• মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন

প্রথম শহীদ বিপ্লবী নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে পারব, নিতে মোটেই মায়া হবে না

নাবিলা বুশরা  
০৫ মে ২০১৯, ১২:০৯

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
প্রথম শহীদ বিপ্লবী নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে প্রত্যক্ষ হোক বা পরোক্ষ- দুইভাবেই নারীর অবদান অনেক। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগের কৃষক আন্দোলন থেকে অগ্নিযুগের (১৯০১-৪০ সাল) বিপ্লবী আন্দোলনের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য। অগ্নিযুগের প্রথম পর্বে বিপ্লবী সংগ্রামে নাম ছিল ননীবালা, দুকড়িবালা, পরবর্তীতে ইন্দুমতী দেবী, ধলঘাটের সাবিত্রী দেবী প্রমুখের। এদেরই পদচিহ্ন অনুসরণ করে আবির্ভাব হয়েছিল আরেক অগ্নিকন্যা প্রীতিলতার।

প্রীতিলতা শহীদ হয়েছিলেন নিজ মাতৃভূমিকে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে। আরও নারী সৈনিক থাকলেও মাস্টারদা সূর্যসেনের ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি চট্টগ্রাম শাখার একমাত্র নারী সেনানীর নাম ছিল প্রীতিলতা। নিজ মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য মাত্র ২১ বছর বয়সে যে জীবনপ্রদীপ নিভে গিয়েছিল তাঁর শিখা আজও সমুজ্জ্বল।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এই অগ্নিকন্যার পুরো নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। মা আদর করে ডাকতেন 'রাণী' বলে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে ১৯১১ সালের ৫ মে জন্ম। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই গ্রাম ছিল বিপ্লবীদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের প্রধান কেরানি। মা প্রতিভাদেবী ছিলেন গৃহিণী। এই দম্পতির ছিল ছয় ছেলেমেয়ে। মধুসূদন, প্রীতিলতা, কনকলতা, শান্তিলতা, আশালতা ও সন্তোষ।

প্রীতিলতা

প্রীতিলতার জন্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ। ভিটা বাড়ির কোন চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই। (ছবি: উইকিপিডিয়া)

প্রীতিলতার লেখাপড়ার হাতেখড়ি বাবা-মায়ের কাছেই। স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর হওয়ায় বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে ১৯১৮ সালে ওই সময়ের অন্যতম নারী শিক্ষালয় ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করান। এই নামকরা স্কুলে প্রতিটি শ্রেণীতে নিয়মিত তিনি প্রথম কিংবা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। অষ্টম শ্রেণীতে প্রীতিলতা বৃত্তি পান।

সনদ

প্রীতিলতার ম্যাট্রিকুলেশন পাশের সনদ। (ছবি: উইকিপিডিয়া)

১৯২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের কোনো এক সন্ধ্যায় রানীকে (প্রীতিলতা) তাঁর বড়দা মধুসূদন বললেন, ‘আজ রেল শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন দেয়ার জন্য বিপুল অঙ্কের টাকা ব্রিটিশ কর্মচারীরা ঘোড়ার গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছিল। ওই গাড়িতে দুজন পুলিশও ছিল। কিন্তু হঠাৎ দিনের বেলায় বড় রাস্তার ধারে চারজন লোক পিস্তল হাতে সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামালেন। তাঁরা গাড়ি থেকে সবাইকে নামিয়ে দিয়ে টাকাসহ গাড়ি নিয়ে চম্পট দিলেন। পরে জানা গেল ওই লোকগুলো ডাকাত নয়, স্বদেশী। স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁরা কাজ করছেন। তাঁরা মৃত্যুকে পরোয়া করেন না।’

স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের এই দুর্ধর্ষ ডাকাতির কথা শুনে সেদিনের সেই কিশোরী রানী দারুণভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন।

এই ঘটনার ঠিক এক মাস পর স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের আস্তানায় হামলা চালায় পুলিশ। দুই পক্ষের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। গোলাগুলিও চলে দীর্ঘ সময় ধরে। ঘটনার শেষে জানা গেল স্বদেশী দলের দুই কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এদের মাঝে একজন উমাতারা ইংরেজি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সূর্যসেন, অন্যজন পোস্ট অফিসের কেরানি অম্বিকা চক্রবর্তী।

দুই বন্দিকে রহমতগঞ্জের রাস্তা দিয়ে জেএম সেন হলের পাশ দিয়ে গরুর গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বন্দিদের আটক করে নিয়ে যাওয়ার এ দৃশ্য এক সহপাঠিনীর বাসার জানালার ধারে বসে দেখছিলেন রানী। উমাতারা স্কুলে পাঠরত সহপাঠিনীর ভাইটি সে সময় বলে ওঠে, ‘ওই তো আমাদের মাস্টারমশাই! চাদর গায়ে বসে আছেন। উনি আমাদের অঙ্কের মাস্টার!’ কথাটি শুনে সবাই বেশ অবাক হলেন। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতে তাদের নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাদের উপর ক্রমাগত চড়, লাথি মারছিল। ক্লান্ত অবস্থায় দুজনেই গাড়িতে ঢলে পড়ছিলেন। এই দৃশ্য দেখে রানী অবাক হওয়ার চেয়ে কষ্ট পেলেন বেশি। বাড়ি গিয়ে মা-বাবাকে তিনি অনুরোধ করলেন মাস্টারদাকে দেখে আসার জন্য। কিন্তু বাবা সরকারী চাকুরীজীবী হওয়ায় রানীর অনুরোধ রাখতে পারেননি।

কিছুদিন পর কলকাতা থেকে বিখ্যাত ব্যারিস্টার যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত সূর্যসেন ও অম্বিকা চক্রবর্তীর পক্ষ সমর্থন করে চট্টগ্রাম আসেন। এ মামলার রায় স্বচক্ষে দেখার জন্য কোর্টে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমান। মামলার রায়ে তাদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ঊষাদির সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই মামলার ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে অনেক কিছুই জানতে পারেন প্রীতিলতা। তারপর থেকে বিভিন্ন বই পড়তে শুরু করেন। এরপর প্রীতিলতার দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান করার গভীর ইচ্ছার কথা বলেন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত বিপ্লবীদলে মহিলা সদস্য গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কোনো মেয়েদের সাথে মেলামেশা করাও বিপ্লবীদের জন্য নিষেধ ছিল। প্রীতিলতা ঢাকায় যখন পড়তে যান তখন “শ্রীসংঘ” নামে একটি বিপ্লবী সংঘঠনের সাথে পরিচিত হন। শ্রীসংঘের “দীপালী সঙ্ঘ” নামে একটি মহিলা শাখা ছিল। এই দলটি প্রকাশ্যে লাঠিখেলা, কুস্তি, ডনবৈঠক, মুষ্টিযুদ্ধশিক্ষা ইত্যাদির জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ক্লাব তৈরি করেছিল। লীলা নাগের (বিয়ের পর লীলা রায়) নেতৃত্বে এই সংগঠনটি নারীশিক্ষা প্রসারের জন্য কাজ করত। গোপনে তাঁরা মেয়েদের বিপ্লবী সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার কাজও করত। এখান থেকেই প্রীতিলতার বিপ্লবী কাজকর্ম শুরু হয়।

এখানে মাস্টারদার নির্দেশে এক বিপ্লবী চক্র গড়ে তোলেন প্রীতিলতা। এতে যোগ দিলেন অনেক মেয়ে সদস্য। তাঁদের মূল কাজই ছিল অর্থ সংগ্রহ। এই অর্থ প্রীতিলতা পাঠাতে লাগলেন চট্টগ্রামে। কলকাতার এক গোপন কারখানায় তখন তৈরি হয় বোমার খোল। মাস্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী সেই বোমার খোল সংগ্রহ করেন প্রীতিলতা।

১৯২৯ সালে পূজার ছুটিতে কল্পনা দত্ত, সরোজিনি পাল, নলিনী পাল, কুমুদিনীকে নিয়ে প্রীতিলতা চট্টগ্রাম এসে বোমার খোলগুলো পৌঁছে দেন বিপ্লবীদের হাতে। মাস্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী প্রীতিলতা এর পর প্রকাশ্য বিপ্লবী কাজে সরাসরি যুক্ত হন। অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজের ভারও তাঁকে নিতে হয়। কলকাতায় যে বিপ্লবী চক্র গঠন করা হয়েছে, তাঁদের সব ধরনের প্রশিক্ষণও প্রীতিলতাকে দিতে হতো।

মূর্তি

চট্টগ্রামের, পটিয়ার ধলঘাটে বীরকন্যা প্রীতিলতা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ২০০৫ সনের ২২ শে ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত প্রীতিলতার আবক্ষ মূর্তির স্থিরচিত্র। (ছবি: উইকিপিডিয়া)

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম দখল করা হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামে ইংরেজ শাসন অচল হয়ে গেল। টেলিগ্রাফ থেকে শুরু করে জেলার সকল টেলিফোন বিকল, সরকারি অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, রিজার্ভ পুলিশ ছত্রভঙ্গ ও রেললাইন উপড়ে ফেলা হলো। এ সময় প্রীতিলতা কলকাতায় ছিলেন। বিএ পরীক্ষা শেষে মাস্টারদার নির্দেশে স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসেন তিনি। বিএ পাস করে ১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম অপর্ণাচরণ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন প্রীতিলতা। এ সময় নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আরও বেশি বিপ্লবী কাজে সক্রিয় হন।

১৯৩২ সালের মে মাসে প্রীতিলতার জন্মস্থান ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে মাস্টারদার সাথে তাঁর সহযোগীদের গোপন বৈঠকের সময় ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে বিপ্লবীদের বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে প্রাণ হারান নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। প্রীতিলতাকে সাথে নিয়ে বাড়ির পাশে ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন সূর্যসেন। মাস্টারদার পরামর্শে পরদিন থেকে স্কুলের কাজে যোগদান করেন প্রীতিলতা। সে রাতেই সাবিত্রী দেবীর বাড়িটি পুড়িয়ে দেয় পুলিশ। এ ঘটনার পর প্রীতিলতার ওপর পুলিশের সন্দেহ বাড়তে থাকে। আত্মগোপনে চলে যান তিনি।

আত্নাহুতি

আত্মাহুতির স্থানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ২০১২ সালের ২ অক্টোবর প্রীতিলতার ব্রোঞ্জমূর্তি উন্মোচিত হয়। (ছবি: উইকিপিডিয়া)

এদিকে অন্য একটি বিপ্লবী গ্রুপ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে ব্যর্থ হলে মাস্টারদা প্রীতিলতাকে সেটি পুনরায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে বলেন। এই জন্য কাট্টলি সমুদ্রসৈকতে বিপ্লবী দলকে মাস্টারদা সামরিক প্রশিক্ষণ দেন।

১৯৩২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করার জন্য দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকে পুরুষের বেশে রওনা দেন প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত। কিন্তু পথিমধ্যে পাহাড়তলীতে ধরা পড়েন কল্পনা দত্ত। প্রীতিলতা নিরাপদে নির্দিষ্ট গ্রামে এসে পৌঁছেন। তাঁর নেতৃত্বে এই গ্রামেই ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। আক্রমণের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে কাট্টলীর সাগরতীরে প্রীতিলতা ও তাঁর সঙ্গীদের অস্ত্র বিষয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়।

ক্লাব

তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব। (ছবি: উইকিপিডিয়া)

১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের রাত। এ রাতে প্রীতিলতার নেতৃত্বে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ সফল হয়। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় শত্রুর গুলিতে আহত হন প্রীতিলতা। আহত অবস্থায় ধরা পড়ার আগেই সাথে থাকা সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন তিনি।