• রবিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

হাজারও শিশুর কান্নায় তৈরি হয় চকলেট!

  ডা. মোঃ সাইফুল ইসলাম ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:০৩

শিশু
ছবি : সম্পাদিত

চকলেট এক ধরনের খাবার যা কোকো গাছের বীজ থেকে তৈরি করা হয়। এই চকলেট প্রায় সকলেই কম-বেশি পছন্দ করে। ভালবাসার মানুষ অভিমান করেছে? মান ভাঙ্গাতে নিঃসন্দেহে উপহার দিতে পারেন কিছু চকলেট। আপনার ছোট শিশু কিছু চাইলেই দিতে পারেন একটা প্যাকেট চকলেট। দেখুন কতটা খুশি হয় শিশুটি।

চকলেট উপহার পেলে প্রেয়সীর মান ভাঙ্গে, যে কারোরই মন খুশি ভরে ওঠে। কিন্তু কালো চকোলেটের পিছনের কালো ঘটনা জানলে এই চকলেট খাওয়ার পূর্বে হয়তো মনটা একটু হলেও বিষন্ন হবে।

বিশ্বের অধিকাংশ কোকো গাছ জন্মে পশ্চিম আফ্রিকার ক্রান্তীয় অঞ্চল, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকায়। লাতিন আমেরিকার মায়া সভ্যতা প্রথম কোকো বীজ থেকে তৈরিকৃত চকলেট পানীয়ের স্বাদ পেয়েছিল। তখন পানীয় হিসেবেই এটি পান করা হতো।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা ও আইভরিকোস্ট বিশ্বের শতকরা ৭০ ভাগেরও অধিক কোকো সরবরাহ করে থাকে। এখান থেকেই বিশ্বের অনেক নামিদামি চকলেট কোম্পানি চকলেট ক্রয় করে থাকে।

পশ্চিম আফ্রিকা দরিদ্র দেশ হওয়ায় সেখানকার শিশুরা খুব অল্প বয়সেই কাজ করে পরিবারকে সহায়তা করে। তাই অনেক শিশুর পুরো জীবনটাই কেটে যায় এই চকলেট ফার্মে। কারণ তাদেরকে মোটা অংকের উপার্জনের লোভ দেখিয়ে পাচার করা হয়। পাচার হওয়ার পর এই শিশুদের লেখাপড়াও শেষ হয়, শেষ হয় ভবিষ্যত স্বপ্ন। অনেক বাবা-মা অর্থের অভাবেও তাদের বাচ্চাকে কোকো ফার্মে বিক্রি করে দেয়।

কোকো ফার্মে কাজ করা শিশু শ্রমিকদের বয়স ১২-১৬ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। এমন কি মাত্র ৫ বছরের শিশুকেও কোকো বীজ সংগ্রহের কাজ করতে দেখা গিয়েছিল। শিশুদের মধ্যে আবার শতকরা ৪০ ভাগ থাকে মেয়ে।

একবার ভাবুনতো, আপনার মাত্র ৫ বছরের শিশুটির দ্বারা কি কি কাজ করা সম্ভব? ভাবুন আপনার ১২ বছর বয়সী শিশুর কথাই। এই সময়ে আপনার বাচ্চার হাতে নিশ্চয়ই বই, কলম দেখতে চান। অথচ কোকো ফার্মে কর্মরত শিশুদের হাতে থাকে চাপাতি! আরও থাকে করাত। এই যে শিশুদের হাতে এসব যন্ত্রপাতি তুলে দেওয়া হয়েছে, তা কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের পরিপন্থি।

ভোর ছয়টার দিকে বের হয়ে সন্ধ্যা অব্দি কাজ করতে হয় এই শিশুদের। এই শিশুরা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে, গাছে উঠে, কোকো পড বা শুঁটি সংগ্রহ করে বস্তায় ভরিয়ে টেনে নিয়ে যায়। এছাড়াও মাথাতেও নিতে হয়।

অ্যালে ডায়াবেট নামক এক কোকো দাসী কোকো ফার্ম থেকে মুক্তি পেয়ে জানিয়েছিল কোকো বীজ সংগ্রহের জন্য কতই না পরিশ্রম করতে হতো তাদের। ভারী কোকো বীজের বস্তা টানতে না পারলে বা মাথায় নিতে না পারলে তাদের মারাত্মকভাবে পেটানো হতো। পাচার হওয়া শিশুরা কোনো পারিশ্রমিকও পায় না। এছাড়াও খাবারও দেওয়া হয় খুবই কম পরিমাণে। কেউ পালাতে চাইলেও নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। এই শিশুদের অধিকাংশই আর তাদের পরিবারের দেখা পায় না।

আর এত সকল নির্যাতন চলে জনচক্ষুর অন্তরালে। কারণ কোকো চাষ হয় যেসব স্থানে সেসব স্থানে সর্ব সাধারণের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমন কী কোকো ফার্মে কোনো সাংবাদিককেও প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। তবে সম্প্রতি বৃহৎ কিছু সংগঠন ও সাংবাদিক সেখানে প্রবেশ করলে সরকারের দুর্নীতির কিছু চিত্র উঠে আসে। যেখানে মারাত্মকভাবে শিশু অধিকার বঞ্চিত করা হয়েছিল। ২০১০ সালে কোকো ফার্মে শিশু অধিকার বঞ্চনার তথ্য উঠে আসলে আইভোরিকোষ্ট সরকার তিনজন সাংবাদিককে আটকও করেছিল।

শিশুশ্রম, দাসত্ব, মানব পাচারের মতো মারাত্মক অন্যায় কাজ হলেও চকলেট ইন্ডাস্ট্রিরা দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তবে চকলেট কোম্পানিগুলোর সদিচ্ছা থাকলে এই শিশুদের পুনর্বাসন, আপন পরিবারে পাঠানো, প্রকৃত শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করে এই শিশুশ্রম বন্ধ করা যেত।

এই শিশুশ্রম বন্ধ করতে আমরা যারা চকলেট খাই তারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। শিশুশ্রম, দাসত্ব ও পাচার বন্ধ না হলে চকলেট খাওয়া বন্ধ করা যেতে পারে। কারণ চকলেট শাক-সবজি ও ফলমূলের মতো প্রয়োজনীয় খাবার নয় যে, তা আমাদের খেতেই হবে।

একবার ভেবে দেখুন, যে সময় আপনি আনন্দ-বিনোদন কিংবা প্রেয়সীর মান ভাঙানোর খেলায় মেতে উঠেছেন ঠিক সেই সময়েই হয়তো ঘানার কোনো এক শিশু চুরি হয়ে গেছে কোকো ফার্মে! তবে কি চকোলেটের রঙ্গিন মোড়ক ছুড়ে ফেলার দিন আসেনি?

তথ্যসূত্র : ফুডিস পাওয়ার ডট অর্গ, দ্যা গার্ডিয়ান, হাফিংটন পোস্ট। 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড