্য পান করলে অল্প বয়সে দাঁত পড়ে যায়, অল্প বয়সে বুড়ো হয়ে যায়। এ রসতত্ত্বের সাধক আবার পায়খানার কিছু অংশ, পেসাবের রস, বীজ খায়। এগুলো খাওয়ার সময় ও তারা মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে তা পান করে থাকে।

বঙ্গ রাখাল : লালনের দেহবাদী দর্শন আসলে কি ? লালন তার গানে যে সব কথা বলে গেছে তা কি বর্তমান সময়ে তাঁর গান গাওয়ার সময় সেভাবে মানা হচ্ছে বা যারা নিজেদের বাউল বলে দাবি তুলছে তারা কি আদেও বাউলী দর্শন মানে।

সাইদুর রহমান বয়াতি : লালন যেভাবে তার দর্শন দিয়ে গেছে বর্তমানে মানুষদের কাছে তা সেই ভাবে মানা হচ্ছে না। বরং তাঁর দর্শনের উল্টাটাই বর্তমান করা হচ্ছে। লালন কোনদিন তার ভক্তদের ধূমপান করতে বলেনি কিন্তু তার বর্তমান শিষ্যরা গাঁজা খায়। শুধু কি তাই? বর্তমানে তাঁর শিষ্যরা বিবাহ না করে সেবাদাসী রাখে এবং তাদের মুখে শিশ্ন ঢুকিয়ে দেয়। কিন্তু লালন তো এসব কোনদিন করেননি। বরং তিনি সংসার করেছেন এবং কৃষিকাজ করে জীবনযাপন করেছেন। এটা দলিল দস্তাবেজ দ্বারা প্রমানিত। লালন ভক্তগণ দুই ভাগে বিভক্ত- ১। আদি লালন ভক্ত যারা, তারা চুল দাঁড়ি রাখে। গেরুয়া রং এর পোশাক পরে। তাঁরা নামাজ রোজা বোঝে না। তাঁদের সাধনার মূল বিষয় গান। গানের মাধ্যমে তারা ¯্রষ্টার আরাধনা করে। আর একদল বাউল আছে তারা সাদা রং এর পোশাক পরে। কেউ চুল দাঁড়ি কেটে ছেটে রাখে। তাদের সাধনার মূল বিষয় সঙ্গীত। এদের বাউল বলা যায় না।

বঙ্গ রাখাল : সুফিবাদী দর্শন আসলে কি? লালন সুফিবাদী না বাউল?

সাইদুর রহমান বয়াতি : এ সুফি দর্শন ভালো দর্শন। যার স্পর্শে মানুষ আলোকিত হয়। আসলে লালন বাউল না। তিনি একজন পীর, দরবেশ, আউলিয়া। তিনি একজন সুফিবাদী। এখন আসলে আমরা যাদের দেখি তারা বাউল না আবার সুফিও না। ওরা আসলে একটা ব্যবসা খুলে নিয়েছে। এরা পাপ পূর্ণ বোঝে না। এরা গান গাবে গেরুয়া পোষাক পরবে। কিন্তু আমরা যদি লালনের পোশাক, আশাক দেখি- এসব দেখি কিন্তু বোঝা যায় তিনি দরবেশ, পীর ছিলেন ? তিনি কিন্তু তার গানের কোথাও তিনি বাউল বলেন নি। তিনি কিন্তু সর্বজায়গায় ক্ষ্যাপা, ফকির, অধম, দীন বলেছেন। তিনি যে ফকির বলেছেন তার আবার একটা অর্থ আছে। ফকির অর্থ আল্লার ফিকির করেন যিনি তিনিই তো ফকির। আল্লাহকে যে খোঁজে সেই ফকির। লালনকে তো সবাই বোঝেনা তাই তো যার যা মত সেভাবেই তাকে ব্যবহার করেছে।
বঙ্গ রাখাল : আচ্ছা, সাইদ ভাই, তাহলে কি দেখে বাউলদের চেনা যাবে বা বাউলদের বৈশিষ্ট কি?

সাইদুর রহমান বয়াতি : বাউলের বৈশিষ্ট্য তারা গান গাবে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরবে। বাউল শব্দের অর্থ হলো খতিয়ানশূন্য মানুষ। খতিয়ান শূন্য মানুষ বলতে যাদের বসত বাড়ি থাকে না। যেমন- ‘বৈরাগী’। এ বৈরাগীরা হিন্দু শাস্ত্র মতে চলে। তারা সারাদিন ভিক্ষা করবে আর গান গাইবে। এভাবে গান গেয়ে যা পাবে তা তারা ঐদিন খাবে কিন্তু লালন কি কোনদিন ঐভাবে চলেছে? তাহলে আমরা লালনকে কিভাবে বাউল বলতে পারি? লালনের মধ্যে পবিত্রতা ছিল কিন্তু এখনকার বাউলধারীরা ভন্ড তাদের কোন পবিত্রতা নেই। তিনি কখনও ভিক্ষা করেননি এমনকি ভক্তরা তার কাছে কিছু নিয়ে আসলে তিনি নিষেধ করতেন।

বঙ্গ রাখাল : এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, আপনি তো ভাষা আন্দোলন নিয়েও অনেক গান রচনা করেছেন- কেন ভাষা আন্দোলনের প্রবনতা আপনার মনের মধ্যে মাথাচারা দিয়ে উঠল?

সাইদুর রহমান বয়াতি : আমি তখন কিশোর, গ্রামে থাকি। তখনই শুনতে পেলাম ঢাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় বরকত, সালাম, রফিকের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে এবং জানতে পারি যে রফিক শহীদ হয়েছে। সে আমাদের এলাকার বর্তমান সিংগাইর থানার পারিল গ্রামের ছেলে। এ সংবাদ শুনার পরই আমার গভীর মন খারাপ এবংতার জন্য চোখ দিয়ে জল বের হয়ে আসলো। তারপরই রচনা করলাম:
জন্মভূমি মায়ের ভাষা বলতে কেন দাও বাধা
তোমাদের কি হয় মাথা বেথা ?
হায়রে বনের পাখি বনে থাকে
যার যার ভাষায় সেই ডাকে...
শুধু একটি নয় অনেক গান রচনা করেছি ভাষা আন্দোলন নিয়ে, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, স্বাধীনতা, মুসলিম লীগের ভোট দেওয়া নিয়েও কত্তো গান রচনা করলাম। আমার একটি গান:
ফাগুনরে তুই ফিরে আইলি বুকভরা তোর আগুনে
নিভাইতে কি পারে তাহা শ্রাবণের বানে
বঙ্গমাতা ভাষার ব্যথা
মালা গাঁথা এই দিনে...

বঙ্গ রাখাল : আপনি কত প্রকার গান জানেন?

সাইদুর রহমান বয়াতি : তাতো ৫০-৫২ প্রকার গান হবেই। আরো ২৫০-৩০০ মন্ত্র জানি।

বঙ্গ রাখাল : আপনি তো তাবিজ, মাদুলিও দেন, না ?

সাইদুর রহমান বয়াতি : হ্যাঁ।

বঙ্গ রাখাল : আপনি কি একজন সুফিবাদী দর্শনের পীর ও তো না ? আপনার কতজন শিষ্য বা মুরিদ আছে ?

সাইদুর রহমান বয়াতি: হ্যাঁ। আমি একজন পীর এটা আমাদের বংশগত ভাবেই চলে আসছে। আর আমার মুরিদ ১,৫০০-২,০০০ তো হবেই।

বঙ্গ রাখাল : সাইদ ভাই, আপনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগে বিষাদময় গান রচনা করে জনসাধারনকে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ব করেছেন এবং অনুপ্রানিত করেছেন। আপনার নির্দেশিত ও অভিনীত ইমাম যাত্রা ২০০৯ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর লোকনাট্য সপ্তাহে মঞ্চ হয়। আপনি ১৯৯২ সালে উদীচী শিল্প গোষ্ঠীর আমন্ত্রণে কলকাতার লোকসঙ্গীত উৎসবে যোগ দেন। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার এবং বর্তমান আপনি বাংলা একাডেমীর ফেলো। এছাড়াও পেয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা ও শিল্পকলা পদক ২০১৩। এত কিছুর মধ্যে আপনার শ্রেষ্ট পুরষ্কার কোনটি ?

সাইদুর রহমান বয়াতি : একবার সারি গানের জন্য মন্ত্রী আব্দুল লতিফ আমাকে একটি রুপার নৌকা পুরষ্কার দেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও আমার কাছে শ্রেষ্ট পুরষ্কার বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে গ্রহন করা পুরষ্কার। এছাড়াও পেয়েছি তৎকালীন গর্ভনর আজম খানের হাত থেকে সিটিজেন রেডিও পুরষ্কার।

বঙ্গ রাখাল : আপনি তো, অনেক যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। তা সর্বমোট কতগুলো হতে পারে ?

সাইদুর রহমান বয়াতি : তাতো ১০০ এর বেশি হবেই।

বঙ্গ রাখাল : যাত্রাপালায় কোন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন? এবং কবে থেকে শুরু?

সাইদুর রহমান বয়াতি : প্রাইমারী স্কুলে থাকা অবস্থাতেই যাত্রাদলে কাজ করা শুরু করি এবং প্রথমে পুরুষের ভূমিকায় নয়, একজন নর্তকীর ভূমিকায় অভিনয় করি। এ অভিনয়ের সময় আমার নাম ছিল ছবিরানী।

বঙ্গ রাখাল : আপনার দীর্ঘ সাধনার জীবনে কষ্টের কথাটা কি?

সাইদুর রহমান বয়াতি : আমি বাংলাদেশের লোসঙ্গীত নিয়ে এত কাজ করলাম কিন্তু বাংলা একাডেমী আমার আজও কোন বই বের করল না। আমি ভাষা নিয়ে লেখেছিলাম “স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা” এটিও বের হয়নি। দেশ নিয়েই টানাটানি করলাম কিন্তু দেশ থেকে কিছুই পেলাম না। তবে একটি পুরষ্কার আমার শ্রেষ্ট পুরষ্কার সেটা লোকজনের ভালোবাসা। অসংখ্য লোক আমাকে চেনে, ভালোবাসে এটাই আমার শ্রেষ্ট পুরষ্কার।

বঙ্গ রাখাল : ধন্যবাদ সাইদ ভাই। দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য।
সাইদুর রহমান বয়াতি : তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ ভাই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড