• সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দৈনিক অধিকার ঈদ সংখ্যা-১৯

মাতৃভাষা চর্চায় ইসলামের গুরুত্ব

  লোকমান হাকিম

০২ জুন ২০১৯, ০৯:০০
ঈসলামি সাহিত্য
ছবি : মাতৃভাষা চর্চায় ইসলামের গুরুত্ব

ভাষা আল্লাহর এক মহান নেয়ামত। আমরা মানুষ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। একজনের মনের ভাব অন্যজনের নিকট প্রকাশ করতে আল্লাহ তা’য়ালা ভাষাও সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের যত নেয়ামত দান করেছেন তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি নেয়ামত হল ভাষা বা কথা বলার শক্তি। মানুষ লিখে বা বলে যে ভাব প্রকাশ করে বিনিময় করে তাকেই ভাষা বলে। ভাষা মানুষের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নয়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুর কোনো ভাষা থাকে না। জন্মের পর মানুষ প্রথমে তার মায়ের কাছ থেকে, পরে তার পরিবার-পরিজন থেকে ভাষা শিখে। তার মা যে ভাষায় কথা বলে সেও সে ভাষায় কথা বলতে শেখে এবং সেটাই হয় তার মাতৃভাষা।

ভাষা আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত। আল্লাহ বলেছেন তুমি আমার কুদরত ও নিদর্শন দেখতে চাইলে অনেক দেখতে পাবে। তন্মধ্যে একটি হল ভাষা!
وَ من اياته خلق السّماوات والارض واختلاف السنتكم و الوانكم-
তার এক নিদর্শন হলো তোমাদের ভাষা,রং ও ধরনের বিভিন্নতা।
(সূরা রুম ৩০:২১)

পৃথিবীর একেক দেশের মানুষ একেক ভাষায় কথা বলে। এটাও আল্লাহর নিদর্শন যে,তিনি ভাষাকে বিভিন্ন রূপ দান করেছেন।আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: 
خلق الانسان علّمه البيان 
তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। শিখিয়েছেন বর্ণনা করার জ্ঞান।
(সূরা আর রহমান (৫৫);৩-৪)

এ ভাষা আল্লাহর এক অপূর্ব নেয়ামত।প্রত্যেক জাতিকে, প্রতিটি অঞ্চলের মানুষকে আল্লাহ পৃথক পৃথক ভাষা দান করেছেন।সবগুলো ভাষায় আল্লাহর দেওয়া। কাজেই সব ভাষায় আল্লাহর দান। আল্লাহর ভাষা।কোনো ভাষাকে অবজ্ঞা করা যাবেনা।

আদম আঃ ও মহানবী সা: এর ভাষা জ্ঞান:

আল্লাহ হযরত আদম আঃ কে তৈরি করেছেন। তারপর তাকে সকল ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেছেন,
علمه ادم الاسماء كلها 
অর্থাৎ আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করার পর সমস্ত ভাষার জ্ঞান তাকে শিখিয়েছেন।(সূরা বাকারা ০২:৩১)

এই আয়াতের আলোকে বুঝা যায় পৃথিবীর সমস্ত ভাষা আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট।সারা পৃথিবীর যে মানুষ যে জনপদে বাস করে সে অঞ্চলের ভাষায় কথা বলতে পারে।তবে ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে মুসলমানদের প্রিয় ভাষা হল আরবি। কারণ, মহা গ্রন্থ আল কুরআন আল্লাহ আরবি ভাষায় নাযিল করেছেন।মহানবী সা: ছিলেন আরবি।জান্নাতের ভাষাও আরবি।

তাই প্রতিটি মুমিনের উচিৎ আরবি ভাষাকে ভালোবাসা। তবে আরবি ভাষাকে ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে, নিজের মাতৃভাষা চর্চা করা যাবেনা। বা মাতৃভাষা চর্চায় পুণ্য নেই।

সাহেবায়ে কেরাম নবীজির জীবদ্দশায়ই অনেক দূরদূরান্তে দীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। এবং যে জাতির কাছে গিয়েছেন তাদের সহজে বোঝানোর জন্য তাদের নিজস্ব ভাষায় দাওয়াত দিয়েছেন। বিভিন্ন জাতির যে ভাষাগুলো ছিল সেগুলো আল্লাহ নিষিদ্ধ করেননি। সুরা ইবরাহীমে আল্লাহ বলেছেন-
و ما ارسلنا من رسول الا بلسان قومه لیبين لهم 
আমি দুনিয়ার বুকে অনেক নবী রাসূল প্রেরণ করেছি, কিন্তু এমন কোন নবী রাসূল প্রেরণ করেনি, যারা তাদের নিজেদের ভাষা জানত না।

আল্লাহ তায়ালা যে জাতীর কাছে যে নবী রাসূল পাঠিয়েছেন সে জাতীর ভাষায় অভিজ্ঞ করে তবেই প্রেরণ করেছেন। সুতরাং প্রমাণিত হল স্বজাতির ভাষা আয়ত্ত করা এবং তাতে বিশুদ্ধতা অর্জন করা কুরআন সুন্নাহের আলোকে অবশ্য কর্তব্য।

আমাদের মহানবী সা: বলেছেন,
انا افصح العرب 
আমি আরবের সবচাইতে বিশুদ্ধভাষী। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জ্ঞান না থাকার পরও রাসূলের মুখনিঃসৃত শব্দগুলো ছিল ভাষাশৈলীর দৃষ্টিকোণ থেকে এবং ভাষা-সাহিত্যের মানদণ্ডে অত্যন্ত উঁচু মাপের। আল্লাহর কালাম কুরআনের পর আরবি সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার আল্লাহর রাসূলের হাদিস।অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায় আমাদের নবীজি কথা বলতেন। শুধু তিনিই নন বরং সমস্ত নবী ও রাসূলগন অত্যন্ত সুন্দর ও মাধুর্য ভাষায় মানুষকে দীনের দাওয়াত দিতেন। এ জন্যই তাদের বাণী মানুষের অন্তরে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করত।

আল্লাহ তায়ালা সকল নবী-রাসূলকে স্ব স্ব ভাষায় অভিজ্ঞ করেছেন। যাতে তারা আল্লাহর বাণী সুন্দর ও সহজ করে মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারে। সুতরাং ভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম।

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের অহংকার:

ফেব্রুয়ারি মাস বাংলাদেশের বাংলাভাষী মানুষের জন্য ভাষার মাস। শোকের মাস। মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এ দেশের খেটে খাওয়া হত-দরিদ্র মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। গুলির আঘাতে আহত হয়েছিল।রক্তাক্ত হয়েছিল,শহীদ হয়েছিল। এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে তাদের ভাষাকে রক্ষা করেছে।রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছে। আমরা সকলেই তাদের রুহের মাগফেরাত ও শান্তি কামনা করছি।

একটা বিষয় এখানে স্পষ্ট করে বলা দরকার যে, মুসলমান যে অঞ্চলেই প্রেরিত হবে সে অঞ্চলের ভাষায় হবে তার ভাষা। সে ভাষায় তাকে অভিজ্ঞ হতে হবে। এটাই নবী গণের সুন্নত। কারণ নবী-রাসূলগণ স্বজাতির ভাষায় অভিজ্ঞ ছিলেন। সুতরাং বাংলা ভাষাকে হীন ও নিচু চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সকল ভাষাকে আল্লাহ তায়ালা মহিমান্বিত করেছেন। মর্যাদা দিয়েছেন।যারা বলে বাংলা ভাষা হিন্দুদের ভাষা, দেবদেবীদের ভাষা। তারা নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করে মারাত্মক ভুল করছেন। কারণ কুরআন নাযিল হওয়ার আগে আরবি ভাষা তো আবু জাহেল, আবু লাহাবের ভাষা ছিল। অতঃপর পরে এটা মুসলমানদের ভাষা হয়েছে।ফারসি ভাষা ছিল অগ্নিপূজারীদের ভাষা। কিন্তু এক পর্যায়ে এ ফারসি ভাষা ইসলামী সাহিত্যে সমৃদ্ধ হয়েছে।

আল্লামা সাদী (রহ,), হযরত ফরীদুদ্দীন আত্তার, আল্লামা রুমী ও আল্লামা জামী রহ, ফারসি ভাষায় অসংখ্য কিতাব রচনা করে গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। প্রখ্যাত আলেম ও দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল উর্দুতে ইসলামী সাহিত্যের জোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন। একই ভাবে  মুসলিমরা বাংলা চর্চা করলে ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব এই ভাষায় সৃষ্টি করতে পারবে। অনেক কবি ও সাহিত্যিক যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে আসছেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমেদ ও আল-মাহমুদ সহ আরো অনেক কবি ও সাহিত্যিক বাংলায় ইসলামী ভাবধারা প্রচার করেছেন। সুতরাং বাংলা ভাষা চর্চা করা মুসলমানদের জন্য আবশ্যক এবং বাংলায় ইসলামী ভাবধারা প্রচার ও প্রসার করা ও এ দেশের জনগণকে ইসলামী সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত করা তাদের কর্তব্য।

বাংলা ভাষার নেতৃত্ব গ্রহণ করুন:

বিখ্যাত ইসলামী লেখক ও ইসলামী রেনেসাঁর সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ,  ১৯৮৪ সালের ১৪ মার্চ  কিশোরগঞ্জ জামিয়া ইমদাদিয়া প্রাঙ্গণে বিশিষ্ট আলিম, ইসলামী বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র-শিক্ষক সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেন,
‘আপনারা বাংলাভাষাকে অন্তরের মমতা দিয়ে গ্রহণ করুন এবং মেধা ও প্রতিভা দিয়ে বাংলা চর্চা করুন। কে বলেছে, এটা অস্পৃশ্য ভাষা? কে বলেছে এটা হিন্দুদের ভাষা? বাংলাভাষা ও সাহিত্যচর্চায় পুণ্য নেই, পুণ্য শুধু আরবিতে, উর্দুতে, কোথায় পেয়েছেন এ ফতোয়া? এ ভ্রান্ত ও আত্মঘাতী ধারনা বর্জন করুন। এটা অজ্ঞতা, এটা মূর্খতা এবং আগামী দিনের জন্য এর পরিণতি বড় ভয়াবহ।’
(জীবন পথের পাথেয়, পৃষ্ঠা ২১৭)

সর্বোপরি তিনি এ দেশের আলেম ও মুসলিম বাংলাভাষাবাদী মানুষদের কে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে বলেছেন।এবং এ দেশের মানুষকে দেশীয় সাহিত্যের প্রতি মনোনিবেশ করতে আহবান করেছেন। অন্যথায় এদেশে ইসলাম ও আলেম সমাজ বিপন্ন হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা ব্যক্ত করেন। সুতরাং সকলকে বলব মাতৃভাষা চর্চায় ইসলামের গুরুত্ব বুঝুন এবং এদেশের জনগণকে ইসলামী সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত করুন। আল্লাহ সবাইকে বুঝার তৌফিক দান করুক এবং দীনের প্রচার প্রসারে কবুল করুন।

আরও পড়ুন- কবিতায় ছন্দের দ্বিধাদ্বন্দ্ব

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড