• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

দৈনিক অধিকার ঈদ সংখ্যা-১৯

মানুষ

  আন্তনী সজীব কুলেন্তুনু

০৪ জুন ২০১৯, ১১:৫৪
গল্প
ছবি : মানুষ

মানব জীবনের মত বিচিত্র কোন কিছু বোধহয় এই জগৎ আর কিছু দেখেনি। এ কথায় বহু বিতর্কই থাকতে পারে। কিন্তু যে বিতর্ক করবে তার জীবনেও যে সেই খেলা বিচিত্র। কত জীবনই তো দেখেছি এই কয়েক বছরে, কত মনুষের জীবনই তো বইয়ে পড়েছি, ঠাকুমার কোলে শুয়ে রূপকথার গল্প শুনেছি। সেখনে রাজ কুমার তার অসুস্থ পিতার জন্য সাত সমুদ্র তের নদী পারি দিয়ে পথ্য যোগার করে আনে। কিন্ত বাস্তবে তার কতটুকুই বা মনুষের দ্বারা সম্ভব?

আমারও এরূপ ধারনাই ছিল এবং বোধ হয় থেকেই যেত যদিনা সে বার আমি বরুণের সাথে না যেতাম। বরুন আমার বন্ধু। আমাদের সেই শৈশব থেকে এক সাথে বেড়ে উঠা। জীবনের কত ওদ্ভুদ সৌন্দর্য, আমরা কোন বুদ্ধিদীপ্ত বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের তথ্য না জেনেই, প্রথম উপলব্ধি করেছি সে হিসেব আমরা কেউ রাখিনি কখনোও। যেমন মাতামাতি, তেমন হুল্লোড়ে কেটেছে শৈশব। এখন আমি ইঞ্জিনিয়ার। বরুণ ভাল একটা চাকরী করছে। আমাদের আলাদা আলাদা পরিবার হয়েছে। সবার জীবন থেকেই শৈশব চির বিদায় নেয়; আমাদেরও তাই। আমার ছেলেটার এখন সে সময়। আমি ওর দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে ভাবি, এখানেও জীবনের খেলা কি বিচিত্র! প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসবে যাবে কিন্তু জীবনের এই পর্যায় কি অপার মহিমায় চির জীবন্ত।

যাকগে সে সব কথা। বরুণের সাথে সে বার ওর বাড়ি গিয়েছিলাম। কোন ক্লাসে ছিলাম তা ঠিক মনে পড়ে না। কিসের ছুটি তাও মনে পড়ে না। বরুণ নিশ্চই বলতে পারবে। তবে এটুকু শুধু মনে পড়ে সেটি বেশি লম্বা ছুটি ছিল না। তবুও মাকে বলে অনেক কষ্টে অনুমতি পেয়েছিলাম বরুণদের বাড়িতে গিয়ে কিছু দিন বেরিয়ে আসতে। কিন্তু তখন জীবনের কিই বা এমন বুঝতাম আর উপলব্ধির যায়গাটাই বা কতটুকু ছিল। এখন বুঝি সেদিন বরুণ যেখনে নিয়ে গিয়েছিল অনেকে তা না দেখেই পৃথিবীতে এসে চলে গেছে। আপাত দৃষ্টিতে তেমন কিছুই নয়। ছায়া সুনিবিড় গ্রামের এক প্রান্তে একটা খড়ের কুরে ঘর। ঘড় দেখেই আমার একটা কৌতুহল হয়েছিল সেখানে কারাই বা থাকতে পারে? প্রথমে বুঝিনি। বা যেটুকু বুঝেছিলাম তা তার এক আনাও নয়। 

বরুণ যাবার আগে বলেছিল, ‘নীল ও পাড়া আমার এক মাসতুতো ভাই খুব অসুস্থ রে! এক্টিবার চল গিয়ে দেখে আসি।’ 
আমি বলেছিলাম- চল। দুজনে বিলের মাঝ পথ দিয়ে, রোদে ঝলমল করা সবুজের বন্দনা করতে করতে ওপাড়ায় গিয়ে পৌঁছেছিলাম। সে পাড়ার নাম যে কি সেটা আমার জানা নেই। বরুণকে কখনো জিজ্ঞাসাও করা হয়নি। দূর থেকে মাসির বাড়িটা দেখে বোঝা যাচ্ছিলো বেড়ার ঘরটা এক দিকে হেলে পড়েছে। বয়সের ভারে মানুষ যেমন ঝুঁকে পরে, চামড়ায় ভাজ খায় ঠিক তেমন। মাসির আর্থিক অবস্থা যে ভাল না সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দুজনে মাসির বাড়িতে ঢুকলম। চারিদিকের গাছ পালায় দুয়ারটা কেমন অন্ধকারময়। বরুণ মাসিমা বলে জোড়ে ডাক দিলো। ওর কন্ঠটা শুনে বুঝলাম, সেখানে অনেক দিনের কষ্ট মেশানো। আমি বরুণকে সেই ছোটবেলা থেকে চিনি। আমার অন্তরের সর্বত্র তার অনুভূতিগুলো ধরা পরে। বরুণের বেলাতেও তাই। 

মাসিমা ঘরেই ছিল। ডাক শুনে বাইরে আসলো। বরুণ পায়ে হাত দিয়ে আশির্বাদ নিলো। ওর দেখা দেখি আমিও। মাসি একটু মৃদু হাসলো। সেটা ঠিক হাসি ছিল না, বুঝেছিলাম। সেটা ছিল আমাদের মিথ্যে বরণ করে নেওয়া। বরুণ হাতে করে নিয়ে আসা টিফিন বাটিটা মাসির হাতে তুলে দিতে দিতে বললো, ‘এই নাও মাসি, মা তোমাদের জন্য পাঠিয়েছে।’ মাসি বাটিটা হাতে নিলো ঠিকই কিন্তু তার মন সেখানে ছিল না। বিষণ্ণতা তার সর্বাঙ্গব্যাপী যেন বিষ ছরাচ্ছিল।

তার স্বমন্ধে আমার এত কিছু লেখার কারণ একাটাই, কোন এক অজানা টান। আপন জনতো ছিল না, পূর্বে কোন দিন দেখাও তো হয় নি। তবুও তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন আমার চির চেনা, অতি আপন কোন মানুষ। যেন কত দিনের পরিচয় আমাদের। আমি শুধু তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। দু এক বার চোখে চোখ যে পড়েনি তা নয়। তাতেই তো বুঝেছিলাম সেই চোখের সাদা রঙ কোন এক অজানা ব্যাথ্যায় অনেক আগেই ধূসর হয়ে গিয়েছে।

 আমরা মাসির পেছন পেছন ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। বাহিরে দাড়ানো অবস্থায় বার কয়েক কাশির শব্দ শুনেছিলাম। ঘরে ঢুকতেই চখে পড়লো আমাদের চাইতে বছর কয়েক বড় হবে, মাসির ছেলে খাটের উপর শুয়ে। অনবরত কেশে চলেছে। আমি বুঝলাম এই বরুণের ভাই। তবে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে অসুখ তাকে ভোগাচ্ছে। আরো ভাল করে চেয়ে দেখলাম ছেলেটার পা দুটো কিছুটা বাকা। বুঝতে বাকি রইলো না যে, ও প্রতিবন্ধী। আমার বুকটা ব্যাথায় কাতরাতে লাগলো। বরুণের কাছে শুনেছিলাম যে মাসিমা বিধবা হয়েছেন অনেক আগেই। তবে এক মাত্র ছেলেটাও যে প্রতিবন্ধী সেটা আমার জানা ছিল না। আমি ছেলেটার পায়ের কাছে বসলাম। বরুণ বসলো মাথার কাছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বরুণ নানা প্রশ্ন করছিলো। অসুস্থ মানুষকে দেখতে আসা মানুষ যেসকল সাধারণ প্রশ্ন করে থাকে যেমন: কেমন আছ? খাওয়া দাওয়া ঠিক মত করছো কি না? ঔষধ ঠিক মত খাচ্ছ কি না? ইত্যাদি। ছেলেটা ঘরের অন্ধকার চালার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে উত্তর করছিলো। এবার আমি এটাও বুঝলাম যে ছেলেটা দৃষ্টি শক্তি নেই। এক কথায় অন্ধ।এটা জানার পর আমি আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। কখন যে আমার দু গাল বেয়ে দু ফোঁটা স্বচ্ছ জলের ধারা গরিয়ে পড়লো বুঝলাম না। আমি কাঁদছিলাম। ভাবছিলাম, একজন মানুষ এই পৃথিবীতে বাস করছে অথচ কেমন এই জগৎ কিছুই দেখতে পারে না। এই যে এতক্ষণ ধরে আমি মাসিমার কথা বললাম, সবুজের বন্দনা করলাম, বিল, মাঠ, ফসলের ক্ষেতের পাশ দিয়ে হেটে আসার বর্ণনা দিলাম সবই তো ছিল এই চোখের দরুন। আর আমার চোখের সামনের এই অসহায় মানুষটির জীবন অন্ধকারে তিক্ত, বিষাক্ত। সেই অন্ধকারের বিষ কেই বা বোঝে। 
আমি বরুণকে হাতে ধরে বললাম, বরুণ চল এখান থেকে। আসলে আমি সেখানে থেকে নিজেকে কোন ভাবেই সামলাতে পারছিলাম না। বরুণ আমার কথায় অবাক হল। বোধহয় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাসিমাও। বরুন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু আমি ওর হাতে ধরে মোটামুটি জোড় করেই বাইরে নিয়ে চলে এলাম। বরুণ বলল, ‘কিরে কি হল?’

 আমি কিছু বললাম না। শুধু হাত ধরে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তখনও আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমার কান্না দেখে বরুন রীতিমত বিচলিত হল। কিছু দূর আসার পর আমি ওর হাত ছেরে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তোর এই ভাইটার কথা তো তুই আমাকে আগে কখনো বলিস নি। আমার কথা কান্নায় ভেজা, নেতানো। বরুণ আমার এই প্রশ্নের জন্য অপ্রস্তুত ছিল। যেন অনেক কঠিন কোন প্রশ্ন করে ফেলেছি। বরুণ বলল, ‘বলিনি ঠিকই। কিন্তু বলতে চেয়েছি অনেকবার তবে পরিস্থিতি হয়ে ওঠেনি।’ বরুন বলা শুরু করলো, ‘জানিস বরুণ আমার এই ভাইটাকে আমি অনেক ভালবাসি। কিন্তু মানুষের সামনে ওর কথা বলতে কেমন যেন সংকোচ বোধ হতো। যখন আমি কেবল কথা বলতে শিখেছি তখনই আমার মেশো মশাই নৌকা ডুবিতে মারা যান। ভাইটাকে নিয়ে মাসিমা তখন পড়ে যান মহা বিপদে। কিভাবে যে সংসার চালিয়েছেন জানি না। তবে এটুকু শুনে ছিলাম এবং বুঝে ছিলাম যে, সমাজ মাসিমাদের একঘরে করে দিয়েছে। করণ তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি।’

আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম কেন? 
বরুণ একটা হতাশার দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বললো, ‘সমাজের কতিপয় বুদ্ধিজীবীর নজর পড়েছিল মাসিমার ওপর। মেসো মারা যাবার পর কেউ কেউ আবার সে সুযোগ হাতছারা করতে চায় নি। কিন্তু মাসিমা সবাইকে, সমাজকে রুখে কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘শরীরে এক ফোঁটা পর্যন্ত রক্ত থাকতে কাউকে গায়ে হাত দিতে দেব না।’

বিধবা নারীর এমন তীক্ষ্ণ জবাবে অনেকে ভয় পেয়েছিল। কেউ কেউ আবার কু মতলব আটলো। বানালো মিথ্যা ফাঁদ। আর মাসিমাকে শেষপর্যন্ত সেই ফাঁদে জড়ালো। কলঙ্কীনী করা হল মাসিমাকে। তার পর করা হল এক ঘরে। আমাদের কিছু করার ছিল না রে। আমার বাবা মা অনেক দিন এর জন্য গ্রামের মাতব্বরদের পেছন পেছন ঘুরেছে তাদের হাতে পায়ে ধরেছে। কিন্তু কোন কাজ হয় নি। এই সমাজ যে সবার সমাজ নয়! এখানে তুই আমি সবাই সমান নই। যার নেই তার আসলেই কিছু নেই। সে যদি পাবার চেষ্টা করে তাতে ওইসব বুদ্ধিজীবীদের আঁতে ঘা লাগে। আমি আমরা মাসিমা আর ভাইটির জন্য তেমন কিছুই করতে পারিনি। শুধু মাঝে মাঝে কিছু টাকা পয়সা মা পাঠিয়ে দিত।

বরুণ কথাগুলো বলে বোধহয় নিজেও কেঁদেছিল। আমি বুঝেছিলাম। সেদিন আমরা এ বিষয় নিয়ে কেউ আর কোন কথা বলিনি। তার দু দিন পর আমি বাড়ি ফিরে আসলাম। তবে সেই ঘটনা যে গভীর ক্ষত কিরেছিল কৈশরের নরম মাটির মত মনে সেটির ব্যাথা আমাকে প্রতিনিয়তই ব্যাথিত করতো। আজ আবার সেটি সদ্য কাটা ঘায়ের মত রক্ত ঝড়াতে শুরু করলো। সকালে বরুণের ফোন এসেছিল। মাসি কাল রাতে মারা গেছে। আমি বরুনের কথাগুলো শুধু শুনছিলাম। কোন কথা বলতে পারিনি। গলা দিয়ে কোন শব্দ আসেনি। চোখ দিয়ে এমনিই জল আসছিল। সারা জীবন শুনে এসেছিলাম ‘মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব’। কিন্তু তার প্রমাণ পেয়েছিলাম মাসিমার কাছে। বরুণ আমার মানুষ চিনিয়েছে। ও আমার বন্ধু। 

আরও পড়ুন- ভ্রূণ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড