• শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ৫ মাঘ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

অন্যের বিষ চুরি করে বিষাক্ত হয় যে সাপ!

  ডা. মোঃ সাইফুল ইসলাম ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:৩৬

টাইগার কিলব্যাক
টাইগার কিলব্যাক সাপ

প্রাণিজগতের অনেক প্রাণী তাদেরকে শিকারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিষাক্ত পদার্থ নিঃসরণ করে। কিন্তু প্রাণিগুলোর তৈরিকৃত বিষগুলো জটিল রাসায়নিক উপাদান দ্বারা গঠিত হয়। ফলে তা তৈরি করতে প্রাণিগুলোর প্রচুর শক্তি ব্যয় করতে হয়। সুতরাং কেন প্রাণিগুলো এই বিষ তৈরির জন্য শরীরের শক্তি ক্ষয় করবে, যদি তা অন্যদের কাছ থেকে চুরি করা যায়?

প্রাণিজগতে অনেক প্রজাতির উজ্জ্বল বর্ণের বিষাক্ত ব্যাঙ রয়েছে যেগুলো তাদের বিষ চুরি করে গুবরে পোকা থেকে। আবার সামুদ্রিক স্লাগ রয়েছে যারা স্বেচ্ছায় জেলিফিসের শিকার হয়। এরপর জেলিফিসের স্টিং নিজস্ব অঙ্গে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে ও আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করে। প্রাণিদের এই স্বভাবকে বিষচোরা স্বভাব বলাই যায়, যেখানে প্রাণিরা আত্মরক্ষার জন্য ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী থেকে বিষ সংগ্রহ করে।

সর্বশেষ এই বিষচোরা প্রাণির তালিকায় নতুন যে প্রাণী যুক্ত হয়েছে জানা যায়, তা হচ্ছে টাইগার কিলব্যাক নামক একটি সাপ। Rhabdophis tigrinis সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম। এই সাপটিকে জাপানে পাওয়া যায়। সাপটি তার বিষকে আক্রমণের চেয়ে শিকারকে ঘায়েল ও প্রতিরক্ষার জন্যই বেশি ব্যবহার করে।

যখন এই সাপ কোনো কিছু থেকে ভীত হয় তখন ঘাড়ের পিছনে থাকা দুটো গ্রন্থি থেকে শিকার বা শত্রুর দিকে বিষ ছুড়ে দেয়। এই গ্রন্থি দুটোকে বলা হয় নিউক্যাল গ্ল্যান্ড বা গ্রন্থি। এই সাপের গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হওয়া বিষাক্ত তরলকে বলা হয় বাফেডিনোলাইডস (Bufadienolides)। এই বিষের ফলে শিকারের শ্বাসনালিতে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। এছাড়াও এর দ্বারা হৃৎপিন্ডও আক্রান্ত হয়। অবাক করা কথা হলো এই গ্রন্থিগুলোতে কোনো বিষ নিঃস্রাবী ও উৎপন্নকারী কোষ থাকে না। যেখানে অন্যান্য বিষাক্ত সাপের গ্রন্থিতে বিষ উৎপাদনকারী অঙ্গ থাকে।

সুতরাং মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে এই বিষ টাইগার কিলব্যাক সাপ কোথা থেকে পেল? প্রশ্নটির উত্তর রয়েছে এই প্রাণির খাদ্যাভ্যাস প্রক্রিয়ার ওপর। সাধারণত জাপানের ইশিমা দ্বীপের অধিকাংশ প্রাণী ব্যাঙকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে ভয় পায়। কারণ ব্যাঙগুলো থাকে বিষাক্ত। কিন্তু টাইগার কিলব্যাক সাপ বিষাক্ত ব্যাঙগুলোকেই খায়। যেখান থেকে এই সাপ সংগ্রহ করে বাফেডিনোলাইডস বিষ। ব্যাঙের বৈজ্ঞানিক নাম Bufonidae থেকে এই বিষের নামকরণ করা হয়েছে। কিলব্যাক সাপ তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য এই বিষ ব্যবহার করে।

আরও পড়ুন : সাপের বিষ যেভাবে কাজ করে

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ডমিনিওয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেবোরা হাচিনসন ও তার সহকর্মীরা জাপানের ইশিমা দ্বীপ থেকে টাইগার কিলব্যাক সাপ সংগ্রহ করেন। ডেবোরা তার গবেষণায় প্রমাণ পান, ইশিমা দ্বীপ থেকে সংগৃহীত যে সাপগুলো বিষাক্ত ব্যাঙ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে সেগুলোর ঘাড়ের গ্রন্থিতে বিষাক্ত তরল বাফেডিনোলাইডস রয়েছে। কিন্তু ব্যাঙ মুক্ত দ্বীপ থেকে সংগৃহীত সাপে এই প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক উপাদানটি পাওয়া যায় না। 

এরপর তিনি কিছু ডিম থেকে বাচ্চা ফোটান। তিনি দেখেন নতুন জন্ম নেওয়া বাচ্চাগুলোতেও এই বিষ থাকে না। তখন তিনি সেখানে কিছু বিষাক্ত ব্যাঙ ছেড়ে দেন। যখন সাপগুলো ব্যাঙগুলোকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে তখন তিনি আশ্চর্যজনক ফল পান। তিনি বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে সক্ষম হন।

তিনি আরও প্রমাণ পান ব্যাঙগুলোকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার আলাদা একটি প্রবণতা এই সাপগুলোর মাঝে দেখা যায়। কারণ হয়তো এরা বংশগতভাবেই শিখে নেয় বাঁচতে হলে ব্যাঙগুলো থেকেই প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক উপাদান গ্রহণ করতে হবে।

গবেষকরা আরও দেখতে পান, এই সাপগুলো ব্যাঙ থেকে যে বিষ চুরি করে তা নানা ধরনের জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও অধিক বিষাক্ত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ব্যাঙ থেকে প্রাপ্ত বিষ সাপের গ্রন্থিতে থাকাকালীন আরও বেশি মারাত্মক হয়।

এ কথা ঠিক বিষ সাপকে অধিকতর সাহসী তৈরি করে তোলে। আবার এই বিষ না থাকা সাপ সামান্য ভয় পেলেই দৌড়ে পালাতে চায়। অর্থাৎ বিষ কিন্তু সাপের আত্মরক্ষার জন্য মারাত্মক অস্ত্র সমতূল্য। তবে আজ পর্যন্ত এই অস্ত্র চুরি করার মতো এই একটি সাপের কথাই জানা যায়।

তথ্যসূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, নিউ সায়েন্টিস্ট ডট কম।
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড