• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

দৈনিক অধিকার ঈদ সংখ্যা-১৯

পালাবদল

  মৌ কর্মকার

০১ জুন ২০১৯, ১২:৪৮
ছবি
ছবি : পালাবদল

‘জানিস নীল, কাল রাতে তোর বড় বাবাকে স্বপ্ন দেখেছি। আমাকে বলল, কিরে যাবি আমার সাথে? চল ঘুরে আসি?’ আমাকে হাসানোর জন্য বাবা এমন কথা প্রায়ই বলে থাকেন তাই উত্তরে আমি কিছু বললাম না। ‘কিরে তোর বড় বাবার সঙ্গে চলে যাবো নাকি? লোকে কিন্তু বলে মৃত মানুষ ডাকলে নাকি যেতেই হয়!’ আমি তবুও কোন উত্তর দিলাম না। চুপ করে রইলাম। বাবাও আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। খেতে শুরু করলেন।  

খাবার টেবিলে চারটা চেয়ারের মধ্যে দুটোই আজ খালি। মার সাথেও আজ কথা হয়নি। বাসায় ঢুকার সময় রানুদি বলল, মার শরীরটা নাকি ভালো না। দুপুরে ডাক্তার এসে দেখে গেছেন। মা ঘুমাচ্ছে। সকালের দিকে বাবার সাথে খুব ঝগড়া হয়েছিল। সেই ঝগড়ার ফলস্বরূপ মা নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এখন কিন্তু সব ঠিক। এইযে একসাথেই খেতে বসেছি। আমরা এরকমই। মানুষই তিনজন। কাকে রেখে কোথায় যাবো?

খাওয়া শেষ করে আমার রুমে চলে এলাম। মাকে দেখতে যাবো ভেবেছিলাম কিন্তু সাহস হল না। ‘তোর মা ঘুমাচ্ছে। এখন শরীর ঠিক আছে।’ দরজায় উঁকি দিয়ে বাবা বলে গেলেন। উনি এরকমই! কিভাবে যে সব বুঝে যান বুঝতেই পারি না। তবে বাবার হাসি মুখটা অনেক সুন্দর। 

জেগেই ছিলাম। হঠাৎ মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠল। শুনলাম তবে ধরতে ইচ্ছা করলো না। রিং কেটে গেল। রিংটোন আবার বেজে ওঠল। আবার কল এসেছে। চেয়ে দেখলাম। দেখে অবাক হলাম। বাবা কল দিচ্ছেন। এত রাতে বাবার কল! খুব উত্তেজিত হয়ে বাবার রুমের দিকে ছুটলাম। উত্তেজনা ঠিক কিসের ভয়ের না আকাঙ্ক্ষার বুঝতে পারলাম না। 

- নীল আমার বুকে খুব ব্যথা করছে। তোর মাকে ডাকলাম তোর মা শুনতেই পেল না! আমাকে একটু হাসপাতালে নিয়ে যাবি বাবা?  আর পাড়ছি না।
রানুদিকে ডেকে বললাম, ‘রানুদি বাবার ওষুধ কোথায়?’ রানুদি উত্তর দিলো না। বাবার হাত কাঁপছে। হাত ধরে বাবার পাশে বসে ওষুধ খুঁজতে লাগলাম। ‘ছোটদা কাকার তো সকাল থেকেই বুকে ব্যথা’, রানুদি বলে উঠল। আমি বাবার মুখের দিকে হা করে চেয়ে রইলাম। বাবার মুখে সেই কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। সকালে বলেছিলেন ওনার জন্য ওষুধ আনার কথা। ভুলেই গিয়েছিলাম। এত ভুল হয় কেন আমার? মাকে ডেকে তুললাম। মা হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন!  কিছু বলার শক্তিই পেলেন না। কিছুক্ষণ আগে বাবা নিজেই মার যত্ন নিচ্ছিলেন আর এখন? 
অনেক কষ্টে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালের পথে রওনা হলাম। বাবার খুব কষ্ট হচ্ছিলো।
রাত তখন ৩ টা হবে, হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে বসে আছি আমি আর বাবা। যদিও বাবার শুয়ে থাকার কথা, উনি জেদ করেই বসে আছেন। হাসপাতালে আসার পর ইনজেকশন দেওয়ার ফলে উনার ব্যথা অনেকটা কমে গিয়েছে। এখন উনার সাথে আর পারে কে? তাই দুজনেই বসে রইলাম। চারদিকের পরিবেশ কেমন যেন থমথমে। সবাই যার যার আপনজনের অপেক্ষায় বসে আছেন। কারো চোখে হারানোর ভয় আবার কারো চোখে প্রাপ্তির আনন্দ। সবাই যার যার মতো। যার আসার কথা সে আসছে আবার যার যাবার কথা সে যাচ্ছে। চার দেয়ালের এই জগতে অপেক্ষার শেষ নেই। তবু সময় চলে যায় সবার অগোচরেই। 
সকাল হয়ে গেছে অনেক আগেই। নার্স এসে জানালেন রিপোর্টও এসে গেছে। বাবার ডাক্তার মিজানুর রহমান আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি বাবাকে বললাম, ‘তুমি বস আমি আসছি।’
- আসার সময় আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসবি? খুব খেতে ইচ্ছে করছে। কিরে নিয়ে আসবি? বাবা জিজ্ঞেস করলেন। 
- হুম নিয়ে আসবো। 
- দুধ চা নিয়ে আসবি কিন্তু! 
- ঠিক আছে।
ডাক্তার মধ্যবয়স্ক লোক। হাসি খুশি একজন মানুষ। খুব মিশুক। নামটা মিশু সাখাওয়াত হলে ভালো হত। তবে মিজানুর রহমান নামটাও খারাপ না। সব সময় যে মানুষ হাসতে থাকে  আজ তার মুখে হাসি নেই। আমি উনার রুমের ভিতেরে ঢুকলাম। 
‘বসো, কিছু খেয়েছ?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
- ‘বাবার কি হয়েছে স্যার?’ 
ডাক্তার মিজানুর রহমান প্রশ্ন শুনে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বললেন না। সব রিপোর্ট আমাকে দেখাতে শুরু করলেন। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো কিছু শুনতেও পারছি না। তিনি নিজের চেয়ার থেকে উঠে  আমার পাশে এসে বসলেন। 
আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘আমার বাবা?’
- তোমার বাবা আর কয়েক ঘণ্টা আছেন তোমাদের মাঝে।
আমি অবাক হয়ে উনার দিকে চেয়ে রইলাম। তিনিও আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘হে, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা! এখানে তোমার বাবার আর কোন চিকিৎসা নেই। তবে তুমি ঢাকা নিয়ে গিয়ে দেখতে পার।’
আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না। মানুষটা তো ভালোই আছে তবে ডাক্তার এসব কি বলছেন। কেমন যেন পাগলের মতো লাগছে। বাইরে বের হয়ে এলাম। অনেক সময় বাইরে বসে রইলাম। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না। একজন নার্স এসে বললেন, ‘আপনার বাবা আপনাকে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছেন।’
আমি কিছু বললাম না। শুধু চেয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নার্স বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন।

‘কিরে চা কোথায়,  চা নিয়ে আসলি না তো?’ বাবা বলল। এই তো আমার বাবা সুস্থ মানুষ চা খেতে চাচ্ছেন। তাহলে ডাক্তার এসব কি বলছেন। ভেবে কোন উত্তর পেলাম না। 
‘হেসে বললাম, তুমি বস আমি চা নিয়ে আসছি।’  আমার হাত ধরে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি  আছিস কিন্তু।’ বললাম, ঠিক আছে। এতক্ষণে প্রায় সবাই চলে এসেছে। কাকা, দাদা, ভাইয়েরা সকলেই। তারা সব জানেন। তবু কিছু বললেন না।  কিসের  যেন ব্যবস্থা চলছে চারদিকে,  বুঝতেও পারলাম  না। আমি চা আনতে চলে গেলাম।  পিছন থেকে কে যেন বলল, ‘এই কেউ ওর সাথে যা  ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে!’ আমি কিছু বললাম না। মেহেক আমার সাথে এসেছে। আমার পিছু পিছু।
 
আমি নিচের ক্যান্টিনে চা আনতে গেলাম। মেহেক আমার  পিছনেই আছে। এককাপ চা নিলাম। 
মেহেক বলল, ‘চা কার জন্য নিয়েছ নীলদা? ’
- বাবার জন্য, বাবা খেতে  চেয়েছেন।
- কাকাকে তো এম্বুলেন্সে তোলা হয়েছে, ঢাকা নিয়ে যাওয়া হবে? কাকা চা খাবে কি করে? চল তাড়াতাড়ি! কি হল? চল।
মেহেক আমাকে টেনে নিয়ে চলে আসলো। ঐখানেই পড়ে রইল বাবার এক কাপ চা!

আমার কাকার ছেলে মেহেক। বয়স বেশি না। বয়সে আমার থকে অনেক ছোট হবে। আমরা এখন হাসপাতালের সামনের গেইটে। অনেকগুলো এম্বুলেন্স রাখা আছে এখানে। তবে সবার গন্তব্য স্থল কিন্তু আলাদা। কারো ঢাকা, কারো সুস্থ রোগীর বাড়ি, কারো আবার মৃতের বাড়ি। এখানেই একটি এম্বুলেন্সে রয়েছেন আমার বাবা। 
মেহেক আমাকে একটি কালো রংয়ের এম্বুলেন্সে বসিয়ে দিলো। এই এম্বুলেন্সের ভেতরেই রয়েছেন বাবা। উনার এখন শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। মুখে অক্সিজেন লাগানো তবু শ্বাস নিতে কত কষ্ট! শ্বাস নেওয়ার শব্দ যেন আমার কান পর্যন্ত এসে যাচ্ছে। এত কষ্ট হচ্ছে কেন? বাবা কি এখন চা খাবেন। আমি কি জিজ্ঞেস করবো? হঠাৎ  পিছন থেকে কে যেন বললেন, ‘অবস্থা ভালো না, তাড়াতাড়ি চলেন।’
এম্বুলেন্স চলছে। আমরা তখন ঢাকার কাছাকাছি। ভাগ্যিস ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন চলছিল আমাদের আর জ্যামে পড়তে হল না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এম্বুলেন্সের জন্য ইমারজেন্সি লাইন করে দিয়েছে। মানতেই হবে আমরা বড়রা কিন্তু তা পারিনি। চলে গেলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অনেক ভিড় ঠেলে বাবাকে নিয়ে যাওয়া হল তার কেবিনে। এখনো বাবা শ্বাস নিতে পাড়ছেন না। ডাক্তার আসলেন। ইমারজেন্সি ইমারজেন্সি বলে চিৎকার করে আমাদেরকে বের করে দিলেন কেবিন থেকে। আরো ডাক্তার আসলেন। অনেক ষন্ত্রপাতি লাগানো হয়েছে বাবার শরীরে। ইস্ত্রির মতো কি দিয়ে যেন বাবার বুকে অনেক বার ছেঁকা দেওয়া হচ্ছিলো। বাবার শরীর বিছানা থেকে উপরে উঠছিল, আবার নামছিল। লোহা চুম্বককে টানলে যে রকম হয় অনেকটা সেই রকম। খুব কষ্ট হচ্ছিলো বাবার। অনেক ছেঁকা দেওয়ার পর বাবা এখন শ্বাস নিতে পাচ্ছেন। বাবার শ্বাস চলছে। 
বারান্দায় চেয়ারে বসে মাকে ফোন করে বললাম, ‘মা, বাবা এখন ভালো আছেন।’
মা অঝরে কেঁদে ওঠলেন। আমি ঢাকা থেকেই যেন তা বুঝতে পেলাম। হঠাৎ ডাক্তার ছুটে কেবিন থেকে বের হয়ে এসে বললেন আমাকে, ‘আপনার বাবার অবস্থা ভালো না, তিনি আর কিছুক্ষণ আছেন। আপনারা যান কেবিনে।’
কোন কিছু বুঝার আগেই ডাক্তার আবার চলে গেলেন। কি করবো, কি বলবো? বুঝতে পারলাম না। দৌড়ে বাবার কেবিনের দিকে গেলাম।
‘কিরে আমার চা কোথায়, চা আনলি না তো, যা চা নিয়ে আয়!’ বাবা সুস্থ মানুষ। বসে আছেন। শ্বাস ভালোই চলছে। তবে ডাক্তার এসব কেন বলছেন? আমি হেসে বললাম, ‘আনছি।’
- দুধ চা নিয়ে আসবি কিন্তু।
- ঠিক আছে। আমি পা বাড়ালাম।
- নীল...! বাবা তাড়াতাড়ি আছিস!
আমার চোখ ভর্তি জল। জল মুছে বাবার দিকে চেয়ে বললাম, 'আমি এই যাবো আর এই আসবো।' বাবা আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। অনেক সুন্দর বাবা হাসিটা!  অনেক সুন্দর। আমিও একসময় এই ভাবেই বাবার কাছে আবদার করতাম। সময় মনে হয় এই ভাবেই পাল্টায়।    

আমি চা আনতে গেলাম। মেহেক বাবার সাথে থেকে গেল। এখানেও নিচে ক্যান্টিন। নিচে নেমে এলাম। চা নিবো। হঠাৎ মেহেক মোবাইলে কল দিলো। রিসিভ করে মোবাইলটা কানে ধরতেই সে বলে উঠলো, ‘নীলদা কাকা কেমন যেন করছে, শ্বাস নিতে পাড়ছে না।’
কথাটা শুনেই মোবাইল হাত থেকে পড়ে গেল। হয়তো হাত থেকে মোবাইল পড়ার শব্দে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলো চারদিক। এক দৌড়ে লিফটে কাছে গেলাম। ততক্ষণে লিফট আমার থেকে অনেক উপরে চলে গেছে । সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে তিনতলায় উঠতে-উঠতেই বাবার শ্বাস নেওয়ার শক্তি একেবারে শেষ হয়ে গেল। থেমে গেল বাবার শ্বাস। কথা বললেন না বাবা। বললেন না,  কিরে চা কোথায়? বললেন না তাড়াতাড়ি আছিস। কিন্তু আমি তো তাড়াতাড়িই এসেছিলাম। 

বাবা ছিলেন সমাজের পরিচিত মুখ। বাড়িতে উনার লাশ আনার পর অনেকেই উনাকে দেখতে এসেছেন। যারা বেঁচে থাকতে বাবাকে দেখতে পেতেন না তারাও এসেছেন। কত কথা বলেছেন। কত ভালো ছিল আমার বাবা। কিন্তু আমি দেখেছি, আমার চাকরির জন্য বাবা কিভাবে সবার দুয়ারে দুয়ারে  ঘুরেছেন। আমি দেখেছি! কেউ পাশে ছিল না তখন। তা নিয়ে বাবার সাথে আমার কতই না ঝগড়া হয়েছে। তাছাড়া ভালোই ছিলাম আমরা। তিন জনের সংসার। মা অসুস্থ থাকলেও বাবা ছেলে রান্না করে ঠিক চালিয়ে নিতে পারতাম। কত মজা হত আমাদের রান্না!
 
আজ আমার সামনে দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলছে। বাবার দেহ থেকে এই আগুনের শিখা আরো উপরে উঠে গেছে। হয়তো দেহ পুড়ে পুড়ে এক সময় ছোট হয়ে যাবে।  মিশে যাবে মাটির সাথে। আমি ভাসিয়ে  দিবো ঐ নদীর জলে। কিন্তু বাবা.....! বাবা কোথায় যাবেন? 

পাশেই মেহেক বসে। ও কিছুই বলছে না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘মার হাতের শাখা পলা ভাঙা, সিঁদুর মুছে দেওয়া দেখেছিলি তুই মেহেক। বাবার সাথে কিভাবে মা সব রং দিয়ে দিয়েছিল? আমি কিভাবে সেই রং ফিরিয়ে দিবো বল না মেহেক। বলতে পারবি?’ মেহেক চুপ করে রইলো। 'আচ্ছা তুই দেখেছিলি সেই সিঁদুর ধুয়া রং। শুনেছিলি সেই শাখা ভাঙার শব্দ। শুনেছিলি কি?' আমি শুনেছিলাম। মার কপাল থেকে ধুয়ে পড়ছিল সেই রং। যে লাল রং সিঁথিতে দিয়ে আমার মা রোজ সকালে  আমার বাবাকে চা করে দিত সেই রং। যে শাখা পলার শব্দে আমি রোজ  খুঁজে পেতাম মাকে। কোথায় পাবো সেই শব্দ, কোথায় পাবো বলতে পারবি? ধুয়ে গেছে রে সব। মুছে গেছে। ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে গেছে সব। কিছু নেই।
এখানে বাবার চিতা জ্বলছে কিছুক্ষণ হল। এখনি সবাই বলতে শুরু করেছে, 'শেষ হয় না কেন? শেষ হবে কখন?’ অনেকে আবার বলছেন, ‘চায়ের ব্যবস্থা কর আর তো থাকা যায় না!’  এইদিকে দেখ, আমার বাবা চলে যাচ্ছেন। সেইদিকে কারো খেয়াল নেই। হায়রে জীবন, কি জীবন? মরে গেলেই সব শেষ!

সবাই চা খাচ্ছেন। সামনে চিতার আগুন জ্বলছে। একটা মানুষের দেহ পুরে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে দেহের গলিত লাভা। কি ভাবে ব্যাখ্যা করবো আমি এই কাহিনী? কি ভাবে ব্যাখ্যা করবো আমার চারপাশ? আমার তা জানা নেই। 
চিতার আগুন শেষ। আর জ্বলছে না আগুন। এখন অস্থি ভাসাতে হবে নদীতে। নিভানো ছাই সহ অস্থি হাঁড়িতে ভরে তুলে দেওয়া হয়েছে আমার হাতে। ভাসাতে হবে জলে। নাভি জলে নেমে অস্থি বিসর্জন দিলাম। আমার বাবার অস্থি! চোখে একটুকুও জল নেই আমার। হয়তো জল কি জিনিস চোখ ভুলে গেছে। সবাই নদীতে ডুব দিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। এই পা নাকি আর পিছানো যাবে না। কি অবাক করা নিয়ম! নিজের মানুষ রেখে যাচ্ছি তবু পিছনে ফিরে দেখা যাবে না সে কি করছে! আহা জীবন! নিজের বলতে আসলে কিছু আছে কি এই জীবনে?  

বাসার গেইটে এসে দেখি কাকী বসে আছে। লোহা, কাগজ, ম্যাচ, সরষে দানা, হলুদ, নিমপাতা আরো কত কিছু নিয়ে। কাগজে আগুন ধরিয়ে তাতে আমাকে ছেকে নিয়ে ঘরে তুললেন। এগুলো নাকি লোকাচার, করতেই হয়। আমিও কিছু বললাম না। রুমে চলে গেলাম। মাকে দেখার সাহস আমার নেই! হয়তো মা নিজেই আসবে আমার কাছে! মায়ের মন কোন রূপ, কোন গুণ, কোন হিসেব মানে কি?
  
পরদিন সকালে চোখ মেলে বুঝতে পেলাম, আমার জ্বর এসেছে! মা পাগল হয়ে উঠেছে আমার জন্য। মনে হয় এই জ্বরেই আমি.....! কি করে বুঝাই! কাল আমিও বাবাকে স্বপ্নে দেখেছি। বাবা বলল, ‘কিরে তোর জন্য বসে আছি যে, যাবি না?’ মাকে এই অবস্থায় দেখে কালকের কথা মনে পড়ল। কিন্তু মাকে বলতে পারলাম না।  সাহস নেই আমার।

‘মানুষ মরে গেলে পচে যায়’ এই কথা তো তোমার মুখেই  শুনেছি মা। ঐ যে গত বছর যখন পাশের বাসার চাচী মারা গিয়েছিলো তুমি চাচাকে ডেকে বলেছিলে, ‘ভাই এবার নিয়ে যেতে হবে, পচে যাচ্ছে যে!’
তবে আজ! আজ কি হয়েছে তোমার? আমাকে ছাড়ছো না কেন মা? এবার যে আমাকেও নিয়ে যাবে। চোখ খুলে দেখ, আমিও যে পচে যাচ্ছি মা!

আরও পড়ুন- বেনামি ফুলের গন্ধ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড