• মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

জানেন ভাবী...?

  আসিফ রহমান ৩০ অক্টোবর ২০১৮, ১০:১০

মিথোম্যানিয়া
মিথোম্যানিয়ায় নারীরা আক্রান্ত হয় বেশি (ছবি: ইন্টারনেট)

গল্প বলতে কে না পছন্দ করেন?

মানুষ গল্প পড়তে কিংবা শুনতে যতটা না পছন্দ করে, তারচেয়ে বেশি পছন্দ করে গল্প বলতে। আমাদের প্রত্যেকেরই বলার মতো নিজস্ব অনেক গল্প আছে। নিজের গল্প অন্যকে শোনানোর মতো করে উপস্থাপন করার আনন্দের সাথে সাথে অন্য অনেক আনন্দের তুলনা করাই অনেকের জন্য হাস্যকর। 
এই যুগের ফেসবুক আসার আগে আমরা সেসব গল্প মানুষের কাছে বলে বেড়াতাম, এখন সেটা হয়ত ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানিয়ে দেই। মানুষ সেটাতে লাইক, হাসি, দুঃখ, ভালোবাসার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দেন তারা আমাদের গল্প পড়েছেন। 

বেশি বেশি মানুষ পড়ে রিয়েক্ট দিলে আমাদের গল্প বলার স্পৃহা বেড়ে যায়। আমরা নিয়মিত গল্প পোস্ট দিতে শুরু করি। এটা করেছি জীবনে, ওটা করেছি, এর সাথে পরিচয় হয়েছে, ওর সাথে একদিন দেখা হয়েছে, এসব বলতে বলতে এক সময় আমাদের গল্প ফুরিয়ে যায়। গল্প না থাকার দরুণ আমরা এক সময় গল্প বলা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই।

কিন্তু সবার ক্ষেত্রেই কি একই রকম হয়? 

না, হয় না।

এভাবে নিজের গল্প বলতে বলতে অনেকে কবি, লেখক, সাহিত্যিক, মোটিভেশনাল স্পিকার পরিচয়ে উপনীত হন।

আমরা সবাই জানি, এই লোকগুলো অনেক মিথ্যে বলেন। রঙচঙ মাখিয়ে একটি সাধারণ ঘটনাকে মানুষের সামনে গল্প আকারে উপস্থাপনেই তাদের সন্তুষ্টি নিহিত থাকে। তা না হলে তারা তাদের পরিচয় টিকিয়ে রাখবেন কি করে?

উপন্যাস তো দর্শন। কিন্তু এর বাইরে হুমায়ূন আহমেদের আত্মজীবনীমূলক বইগুলো পড়লে একজন স্বাভাবিক মানুষের মনে প্রশ্ন আসবেই, এতো হিউমারাস জীবন একজন মানুষের কি করে হতে পারে?

হুমায়ূন আহমেদ কতটুকু রঙচঙ মাখিয়েছিলেন তিনিই ভালো জানেন। আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। এটি বলার একটি কারণ আছে, আচ্ছা হুমায়ূন আহমেদ নিজের জীবনের যেসব গল্প বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন, সেসবে থাকা অসঙ্গতিগুলো যদি কেউ প্রমাণসহ মিথ্যে বলে জনসম্মুখে প্রকাশ করে দিতো, তাহলে কি কি হতে পারতো?

হ্যাঁ, একজন স্বাভাবিক মানুষ সে তার ভুল স্বীকার করে নিবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মিথোম্যানিয়া রোগীর জন্য এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সে চেষ্টা করবে, সে যা নয়, কিন্তু বলতে গিয়ে সে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করেছে, সেটা সত্যি বলে প্রমাণ করতে। সেজন্য যতটা মিথ্যে ঘটনা বানিয়ে বলতে হয়, সে বলবে। যতগুলো চরিত্র সে তার সাথে সম্পৃক্ত করেছে, সবগুলোকেই সে জীবন্ত দেখানোর চেষ্টা করবে।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, মিথ্যেকে সত্য বলে প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে যদি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়, সে পিছপা হবে না। তবু সে তার মিথ্যেকে জয় করেই ছাড়তে চাইবে। শুধু নিজেকে না, সে এজন্য অন্য কাউকে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করবে না! 

মিথোম্যানিয়া নিয়ে প্রথম আলোচনা হয় ১৮৯১ সালে এন্টন ডেলব্রোকের চিকিৎসা সংক্রান্ত বইয়ে। এই রোগে আক্রান্ত লোকেরা প্রয়োজনে কিংবা প্রয়োজন ছাড়াও মিথ্যে বলে। তারা তাদের অতীত, ইতিহাস নিয়ে মিথ্যে বলে। নিজেকে তারা সবসময় অন্যদের চেয়ে বড় দেখাতে পছন্দ করে এবং অন্যদের মূর্খ জ্ঞান করে থাকে। তারা তাদের মিথ্যে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকে।

এই মিথ্যে বলার পেছনে আরও কারণ আছে। অনেক সময় দেখা যায়, অনেক লোকের সাধারণ কথা তাদের বন্ধুরা খুব একটা পাত্তা দেয় না; সেজন্য অনেকেই একটি নির্দিষ্ট সময় বন্ধুহীন থাকে। কিংবা অনেকেই কোনো সম্পর্কে স্থির হতে পারে না। সম্পর্ক ভেঙে যায় কিংবা কাউকে পছন্দ হলেও তার সাথে জড়াতেই পারে না। এটি চলতে চলতে এমন পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সে তার অস্তিত্বের শঙ্কায় পড়ে যায়। তারপর নিজের অস্তিত্বকে বাঁচানোর তাড়না থেকেই সে মিথ্যের আশ্রয় নেয়। এভাবে মানুষ তার নিজেকে অন্যদের কাছে প্রমাণ করতে গিয়েই নিজেকে মিথোম্যানিয়ার দুয়ারে ঠেলে দেয়।

ধরুন, সে একদিন গল্পোচ্ছলে জানালো, তার সাথে একটি দুর্ধর্ষ ডাকাত দলের সম্পর্ক আছে। সে তাদের আস্তানা চিনে। সে মাঝে মাঝেই সেখানে যায়, তাদের সাথে চা-নাস্তা, গল্প-গুজব করে আসে। অনেকেই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে অবিশ্বাসের সহিত তার গল্প বিশ্বাস করে ফেললো। কেউ কেউ তার গল্পে দ্বিমত প্রকাশ করলো। একজন তো বলেই বসলো, আমিই না কাল তোকে তাদের আস্তানার কথা বললাম? তুই এর ভিতরে তাদের চিনলি কি করে? আবার চা-নাস্তাও!

সেই লোকটি কিন্তু আসলেই এত কিছু জানে না। সে কালই শুধুমাত্র জেনেছে ডাকাতদলের আস্তানার কথা। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গিয়েই তো বিপদে পড়লো।

এবার সে বললো, আরে ওটা তো এমনি না জানার নাটক ছিলো। আমি জানতে চাইছিলাম তোর মুখ থেকে, তুই সত্যি সত্যি জানিস কিনা! 

ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু সেই লোকটি দমে যাবার পাত্র নয়। নিজেকে সে কোনোভাবেই হারতে দেবে না। সে তাদের জানাবে, চল আমার সাথে, ওদের আস্তানায় গিয়ে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে চা-নাস্তা করে আসি।

সেই মিথোম্যানিয়া লোকটি কিংবা তার বন্ধুদের কপালে ডাকাতদের আস্তানায় গিয়ে কি ঘটবে কিংবা ঘটতে পারে সেদিকে আমরা না যাই।
তারচেয়ে বরং আমরা একটু জেনে রাখি, এই রোগটি মহিলাদের বেশি হয়।

এর কারণও খুব স্পষ্ট, মহিলাদের 'জানেন ভাবী...?' দিয়ে তাদের মিথোম্যানিয়ার যাত্রা শুরু হয়। তারপর সেটা যদি এরকম পরিস্থিতিতে চলে আসে, তাহলে কি ঘটতে পারে সেটা তো আর অনুমেয় করা কঠিন কিছু নয়। 

অতএব, কিছু বলার আগে সাবধান হোন, বাড়িয়ে কিছু বলতে যাবেন না। আর বলে ফেললেও যদি ধরা খেয়ে যান কোনোভাবে, প্লিজ, ভুলটা স্বীকার করে নিন। না হলে আপনি নিজে তো বিপদে পড়বেনই, সাথে কিছু নিরীহ লোকেরও পৃথিবীর আলো-বাতাস আজীবনের জন্য বিষাক্ত হয়ে পড়বে! 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড