• মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

ঊননব্বইয়ে শুরু করেও আজ সফল ব্যবসায়ী লতিকা!


২৫ জুন ২০১৯, ১৪:০০
লতিকা চক্রবর্তী
সেলাই মেশিন দিয়ে সেলাইয়ের কাজ করছেন লতিকা চক্রবর্তী (ছবি: ইন্ডিয়ান উইমেন ব্লগ)

একজন ৮৯ বছর বয়সী মানুষকে কী হিসেবে দেখবেন আপনি? ক্লান্ত, ভুলোমনা নাকি নতুন জিনিস শেখার ব্যাপারে আগ্রহহীন? কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে আপনার ভাবনার কোনোটাই মিলবে না ৮৯ বছর বয়সী লতিকা চক্রবর্তীর সাথে যিনি এই বয়সেই শুরু করেছেন অনলাইন ব্যবসা। তার ব্যবসার মূল আকর্ষণ হচ্ছে অসাধারণ হাতে বানানো পুটলি ব্যাগ যেগুলোকে বলা হয় পাউচ। এগুলো সবই তিনি নিজে বানান! আর তার এই ব্যাগের গ্রাহক কারা জানেন? জার্মানি, নিউজিল্যান্ড আর ওমান থেকে আসা গ্রাহকেরা।

আসামের ধুবরিতে জন্ম নেয়া লতিকা বিয়ের পর স্বামীর চাকরির সুবাদে ঘুরেছেন ভারতের বিভিন্ন এলাকায়। আগে থেকেই লতিকার শখ ছিল বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের টুকরো সংগ্রহ করার। যখন যে এলাকায় তিনি যেতেন সেখান থেকেই নিয়ে আসতেন নানা ধরনের ভিন্নধর্মী কাপড়ের টুকরো। 

সেলাই

নিজ ঘরে হাতে সেলাই করছেন লতিকা চক্রবর্তী (ছবি: ইন্ডিয়ান উইমেন ব্লগ) 

তিনি বিশ্বাস করতেন কোনো জিনিসই 'ফেলনা' নয়। আর এ ভাবনা থেকেই সেই কাপড়গুলো তিনি ব্যবহার করতেন ছেলেমেয়ের, পুতুলের জামা সেলাই করতে। এরপর সেই কাপড়গুলো ব্যবহার করতে শুরু করেন পুটলি ব্যাগ বানাতে। ব্যাগগুলো তিনি জমিয়ে রাখতেন শুধুমাত্র পরিবারের সদস্য আর বন্ধুদের জন্য। এর অনেক পরে তিনি বুঝতে পারলেন প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া তার এই জ্ঞানটুকু তিনি কাজে লাগাবেন ব্যবসায়। ব্যস ছোট্ট এই একটা ভাবনাই আজকের 'লতিকা'স ব্যাগ'। 

ভারতের জনপ্রিয় ব্লগ সাইট 'ইন্ডিয়ান উইমেন ব্লগ' এর সাথে ইন্টার্ভিউয়ে লতিকা বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি সেলাই আর বুননের কাজ করতাম। আমাদের সে প্রজন্মটা ছিল বেশ মিতব্যয়ী। তারা চোখের সামনে দেশভাগ আর যুদ্ধের মত কঠিন সময় দেখেছে। গৃহিণীরা তখন থেকেই বাচ্চাদের জন্য হাতে সুতা বুনে জামা বানাতেন। আমিও করতাম। এরপর আমার তিন সন্তান বড় হলো। তখন আমি পুতুল বানানো শুরু করলাম। ৪-৫ বছর আগে আমার পুত্রবধূ সুমিতা তার পোশাকের সাথে মিলিয়ে আমাকে একটি পুটলি ব্যাগ বানিয়ে দিতে বলে। তখনই আমি বুঝতে পারি ব্যাগ বানানোর জন্য যতটুকু জানা দরকার তা প্রাকৃতিকভাবেই আমার মাঝে ছিল। এভাবেই আমার ব্যাগ বানানোর শুরু।

লতিকা

পরিবারের সদস্যদের সাথে লতিকা 

আমার জেনারেশনে যে নারীরা ছিলেন তারা সকলেই নিজেদের পরিবারের জন্য বুননের কাজ, সেলাই,করতে ভালোবাসতেন। আমার স্বামীর চাকরি ছিল বদলির সেজন্য আমাকেও তার সাথে যেতে হত বিভিন্ন জায়গায়। আসলে এই ব্যাপারটি সকল নারীকে একসাথে করত। আমাদের সবার সন্তান ছিল আর আমরা কেউই বিত্তবান ছিলাম না। আমার ভালোবাসার কাজ সেলাইতাই তখন আমার নেশা হয়ে গেলো যখন আমার সন্তানরা বড় হয়ে চলে গেলো। 

কীভাবে 'লতিকা'স ব্যাগ'র উদ্ভব হলো?

'যখন থেকে আমি পুটলি আর ব্যাগ তৈরি করা শুরু করলাম তখন থেকেই আমার পরিবার আর বন্ধুদের সবাই খুব প্রশংসা করতে লাগল। সেগুলো আমি তাদের জন্মদিন আর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিফট করতাম। আমার ব্যবসাটা পুরোপুরিভাবে শুরু হয় যখন আমার নাতি জয় আসে। জার্মানি থেকে এসে সে আমায় এই কাজ করতে দেখে। তখন তার মনে হয়েছিল আমার এই কাজগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া উচিৎ। সে তখন একটা ওয়েবসাইট তৈরি করে। এরপর আমার নাতি-নাতনী প্রিয়াংকা, সৃজিত আর জয় সবাই মিলে টুইটার, ফেসবুক আর ইন্সটাগ্রামে এই কাজের কথা ছড়িয়ে দেয়।

আমার পুত্রবধূ সুমিতা আমাকে ব্যাগ বানাতে সাহায্য করে, ব্যবসার দিকটা আমার ছেলে দেখে আর আমার পুরো পরিবার আমাকে রোজ সাপোর্ট ও উৎসাহ দেয়। বলা যায়, এটা একটা পারিবারিক উদ্যোগ।'  

ব্যাগ

লতিকার বানানো ব্যাগ 

লতিকা তার নাতি জয়কে শুধু একজন শ্রেষ্ঠ নাতি হিসেবেই ভাবেন না, সে তার অনেক ভালো একজন বন্ধুও। তার সকল কাজে সহায়তা করার জন্য অনেক বড় একটা সাপোর্ট সে। 

প্রতিটা ব্যাগ তৈরির পিছনে একটা করে গল্প থাকে বলে জানান লতিকা। হতে পারে সে পোশাকটা হয়ত কোনো বিয়ে বা অনুষ্ঠানে পরা হয়েছিল। তার প্রতিটা জিনিসেই এমন প্রতিচ্ছবি থাকে। যখন কোনো একটা পোশাক থেকে একটা ব্যাগ বানানো হয় তখন সেই পোশাকটা নবজীবন পায় আর তারও একটা নতুন গল্প তৈরি হয় বলে জানান লতিকা। 

তাহলে কি সব পোশাকের টুকরো দিয়েই ব্যাগ বানান লতিকা?

না, ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। কিছু কাপড় রয়ে গিয়েছে যেগুলো দিয়ে তিনি কখনোই ব্যাগ বানাননি। হয়তো কখনো বানাবেনও না। কারণ সেগুলোতে তার খুব ভালোবাসার স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

প্রতিভার এক দারুণ বিকাশ লতিকার তৈরি এই ব্যাগগুলো। কিন্তু সেগুলোকে কীভাবে ডিজাইন করেন লতিকা?

এই ব্যাপারটিও বেশ মজার। লতিকা বলেন, আমার তো ব্যবসা করাটা মূল উদ্দেশ্য নয়। আমি প্রথমে কাপড়ের টুকরাটিকে খুব ভালো করে দেখি। এরপর খুঁজি তাকে দিয়ে নতুন কোনো ব্যাগ বানানো সম্ভব কিনা। আমি সময় নেই। এত তাড়াহুড়োর কী আছে? আমাকে কোনো ডেডলাইন মেনে তো কাজ করতে হচ্ছে না। যখন শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন উপকরণ মেনে প্রোডাক্টটার একটা ডিজাইন দাঁড়ায় তখনই ব্যাগ তৈরি হয়।

যে সেলাই মেশিন দিয়ে লতিকা এতদিন ধরে সেলাই করে যাচ্ছেন এত অসাধারণ সব কাজ সে মেশিনটি তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন তার স্বামী শ্রী কৃষ্ণ লাল চক্রবর্তী। লতিকা বলেন, 'আমি যখন মেশিনটার দিকে তাকাই তখন আমি তাতে ভালোবাসা আর মমতা দেখি।'

আজ ৬৪ বছর ধরে এটা আমার সাথে আছে কারণ আমি অন্তর থেকে এর যত্ন নিয়েছি। ৩৮ বছর আগে আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি। প্রতিটা দিন আমি এর দিকে তাকাই আর তার কথা মনে করি।

একজন 'সফল' নারী ব্যবসায়ী হতে হলে কী করা উচিৎ এমন প্রশ্নের জবাবে লতিকা বলেন, আমি খুব সাধারণ একজন নারী যিনি একটা নিয়মমাফিক জীবনে চলতে ভালোবাসি। প্রতিদিন আমি ভোর ৫টায় উঠি আর এটা মেনে চলি। লেখালেখি আর সেলাইয়ে আমি প্রতিদিন ২-৩ ঘন্টা সময় দেই। আমার জন্য, এটাই ভালোবাসা।

আমার গল্পটা খুব পুরনো, সাধারণ। আমি এটা 'সফলতা'র মাঝে বন্দি করে ফেলতে চাই না। আমার বেশিরভাগ কাজই পরিবার আর বন্ধুদের জন্য। মাঝে মাঝে আমার অবাক লাগে কেন মানুষ আমার পুটলি ব্যাগগুলো কিনছে। তবে হ্যাঁ আমি আমার কাজকে ভালোবাসি। তাই, আমি সফলতা হিসেবে বলতে চাই আমি যে কাজ করছি সেটাকে। কারণ যে কাজটি আপনি না ভালোবেসে করেন সেটা একটা মৃত্যুবোঝা বৈ কিছু নয়। 

তথ্যসূত্র: 'ইন্ডিয়ান উইমেন ব্লগ' এর সাথে লতিকার ইন্টার্ভিউয়ের অনুবাদ 

ওডি/এএন 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড