• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

গোয়াল ঘরের পাশে পলিথিনের ঝুঁপড়িটাই ওদের থাকার ঘর!

  ফরিদ মিয়া, টাঙ্গাইল ৩১ অক্টোবর ২০১৮, ২০:১৭

টাঙ্গাইল
রেহেনা বেগমের ঝুপড়ি ঘর (ছবি : দৈনিক অধিকার)

সরকারের দেয়া বিনামূল্যের ঘর পেয়েছেন অনেকেই। আবার সুবিধাভোগী এমনও অনেকে রয়েছেন যাদের ঘর পাওয়ার কথা না থাকলেও তারাও সরকারের এমন সুবিধা ভোগ করছেন। 

তবে রেহেনা বেগমের চিত্র ভিন্ন কথা বলে। অনেকটা বেদনাদায়ক। গত বছর তার স্বামী মারা গেছেন। অভাবের তাড়নায় ঘরটাও বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। সব হারিয়ে ভিটে বাড়িতে এখন পলিথিনের তাবু। দেখতে অনেকটা অস্থায়ী বিশ্রামাগার মনে হতে পারে। অর্ধেকটা শোবার জন্য চৌকি রাখা। পাশের অর্ধেকে একটি গরু রাখার জায়গা। বলা চলে সংযুক্ত গোয়াল ঘরে থাকছেন তারা। 

রোদের তাপ, শীতের উষ্ণতা আর বৃষ্টির ফোটা সহজেই ভেতরে ঢোকে। নিরাপত্তা মোটেও নেই। এমন একটি ঝুঁপড়িতে গত চব্বিশ দিন ধরে রয়েছেন রেহেনা বেগম (কুলসুম) নামের ৬২ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা। পাশের আরেকটা চৌকিতে থাকছেন তার ৩৫ বছরের ছেলে মোশারফ। ১০ বছর বয়সি নাতি আসলামও থাকে ওদের সাথে। শিশু আর নারীসহ তিনজনের থাকার একমাত্র জায়গা এই পলিথিনের ঝুঁপড়ি।

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের কড়াইল-স্বল্পবড়টিয়া গ্রামে নজরে পড়ল বৃদ্ধার এমন এক আশ্রয়স্থল। উন্নয়নশীল এই দেশে যেখানে সরকার ঘরহীন মানুষকে বিনা মূল্যে ঘর দিচ্ছে সেই দেশে আজকের দিনে এমন অমানবিক দৃশ্য অনেকেরই নজর কেড়েছে। নানা শ্রেণির মানুষ কুলসুমের ঘরটি দেখতে গেলেও কারও মানবিক সাড়া পাওয়া যায়নি।

সরজমিনে গিয়ে কথা হয় কুলসুমের সাথে। গ্রামের সহজ সরল নারী রেহেনা বেগম। বছর হলো বিধবা হয়েছেন। স্বামীর নাম স্ত্রীর মুখে আনা যাবে না এমন বিশ্বাস এ যুগেও রেহেনার মধ্যে রয়েছে। অন্যকে দিয়ে স্বামীর নাম জানালেন “সোনা মিয়া”। গত বছরের এই দিনে মারা গেছেন সোনা মিয়া। 

অসহায় কুলসুম জানান, দিনমুজুর আর মাটি কাটার কাজে উপার্জন করতেন তার স্বামী সোনা মিয়া। তখন থেকেই কুলসুম আর সোনা মিয়ার পরিবারে অসচ্ছলতা। গত বছর অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি। এরপর তাদের ছেলে মোশারফও মাটি কেটে সংসার চালাতো। 

জোড়া তালির ছোট একটি ঘর থাকলেও তার অল্প আয়ে সংসার না চলায় ঘরটি বিক্রি করতে হয়। পরে মা, ছেলে, নাতি সবাই চলে যায় টাঙ্গাইল সদরের কাকুয়া চরে মোশারফের শ্বশুর বাড়ি। মোশারফের স্ত্রী আছমা পরিবারের একমাত্র সম্বল দুটি গরু রেখে মা-ছেলেকে তাড়িয়ে দেয়। কুলসুমের নাতনী মরিয়ম মায়ের কাছে থেকে গেলেও বাবার সাথে চলে আসে শিশু আসলাম। এরপর থেকেই ওই ঝুপড়িতে ওরা তিনজন থাকছেন।

এমন দৃশ্য দেখেও সরকারি বা বেসরকারি কোন প্রকার সহযোগিতা মেলেনি কুলসুমের ভাগ্যে। সরকার ঘরহীন মানুষকে ঘর তৈরি করে দিলেও কুলসুম পায়নি সরকারি ঘর। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কোন প্রকার সহযোগিতা পায়নি কুলসুম। না বয়স্ক ভাতা, না পেয়েছে ন্যায্য মূল্যের চালের কার্ড। না ভাগ্যে জুটেছে ভিজিডি কার্ড। যদিও মঙ্গলবার প্রতিবেশী আরজু মিয়া ধার স্বরুপ একটি ৫সিট টিনের একচালা ঘরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবুও ছেলে নাতি আর নিজের জন্য ওটাও যথেষ্ট হবেনা। 

কুলসুমের এই মুহূর্তে একটি থাকার ঘরের প্রয়োজন। কিন্তু কে পাশে দাঁড়াবে কুলসুমের ? কে তৈরি করে দিবে কুলসুমের থাকার ঘরটি। এভাবেই খোলা আকাশের নিচেই বা কদিন কাটবে কুলসুম? এমন প্রশ্ন স্থানীয়দের।

কুলসুম জানান, ছেলের মাটিকাটার কাজ প্রতিদিন থাকে না। তবুও যা পায় তা দিয়ে সংসার চলে না। শিশু নাতির সুরক্ষার জন্য হলেও তার একটি ঘরের প্রয়োজন। থাকার ঘরের জন্য তিনি সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

কুলসুমের পলিথিনের ঘরটি স্থানীয়দের নজরে আসলেও বিষয়টি জানা নেই স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের। দেউলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুল ইসলাম সাচ্চু জানান, এ বিষয়ে কেউ তাকে কিছু জানাননি। ইউপি ওয়ার্ড সদস্য আরিফুর রহমান বিষয়টি জানেন বললে ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বার আরিফের সাথে কথা বলে একটি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।

এ ক্ষেত্রে স্থানীয়রা বলছেন, বিনা মূল্যের ঘর পেতেও টাকা গুণতে হয়। টাকা দিতে না পারায় তার নাম বিনা মূল্যের ঘরের তালিকায় না উঠতে পারেও এমন ধারণা করছেন অনেকেই।

উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম ফেরদৌস আহমেদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বিনা মূল্যে ঘর বিতরণের তালিকা মূলত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও স্থানীয় চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে হয়ে থাকে। দেলদুয়ারে প্রায় ৫শ ঘর বিনা মূল্যে নির্মাণ হলেও এদের মতো মানুষ বাদ পড়াটা দুঃখজনক। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমত সহযোগিতার আশ্বাস দেন উপজেলা চেয়ারম্যান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. নাদিরা আক্তার জানান, যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেশের একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না, একটি মানুষ ঘরবিহীন থাকবে না সেখান এমনটা কেন হবে অবশ্যই বিষয়টি দেখব।

তিনি আরও বলেন আমি নতুন এসেছি, আমি প্রথম দিনই বলেছি এমন মানবিক ঘটনা থাকলে আমাকে জানাবেন। আমি ব্যবস্থা নেব। এখন জানলাম দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি। জানার পর তাৎক্ষণিক ওই বাড়িতে লোক পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড