• মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

আজ 'বাংলা ভাষা শহীদ' দিবস

  আহমাদ ইশতিয়াক ১৯ মে ২০১৯, ১৪:৫১

আসামের বাঙালি জনতা
২০ মে সকালে রাস্তায় নেমে আসে আসামের বাঙালি জনতা (ছবি: সংগৃহীত)

আজ ১৯ মে। 'বাংলা ভাষা শহীদ' দিবস। ১৯৬১ সালের আজকের এই দিনে আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন ১১ জন বীর। তার আগে হামলায় নিহত হয়েছিলেন নয়জন বাঙালি। 

আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা ভাষাকে রাজ্যের কেন্দ্রীয় ভাষা না করার প্রতিবাদ। অথচ আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠই বাঙালি। অসমীয়াকে করা হলো রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা। ঠিক ফিরিয়ে আনল ১৯৪৮ এর পূর্ব পাকিস্তানে। 

১৯৬০ সালের এপ্রিলে যেদিন আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে অসমীয়া ভাষাকে প্রদেশের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার একটি প্রস্তাবের সূচনা হলো সেদিনই অসমীয়রা দল বেঁধে হামলা চালালো বাঙালিদের ওপর। জুন মাস ও সেপ্টেম্বর মাসের এই হামলায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে যায়। বহু মানুষ পালিয়ে যায় উত্তর পূর্বে। 

হামলার পর গঠিত হলো তদন্ত কমিশন। যে কমিশনের বিবরণীতে দেখা যায় কেবল কামরুপ জেলাতেই নিষ্ঠুর কায়দায় হত্যা করা হয়েছে ৯ বাঙালিকে। কয়েক হাজার ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়েছে অসমীয় উগ্রবাদীরা। এতো সব হামলা আর উগ্রবাদের  মধ্যেই তৎকালীন আসামের মুখ্যমন্ত্রী  বিমলা প্রসাদ চলিহা উত্থাপন করলেন অসমীয়াকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানের প্রস্তাব। একমাত্র বিধানসভায় উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক রণেন্দ্রমোহন দাস এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, অন্যদিকে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়ে গেল বিধানসভায়। 

এদিকে ফুঁসছে আসামের বাঙালিরা। বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও অসমীয়াই একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা। প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল আসামের বাঙ্গালীরা। বাঙালিদের ওপরে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ নামক সংগঠনের জন্ম হয়। অসম সরকারের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ১৪ এপ্রিল তারিখে শিলচর, করিমগঞ্জ আর হাইলাকান্দির বাঙালিরা সংকল্প দিবস পালন করেন। 

২৪ এপ্রিল কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ একপক্ষ দীর্ঘ একটি পদযাত্রা শুরু করেছিল। ২ মে তে শেষ হওয়া এই পদযাত্রাটিতে অংশ নেওয়া সত্যাগ্রহীরা প্রায় ২০০ মাইল উপত্যকাটির গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচার চালিয়েছিলেন। পদযাত্রার শেষে পরিষদের মুখ্যাধিকারী রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা করলেন, যদি ১৩ এপ্রিলের  মধ্যে বাংলাকে সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা না হয়, ১৯ মে তে তাঁরা টানা হরতালের ডাক দিবেন। তাঁদের দাবি যদি না মানা হয় আসাম সরকার বুঝবে আমরা ভাষার জন্য কি করতে পারি। 

১২ মে তে আসামে যুদ্ধাবস্থার সূচনা হলো যেন! বাঙালিদের হঠাতে আসামের রাজ্য সরকার পরিকর। কিছুতেই সহ্য করা যাবেনা। পুলিশ, অসম রাইফেল আর মাদ্রাজ রেজিমেন্ট সেদিন সকাল থেকে  শিলচরে ফ্ল্যাগ মার্চ করলো। এর মধ্যে বারবার মিটিং বসছে কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদের। কিন্তু আবার বাঁ হাত ঢুকানোর আসামের রাজ্য সরকার। 

১৮মে অসম পুলিশ আন্দোলনের তিনজন বিখ্যাত নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভূষণ চৌধুরী ও নলিনীকান্ত দাসকে গ্রেফতার করে। 

১৯ মে আন্দোলনের মূল দিন। সকাল থেকেই শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জে  হরতাল শুরু হয়। সঙ্গে প্রতিবাদে সরকারী প্রতিষ্ঠানর উপর পিকেটিং। করিমগঞ্জে বাঙ্গালীরা আন্দোলনে  সরকারী কার্যালয়, রেলওয়ে স্টেশন, কোর্ট ইত্যাদিতে পিকেটিং করলেন। শিলচরে রেলওয়ে স্টেশনে সত্যাগ্রহ পালিত হয়। ভোর সাড়ে পাঁচটার ট্রেনটির একটিও টিকিট বিক্রি হয় নি। সকালে হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে অতিবাহিত হয়েছিল। 

বিকেল ৪টার সময়সূচির ট্রেনটির সময় পার হওয়ার পর হরতাল শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু বিকালে স্টেশনে অসম রাইফেল এসে উপস্থিত হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে  অসম রাইফেল নজন সত্যাগ্রহীকে কাটিগোরা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের একটি ট্রাক শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের পাশ দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিল । আন্দোলনকারীরা গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে দেখে তীব্র প্রতিবাদ করে। ভয় পেয়ে ট্রাকচালক সহ পুলিশরা বন্দীদের নিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর কোনো এক লোক ট্রাকটি জ্বালিয়ে দেয়। যদিও লোকটি আন্দোলনের নয় বলে সকলের ধারণা। 

দুপুর আড়াইটায় আন্দোলনকারী বাঙালিদের হঠাৎই নামলো প্যারামিলিটারি বাহিনী। প্রথমে আন্দোলনকারীদের লাঠিচার্জ ও বেয়নেট চার্জ করে। জবাবে আরও ফুঁসে উঠে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারীরা। স্টেশনের বাইরেও যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারাও ঢুকে যায় আন্দোলনে। সাত মিনিটের মধ্যেই গণহারে ব্রাশফায়ার শুরু করে প্যারামিলিটারি ও পুলিশ। মুহূর্তেই ৯ জন বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিলেন। ৩ জন আহত হলেন। পরে সেই তিনজনের দুজন শহীদ হয়েছিলেন। এর জবাবে পুরো আসাম গর্জে উঠে। 

২০ মে সকালে রাস্তায় নেমে আসে আসামের বাঙালি জনতা। শহীদদের লাশ নিয়ে শোকমিছিল বের করে মানুষেরা। প্রতিবাদ জানাতে মানুষ রাস্তায় শুয়ে পড়ে। শিলচরের ঘটনার পর আসাম রাজ্য সরকার বাধ্য হয় বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করতে। 

বাংলা ভাষা শহীদ দিবসে আসামের সকল ভাষা শহীদদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা। 

ওডি/এএন 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড