• বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘ও’ নেগেটিভ নাছিম দাদু

  মোহাম্মদ রনি খা

১৪ জুন ২০১৯, ২২:৩৩
নাছিম
মো. জাবেদ নাছিম (ছবি : সংগৃহীত)

জীবনে রক্তের গুরুত্ব অপরিসীম। এক ব্যাগ রক্ত একটি জীবন বাঁচাতে অমূল্য ভূমিকা পালন করে থাকে। রক্তের কোনো বিকল্প হতে পারে না, এটা কারোই অজানা নয়। 

জীবনে রক্তের প্রয়োজন কতটা তা উপলব্ধি করেছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে একজন মো. জাবেদ নাছিম। তিনি বাংলাদেশের ‘ও’ নেগেটিভ গ্রুপের একজন সর্বোচ্চ রক্তদাতা। এ পর্যন্ত ১৬৯ বার ‘ও’ নেগেটিভ রক্ত দান করেছেন। এর মধ্যে ৪৮ বার (৩০-১৫০ মিলি) শিশুদের জন্য এবং ১১৯ বার (৪৫০ মিলি) হোল ব্লাড এবং ২ বার প্লাটিলেট দিয়েছেন।

মো. জাবেদ নাছিম প্রচারে নয় বরং কাজে বিশ্বাসী। মানুষকে রক্ত দিয়ে প্রশান্তি পান তিনি। তিনি মনে করেন, তার রক্তেই মিশে আছে মানুষের উপকারে ছুটে চলার প্রবল নেশা। 

মো. জাবেদ নাছিম কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাংগরা থানার পীর কাশিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। নাছিমের রক্তদান শুরুটা সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার লাইনগুলোর মতই “আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ, স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।” 

১৯৮৬ সালের ২৭ অক্টোবরে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রক্তদান শুরু করেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে এক মুমূর্ষু রোগীর জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন এমন একটি বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ে তাঁর। নাছিমের মাঝে প্রবল একটা আবেগের সৃষ্টি হয়। সেই থেকেই নাছিমের রক্তদান করার আগ্রহের সূচনা। তবে নাছিম তখনো নিজের রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। 

তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি চলছিল। এ সুযোগে নিজের রক্তের গ্রুপ জেনে নিলেন তিনি। নিজের রক্তের গ্রুপ ‘ও’ নেগেটিভ জানার পরে নাছিমের উল্লাস দেখে কে! আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেন তিনি। এ উল্লাসের অন্যতম কারণ সমাজে ‘ও’ নেগেটিভ রক্তের বিশেষ গুরুত্ব। শুধু রক্ত দিয়েই নয়, ১৯৮৭ সালে করেছেন মরণোত্তর চক্ষুদান নিবন্ধন। নাছিম “কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংক” ও পুলিশ ব্লাড ব্যাংকের একজন ‘‘গোল্ডেন ক্লাব’’ সদস্য।  

মো. জাবেদ নাছিম বলেন, ‘জীবনে অন্যের জন্য কিছু করতে না পারলে মানুষ হয়ে কেনো জন্মানো! সব কিছুতে টাকা থাকতে হবে, এমনটা নয়। এখানে মানুষের কল্যাণে কাজ করার ইচ্ছাই মূল বিষয়।’ 

রক্তদানের জন্য নাছিম বিভিন্ন পদকও পেয়েছেন। এর মধ্যে, আইজিপি পদক, জেলা পুলিশ পদক, কুমিল্লা জেলা থেকে সেরা রক্তদাতা সম্মাননা স্মারক ছাড়াও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘পুরষ্কার বা সম্মাননা পাওয়া মুখ্য বিষয় নয়, মানুষের উপকারে আসতে পেরেছি এতেই আনন্দ বোধ করি।’

রক্তদান চলছে (ছবি : সংগৃহীত)

শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও রক্ত দিয়েছেন নাছিম। পেশাগত প্রয়োজনে ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের ১৭টি দেশে। এ সময় সিঙ্গাপুরে ৩ বার, ভিয়েতনামে ২ বার সহ দেশের বাইরে মোট ৭ বার রক্তদান করেছেন তিনি।

 নাছিম জানালেন তাঁর রক্তদানের ৩৩ বছরের অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, ‘শিশুদের রক্ত দেওয়ার জন্য ৪ মাস অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র ৩০-১৫০ মিলি রক্ত, ৪ মাসের আগেই দিয়েছি।’ 

রক্তদানের এই পথচলার এক ভয়ংকর সত্য তুলে ধরলেন নাছিম। ১৯৯৮ সালের ২৫ নভেম্বর নাছিমের সন্তান মারা যায়। তখন হাসপাতালে এক বাচ্চার রক্তের প্রয়োজন ছিল। সন্তানের দুঃখ ভুলে চলে গেলেন অপরের প্রয়োজনে। রক্ত দিলেন ৬০ মিলি। এরপর নিজের সন্তানের জন্য বাকি কর্তব্যটুকু পালন করে নেন তিনি। 

সিলেট মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, ঢাকার রেড ক্রিসেন্ট, কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংক, পুলিশ ব্লাড ব্যাংক সহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের বেশ কিছু জায়গায় রক্ত দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে সন্ধানীতেই বেশি রক্ত দেওয়া হয়েছে তার। 

নাছিম আরও বলেন, ‘রক্ত দিলে মানুষের উপকার হয়। কিছুদিন পরেই তো শরীরে নতুন রক্ত তৈরি হয়। মানুষের যখন রক্তের প্রয়োজন হয়, তখন রক্ত দিলে মানসিক যে তৃপ্তি, পৃথিবীর অন্য কিছুর বিনিময়ে সেই তৃপ্তি পাওয়া যাবে না। আমার রক্তে একজন মানুষ বেঁচে উঠছেন এর চেয়ে আনন্দদায়ক আর কী হতে পারে জীবনে! মানুষ তো মানুষের জন্যই।’

রক্তদান নিয়ে দুঃখের স্মৃতিও রয়েছে নাছিমের। নাছিম তখন গাজীপুরে বসবাস করতেন। ঢাকার সিএমএইচ এ একজনের রক্তের প্রয়োজন। গাজীপুর থেকে ঢাকায় আসতে আসতে অনেকটা সময় লাগে নাছিমের। অনেক রাত হয়ে যায় আসতে আসতে। হাসপাতালে রাত ১০টার পরে কোনো রক্ত নেওয়া হয় না। এতে করে রাতে আর রক্ত দিতে পারেন না তিনি। পরে ওই রাত হাসপাতালেই কাটে তাঁর। সকালে প্লাটিলেট দিলেও পরে লোকটা মারা যায়। এছাড়া একই দিনে ঢাকায় নিজের ভাগিনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি রোগীকে রক্ত দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে নাছিমের। 

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও জানালেন নাছিম। থ্যালাসেমিয়া, আগুনে পোড়া ও গরীব রোগীদের জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে একটি ব্লাড ব্যাংক করতে চান তিনি। যেখানে বিনা খরচে সবাই রক্ত নিতে পারবে। এজন্য সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। 

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. এড্রিক বেকার ব্লাড ফাউন্ডেশনের সদস্য আনিকা মোস্তাফিজ জানান, ‘আমার দাদু কিডনি ডায়লাইসিসের রোগী হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি ছিলেন। অনেকদিন ধরে দাদুর জন্য দুর্লভ ও নেগেটিভ রক্ত খুঁজেও পাইনি। রক্ত না পেয়ে খুব হতাশ ছিলাম এমন সময় জাভেদ নাছিমের খোঁজ পাই। পরে তিনি এবং ওনার ভাগ্নে ৯ মে সর্বশেষ ১৬৯ তম রক্তদান করেন। 

নতুন প্রজন্মের কাছে জাবেদ নাছিম দাদু হিসেবে পরিচিত। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাকে দাদু বলে সম্বোধন করে। এ প্রজন্মের জন্য পরামর্শও দিলেন তিনি। ‘মানুষের জন্য কাজ করার মতো মহৎ কিছু পৃথিবীতে আর নেই! তরুণ প্রজন্মকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। যেকোনো ধরনের খারাপ নেশা থেকে বিরত থাকতে হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সামাজিক ও মানবিক কাজগুলো করারও পরামর্শ দেন।

ওডি/এমএ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড