• বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

পুণ্যাহ থেকে হালখাতা

  নাজমুল হাসান সাগর ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৪০

মোঘল আমলের বাংলা নববর্ষ
ছবি : সংগৃহীত

পুণ্যাহ, তৎকালীন বঙ্গীয় অঞ্চলে জমিদারি ও নবাবী শাসনকালীন সময়ে রাজস্ব আদায়ের জন্যে বাৎসরিক একটি বন্দোবস্ত ও উৎসবের নাম। বর্তমানে এটি একটি বিলুপ্ত ও ইতিহাসে নামসর্বস্ব উৎসব হিসেবে পরিচিত। এই উৎসবটি বিলুপ্ত হলেও এটার আঙ্গিকে এখনও গ্রামগঞ্জে হালখাতা নামে একটি অনুষ্ঠান করা হয়। সেখানে উৎসবের আমেজ না থাকলেও আনুষ্ঠানিকতা থাকে বেশ।

পুণ্যাহ ছিল রাজস্ব আদায় এবং বন্দোবস্ত সংক্রান্ত বিষয়ের প্রাক-ব্রিটিশ সময়ের একটি পদ্ধতি। যে ব্যবস্থায় সরকার কর্তৃক সকল জমিদার, তালুকদার, ইজারাদার এবং অন্যান্য রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদের বছরের নির্দিষ্ট দিনে একটি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী বছরের রাজস্ব আদায় এবং নতুন বছরের বন্দোবস্ত প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো।

ইতিহাসেও সওয়ার হয়ে জানা যায়, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পুণ্যাহ উৎসব বাংলা নববর্ষের সমার্থক হিসেবে প্রতি বছর বাংলা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের ১ তারিখে নিয়মিতভাবে পালন হয়ে আসছে। ১৯৫০ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলোপ সাধনের পাশাপাশি পুণ্যাহ উৎসবের বিলুপ্ত ঘটে।

এখন কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে পুণ্যাহ উৎসব কিন্তু পুণ্যাহের আদলে যে হালখাতা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে নিশ্চুপ বেঁচে আছে ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবটি। পুণ্যাহ যেমন বিলুপ্ত প্রায় উৎসব এবং পুণ্যাহর বিবর্তনই যে এখন হালখাতা সেটা জানতে পারবো আমরা নিচের ইতিহাস ভিত্তিক আলোচনা থেকে। আমরা এও জানবো বিবর্তিত হালখাতাও আজ বিলুপ্তির পথে কি না!

ইতিহাস বলে পুণ্যাহের গর্ভেই এসেছে হালখাতা :

নওয়াব দরবার পরিচালিত পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে যে সকল ব্যক্তিগণ নওয়াবকে সন্তুষ্ট করতে পারতো তাদেরকে সম্মানসূচক খিলাত বা পোশাক দান করা হতো। এইভাবে জমিদারগণ ও অন্যান্য ভূস্বামীগণ তাদের রায়ত বা প্রজাবর্গকে নিয়ে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান পালন করতেন। রায়তগণ বিগত বছরের বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করতেন এবং নতুন বছরের বন্দোবস্ত গ্রহণ করতেন। রায়তগণ জমিদারের কাচারিতে একত্রিত হয়ে জমিদার অথবা তার নায়েবের নিকট থেকে পান বা পানপাতা গ্রহণ করতেন।

এ উপলক্ষে নৃত্য, সঙ্গীত, যাত্রা, মেলা, গবাদি পশুর দৌড়, মোরগযুদ্ধ এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। মুগল আমলে পুণ্যাহ উৎসবের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ছিলো না। যখন থেকে এই উৎসব রাজস্ব বন্দোবস্ত এবং রাজস্ব সংগ্রহের সাথে যুক্ত হলো, তখন থেকেই পুণ্যাহ উৎসবের তারিখ নির্ধারিত করা হলো।

মূলত প্রধান ফসল তোলার সময়কে সাধারণভাবে এই উৎসবের জন্যে নির্ধারিত করা হতো। এ বিষযে মুর্শিদকুলী খান একটি নতুন রীতি প্রচলন করেন। এই রীতি অনুসারে চৈত্র মাসে (বাংলা সনের শেষ মাস, এর অনুরূপ ইংরেজি সালের মাস হলো মার্চ-এপ্রিল) ফসল তোলা শেষ হওয়ার পর পুণ্যাহ উৎসব পালন করা হতো।

উৎসব শেষে সংগৃহীত রাজস্ব ভারতের দিল্লিতে প্রেরণ করা হতো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল উৎপাদন হ্রাস পেলে পুণ্যাহ উৎসবেই রাজস্ব মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো। পুণ্যাহ বলতে সমস্ত রাজস্বের আদায়কে বোঝাত না; অনাদায়কৃত রাজস্ব মওকুফ কিংবা ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত করার ব্যবস্থাও এই উৎসবে করা হতো।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে রায়তগণ বকেয়া রাজস্ব মওকুফ পেত। এছাড়াও, চাষাবাদের জন্যে তাদেরকে তাকাবি বা ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হতো, পুণ্যাহ উৎসবে সে সকল ঋণের লেনদেনও সম্পন্ন করা হতো।

১৭৬৬ সালে, ইংরেজদের দেওয়ানি লাভের পর, প্রথম পুণ্যাহ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় মুর্শিদাবাদ কোর্টে ইংরেজদের রাজনৈতিক আবাসস্থল মতিঝিলে। লর্ড ক্লাইভ এ উৎসবের সভাপতিত্ব করেন। তিনি এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং প্রতিবছর এ উৎসব পালনের পক্ষে ছিলেন। তবে কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স ফোর্ট উইলিয়ম সরকারকে এ পুণ্যাহ উৎসব পালন না করার নির্দেশ দেন।

চলে গেছে ইংরেজরা, নেই আর জমিদারি বা নবাবী শাসন ব্যাবস্থাও। তাই হারিয়ে গেছে জমিদার, নবাব বা ইংরেজদের রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা পুণ্যাহ উৎসব। তারপর শুরু হয় মহাজনি ঋণ ও গ্রামগঞ্জের বড় বড় দোকানিদের থেকে এক শ্রেণির আস্থাভাজন ক্রেতা ও পাইকারি ক্রেতাদের বকেয়া মালামাল খরিদ করার ব্যবস্থা। একমাত্র পাইকারি ব্যবসায়ীরা ছাড়া অন্যান্য ক্রেতারা নেহায়েত বিপদে না পড়লে বাকিতে মালপত্র কেনে না কেউ।

যারা এমন বাকিতে মালপত্র কেনে তাদের থেকে বছরের বৈশাখের ১ তারিখ থেকে শুরু করে পুরো মাস বকেয়া আদায়ের জন্যে যে আনুষ্ঠানিকতা পালন করে মহাজন ও দোকানিরা সেই আনুষ্ঠানিকতাই মূলত হালখাতা নামে পরিচিত।

বকেয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে হালখাতা অনুষ্ঠানে মহাজন ও দোকানিরা তাদের ক্রেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্যে রাখে হালকা খাবার ব্যবস্থা থেকে ভুরিভোজের ব্যবস্থাও। হালখাতার দিন সকাল থেকেই দোকানিরা সকল কাজ বন্ধ রেখে বকেয়া পরিশোধ করতে আসা ক্রেতাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকে। ক্রেতারা বকেয়া পরিশোধ করে, খাওয়াদাওয়া শেষ করে তৃপ্তির হাসি নিয়ে পান মুখে বাড়ির পথ ধরে।

এখনো গ্রামগঞ্জে হালখাতার দিনে সারা দিন মাইক বাজিয়ে গান বাজনা চালানো হয়, দূর দূরান্তের মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অবশ্য হালখাতার প্রায় দিন পনের আগেই চিঠির মাধ্যমে মহাজন ও দোকানিরা বকেয়াধারী ক্রেতাদের জানিয়ে দেয় তাদের বাকির সম্ভাব্য হিসেব। এই চিঠিতেও পাওয়া যায় বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও কৃষ্টির ছোঁয়া।

সময়ের সাথে ইতিহাসে সওয়ার হয়ে আর পরিবর্তনের খোঁচায় পুণ্যাহ বিলুপ্ত হয়ে হালখাতায় পরিণত হয়েছে। হয়তো এই তথ্য, প্রযুক্তির যুগে পরিবর্তিত হালখাতাও হারাবে তার উদযাপন, আয়োজন ও প্রয়োজনের রঙ। হালখাতাও পরিণত হবে ইতিহাসে, বিলুপ্তির ইতিহাস হবে সেটাও।

ওডি/এআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড