• বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

বাংলা সনের জন্মকথা

  সৈয়দ মিজান ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:৫৫

আকবর
বাংলা সনের সূচনা করেছিলেন মোঘল সম্রাট আকবর। (ছবি : সম্পাদিত)

পয়লা বৈশাখ বাংলা বর্ষ পঞ্জিকার প্রথম দিন। প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেখানেই বাঙালি জাতিসত্ত্বার মানুষ আছে সেখানেই এই দিনটি উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হয়ে থাকে। দিনভর নানা আয়োজনে দিনটি উদযাপন করলেও পয়লা বৈশাখের ইতিহাস জানা নেই অনেকেরই। কীভাবে হয়েছিল বাংলা বছরের সূত্রপাত? চলুন জেনে নেওয়া যাক পয়লা বৈশাখের ইতিহাসের আদ্যোপান্ত।

ইতিহাসের পাতা থেকে

“আইলো নতুন বছর লইয়া নব সাজ, কুঞ্জে ডাকে কোকিল-কেকা বনে গন্ধরাজ” মৈমনসিংহ গীতিকায় এভাবেই পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে বাংলা নতুন বছরের। প্রাকৃতিকভাবেই এই অঞ্চলটি কৃষি প্রধান। ফসল ফলানোর হিসাব রাখার জন্য এ অঞ্চলের মানুষ ব্যবহার করত ভিন্ন ভিন্ন বর্ষপঞ্জী। বিশেষ করে শকাব্দের ব্যবহার ছিল একটু বেশি। তবে কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে বারবার শাসন করে গেছে ভিনদেশি পরাশক্তি। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মুসলমানদের আগমনের পর থেকে এই অঞ্চলে হিজরি বর্ষপঞ্জী অনুসারে দিন মাসের হিসাব রাখা হতো। সরকারি সকল হিসাব পত্তর করতে ব্যবহৃত হতো এই হিজরি সাল। কিন্তু কৃষি অপ্রধান আরব ভূমির চন্দ্র বর্ষের গণনার সাথে সৌর হিসাবের একটা গোলমাল লেগেই ছিল। বাৎসরিক খাজনা আদায় করতে গেলে দেখা দিত নানা সমস্যা।

কৃষকদের প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন সময়ে খাজনা দিতে বেশ বেগ পেতে হতো। এই সমস্যা এভাবেই চলে আসছিল যুগ যুগ ধরে। এটির অবসান ঘটে মোঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহম্মদ আকবরের সময়ে এসে।

প্রজাদের খাজনা দেওয়ার এই সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবর একটি নতুন বর্ষপঞ্জী উদ্ভাবনের নির্দেশ দেন। এর জন্য তিনি দায়িত্ব অর্পণ করেন তার দরবারের পণ্ডিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে। আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজী ছিলেন সম্রাট আকবরের সভার নবরত্নের একজন।

তিনি চান্দ্র বছরকে রূপান্তর করলেন সৌর বছরে। সৌর বছরের সাথে চান্দ্র বছরের ১১ দিন করে পার্থক্য হয় প্রতি বছর। যেমন ধরা যাক গ্রীষ্মকালের যে দিনটিতে একই সাথে পয়লা বৈশাখ আর পয়লা মহররম হলো পরের বছর আবার একই দিনে তা হবে না। এর কারণ সৌর বছর হয় ৩৬৫ দিনে আর চান্দ্র বছর শেষ হয় ৩৫৪ দিনে।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সনের উদ্ভাবন করা হয়। হিজরি হিসাবে সেটি ছিল ৯৯২ হিজরি। কিন্তু সালের গণনা ধরা হয় উদ্ভাবনের ২৯ বছর আগে ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে। এই সালে সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। এ বিষয়ে একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, হিজরি সাল গণনার সাথে মিল রেখে নতুন পঞ্জিকার হিসাব শুরু হয়েছিল ৯৬৩ ফসলি সন হিসেবে। পরবর্তীতে এই ফসলি সনই বঙ্গাব্দে রূপ লাভ করে।

এর আগে প্রচলিত শকাব্দ বর্ষপঞ্জিতে প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরিতে হিজরি বছরের প্রথম মাস মহররম পড়েছিল বৈশাখ মাসে। সেই হিসাবেই বৈশাখকেই বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই সাথে পয়লা বৈশাখকে ধরা হয় বছরের প্রথম দিন।

মোঘল আমলে নতুন বছরকে ঘিরে বেশ কিছু প্রথা প্রচলিত ছিল। চৈত্র মাসের শেষ দিনটি বছরের শেষ দিন হিসেবে এই দিনের মধ্যে সব খাজনা আদায় করা হতো। প্রজাদের প্রশান্তির জন্য শাসকরা বছরের প্রথম দিনটিতে নানা রকম মিষ্টান্ন দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করতেন। এই দিন ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হতো হালখাতা অনুষ্ঠানের।

বারো মাসের নাম

মূলত হিজরি বর্ষ অনুসারে বাংলা সাল গণনা শুরু হলেও ইতিহাস থেকে জানা যায় এর মাসের নামগুলো নেয়া হয়েছিল শকাব্দ বর্ষ পঞ্জিকা থেকে। এই নামগুলো করা হয়েছে নক্ষত্রমণ্ডলে চাঁদের আবর্তনে বিশেষ কিছু তারকার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। যে সব নক্ষত্রের নামে বাংলা মাসের নাম এসেছে সেগুলো হলো-

বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। বাংলা মাসের এই নামগুলো হচ্ছে-

বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে বৈশাখ মাস।

জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নামে জ্যৈষ্ঠ মাস।

আষাঢ় মাস এসেছে উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে।

শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে নাম দেয়া হয়েছে শ্রাবণ মাসের ।

ভাদ্র মাসের নামকরণ উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে।

অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম নিয়ে আশ্বিন মাস।

কার্তিক মাস কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে।

অগ্রহায়ণ মাসের নামটি একটু বিবর্তিত হয়ে এসেছে। মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম অনুসারে মার্গশীরষ থেকে এই নামটি এসেছে।

পৌষ মাসের নাম পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে।

মঘা নক্ষত্রের নামে মাঘ মাসকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফাল্গুন মাস উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে।

আর চৈত্র মাস চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে হয়েছে বলে ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলা সনে দিনের শুরু ও শেষ হয় সূর্যোদয়ে । ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির শুরু হয় যেমন মধ্যরাত হতে।

ওডি/এসএম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড