• রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

'টাইফয়েড ম্যারি' : যার রান্না করা খাবার ছড়াতো টাইফয়েড!

  অধিকার ডেস্ক

২৫ জুন ২০১৯, ১০:৩০
ম্যারি ম্যালন
ম্যারি ম্যালন (ছবি: উইমেন্স মিউজিয়াম অফ আয়ারল্যান্ড)

ম্যারি ম্যালন দারুণ মজার খাবার বানাতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার রান্না করা খাবার খেয়ে মৃত্যু হয় তিনজন ব্যক্তির! পুরো রাঁধুনি জীবনে তিনজন ব্যক্তির মৃত্যু ছাড়াও টাইফয়েডের জীবাণুতে আক্রান্ত হন ৫০ এরও অধিক মানুষ! 

তিনি পরিচিত ছিলেন 'টাইফয়েড ম্যারি' নামে। ১৮৬৯ সালে আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেন ম্যারি। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন ১৮৮৩ বা ৮৪ সালের দিকে। 

প্রাচীন সে সময়ে মানুষের মাঝে টাইফয়েড প্লেগের মত ছড়াচ্ছিল। 

১৯০০ সালের দিকে, চিকিৎসকেরা প্রথম টাইফয়েড কীভাবে ছড়ায় সে বিষয়ে ধারণা লাভ করেন। তারা জানতে পারেন এটি মূলত ছড়ায় একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে। তারা আরও জানতে পারেন টাইফয়েডের জীবাণু লুকানো থাকতে পারে মলের মধ্যেও। আবার সুস্বাস্থ্যের অভাবও এর জন্য দায়ী। 

টাইফয়েড ম্যারিকেই প্রথম চিহ্নিত করা হয়েছিল এই রোগের বাহক হিসেবে। কোনো ধরনের উপসর্গ দেখানো ছাড়াই তিনি টাইফয়েডের জীবাণু বহন করতে এবং ছড়াতে পারতেন! 

টাইফয়েড ম্যারির ঘটনাটা সামনে আসে যখন একটি পরিবার তাদের গরমের ছুটির সময় কাটানোর জন্য নর্থ কোস্টের একটি আইল্যান্ডে যায়।

১৯০৬ সালে চার্লস হ্যানরি ওয়ারেন নামে নিউ ইয়র্কের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যাংকার তার পরিবারের দশ সদস্যকে নিয়ে একটি বাড়ি ভাড়া করেন। ২৭ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই পরিবারের দশজনের মাঝে ছয়জনই টাইফয়েডে আক্রান্ত হন! সেই এলাকায় এর আগে কখনোই টাইফয়েডে কেউ আক্রান্ত হয়নি। এই রোগটি কীভাবে ছড়ালো সেটি বের করতে ওয়ারেন তখন জর্জ সোপার নামের একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়োগ দিলেন। 

জর্জ এসে পুরো বাড়ি খুঁজে টাইফয়েড কীভাবে ছড়াচ্ছে সেই রহস্য উদঘাটনে নামলেন। পুরো বাড়িটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত খুব ভালোভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল। সম্ভাব্য প্রতিটি জিনিস এবং ঘরের কোণা বেশ ভালোভাবেই পরীক্ষা করা হলো। শুধুমাত্র বাকি ছিল 'রাঁধুনি'কে নিরীক্ষা করা। কিন্তু এই অসুস্থতা ছড়ানোর মাত্র এক সপ্তাহ আগেই তিনি কাজ ছেড়ে চলে যান! সেই চলে যাওয়া রাঁধুনির নামই ছিল ম্যারি ম্যালন! 

তখনই জর্জ জানতে পারলেন ম্যালন খুব ঘন ঘন চাকরি বদল করেন। বলতে গেলে তিনি বহন করে চলেছেন 'টাইফয়েড বোমা'! তার বদল করা আগের সাতটি চাকরিতেই কেউ না কেউ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছে! 

ম্যালনের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জর্জ জানান, 'সে যখন খাবার রান্না করত তখন তার হাত থেকে টাইফয়েডের জীবাণু পানিতে ধুয়ে খাবারে জমত। বাড়ির অন্য কোনো হাউজকিপার আমাকে এই বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেনি যে ম্যারি খুব পরিচ্ছন্নভাবে রান্না করত!'

জর্জ সোপার পরবর্তীতে ম্যালনের কাজের জায়গায় কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে যান তাকে গ্রেফতার করার জন্য। নিউ ইয়র্ক তাকে নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। 

ম্যারি মানতেই পারছিলেন না যে টাইফয়েড জ্বরের ভাইরাস ছড়ানোর জন্য গ্রেফতার করা হচ্ছে। 

সে সময় ম্যারি বলেছিলেন, 'আমার নিজস্ব চিকিৎসক জানিয়েছেন আমার শরীরে কোনো টাইফয়েডের জীবাণু নেই। আমি নির্দোষ। আমি বলেছি আমি কোনো অপরাধ করিনি । আমার সাথে এমন আচরণ করা হচ্ছে যেন আমি একজন নির্বাসিত অপরাধী!'

তিনি নিউ ইয়র্কের স্বাস্থ্য স্টেট বোর্ডে স্বাস্থ্য বিষয়ে বেশ অনেকবার আবেদন করেছেন। এবং শেষ পর্যন্ত সফল হন। তার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল তিনি আর কখনোই রান্না করতে পারবেন না। ১৯১০ সালে এই নিষিদ্ধ পরোয়ানা থেকে মুক্তি পান ম্যারি। 

কিছু দিনের জন্য ম্যারি একটি লন্ড্রিতে কাজ করেন। কিন্তু সেখানে বেতন অনেক কম ছিল। তাই তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ম্যারি ব্রাউন রাখেন। আর স্লাউন হাসপাতালে মেয়েদের জন্য খাবার রান্না করতে থাকেন। 

১৯১৫ সালে, সে হাসপাতালে ২২ জন চিকিৎসক এবং নার্স টাইফয়েডে আক্রান্ত হন এবং দুইজন মারা যান। তখন ম্যারি ম্যালনের কথা আবার সবাই জানতে পারেন। তখন তাকে আবার গ্রেফতার করা হয় এবং নিষিদ্ধ করা হয়। তাকে প্রায় তিন বছরের মত নির্বাসিত রাখা হয়। মৃত্যুর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইজড হয়ে ছয় বছর শয্যাশায়ী ছিলেন ম্যারি। ১৯৩৮ সালের ১১ নভেম্বর, ৬৯ বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ম্যারি। 

তথ্যসূত্র: দ্য স্টোরি বিহাইন্ড 

ওডি/এএন 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড