• সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কবিতায় ছন্দের দ্বিধাদ্বন্দ্ব

  ফারুক সুমন

৩০ মে ২০১৯, ২০:২০
ছবি
ছবি : কবিতায় ছন্দের দ্বিধাদ্বন্দ্ব

কবিতা লেখায় ছন্দ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব লেগেই আছে। এই দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব কবিতার চিরকালীন রহস্যকে আচ্ছাদিত রাখে বিতর্কের বেড়াজালে। ছন্দ মানেই কবিতা নয়। ছন্দ কবিতার উপকরণ। শুধু উপকরণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কিন্তু কেউ কেউ কেবল ছন্দকে কবিতার অত্যাবশ্যক উপকরণ উল্লেখের পাশাপাশি এমন বিধান আরোপ করেন যে, ছন্দই কবিতা। আদতে ‘ছন্দই পদ্য’ এমন মন্তব্য করলে কিছুটা মেনে নেওয়া যায়।

একথা অনস্বীকার্য যে, ছন্দের একরকম শক্তি আছে। প্রকৃতি ও সৃষ্টির পরতে পরতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে ছন্দ ক্রিয়াশীল। এব্যাপারে বিস্তর লেখালেখি আছে। বর্তমান লেখার অন্বিষ্ট বিষয় তা নয়। কবিতায় ছন্দের অনিবার্যতা কতটা জরুরি কিংবা কবিতায় ছন্দ মুখ্য না হয়েও কবিতা হতে পারে কিনা। এধরনের সাধারণ প্রশ্ন কিন্তু অসাধারণ বিতর্ককে সামনে এনে নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান থেকে পরখ করতে আগ্রহী। এখানে প্রত্যেক কবিই নিজেকে একজন আলোচক হিসেবে ভাবতে পারেন মনে মনে।

ছড়া একান্তই ছন্দনির্ভর শিল্প বলে একজন ছান্দসিক ছন্দের খুব ঘনিষ্ঠ স্বজন। ছড়াকার নিয়ত ছন্দের  বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করেন। ছন্দের ঝংকারে তিনি আনন্দস্রোত বইয়ে দেন মনে মনে জনে জনে।

পক্ষান্তরে, কবি হাঁটেন ভাবের বারান্দায়। কবির কাছে ‘ভাব’ আগে। ভাবের গভীরতাই সৌকর্যপূর্ণ বাণীরূপে কবিতামূর্তি লাভ করে। ছন্দ কবিতার একটি অনুষঙ্গ মাত্র। ছন্দই কবিতা নয়। হাল আমলে ছন্দনির্ভর কবিতাকে পদ্য হিসেবে দেখা হয়। ফলে আগেকার অন্ত্যমিল যুক্ত ছন্দময় কবিতায় অভ্যস্ত পাঠকের কাছে আধুনিক কবিতা উদ্ভট মনে হয়। কারণ আধুনিক কবিতার একটি প্রধান অঞ্চল জুড়ে আছে ‘গদ্যছন্দ’। প্রধান তিনটি ছন্দ (স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত) ছাড়া অনেকেই গদ্য ছন্দের ভেতরগত চলন ধরতে পারেন না। ফলে সাধারণ গদ্য আর গদ্যকবিতার ভেদ তারা অতিক্রম করতে সীমাবদ্ধতায় আটকা পড়েন। অর্থাৎ ‘গদ্যছন্দ’ তাদের কাছে ছন্দ হিসেবে তেমন কদর পায় না। মিলযুক্ত ছন্দই কবিতায় তারা দেখতে আগ্রহী। কোনো কবি অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতা না লিখলে তাকে ‘ছন্দে আনাড়ি’ কবি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে দেখা যায়। অথচ এটা কে না জানে, আধুনিক কবিতা মানে কাঠামোবদ্ধ ছন্দমুক্তির কবিতা। এখানে ছন্দের চেয়ে বেশি জরুরি কবিতার ভাবকে যথাবিহিত শব্দবিন্যাসে উপস্থাপন করা। ছন্দের ঝনঝনানির চেয়ে আধুনিক কবিরা বেশি গুরুত্ব দেন ব্যক্তিগত বোধকে কাব্যিক ব্যঞ্জনায় উন্নীত করা। কবিতা এখন নানামাত্রিক অর্থবহতাকে ধারণ করে অবিচল থাকে।

খেয়াল করেছি, আমাদের কবিদের মাঝে ছন্দের প্রয়োগ নিয়ে যতটা না দ্বন্দ্ব; তার চেয়ে বেশি দ্বন্দ্ব ছন্দ নিয়ে মুন্সিয়ানায় পরস্পরের শক্তিমত্তার প্রদর্শন নিয়ে। ছন্দ বিষয়ে অন্য কবির কবিতায় ছিদ্রান্বেষণ একধরনের বদ-অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লেখায় কবিতার অনুভব ও উপলব্ধি আছে কিনা তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। কেবল ছন্দের গণিত কষতে বেশি উৎসাহী অনেকেই। গদ্যের মাঝেও যে ‘অন্তছন্দস্রোত’ আছে সে ব্যপারে কিছু বলছেন না। কবিতা এমন এক শিল্প, যেখানে কবি আবেগ ও কল্পনার নিজস্ব ভূখণ্ড তৈরি করেন ভাষা দিয়ে। শুধুই ভাষা নয়; ভাষার বাহনে চেপে কবি পাঠককে নিয়ে যান অদেখা, অধরা, অনাস্বাদিত কোনো অভিজ্ঞতার অন্তরালে। হ্যাঁ, আপনি হয়তো কবিতার কলকব্জাগুলো আলাদা করে পড়তে পারেন, বিশ্লেষণ করতে পারেন। এতে আপনি কবিতার দক্ষ সমালোচক কিংবা বিশ্লেষক। কিন্তু তাই বলে একজন দক্ষ সমালোচক কিংবা বিশ্লেষক চাইলেই মহৎ কবি হতে পারেন না। ছন্দ অলঙ্কার সম্পর্কে বিশদ জ্ঞানের অধিকারী মানে এই নয় যে, তিনি ভালো কবিতা লিখতে পারবেন। একজন কবি ভালো কাব্য সমালোচক হতে পারেন। কিন্তু একজন কাব্য সমালোচক চাইলেই একজন মহৎ কবি হতে পারেন না। ছন্দ শাস্ত্রে পণ্ডিত হলেই তিনি কবি হয়ে যান না।

এমনও হতে পারে, শুধু পুঁথিগত ছন্দজ্ঞান ছাড়াই শুধু অভ্যস্ততার ভিতের উপর দাঁড়িয়ে ছন্দ সম্পর্কে আনাড়ি কবি মহৎ কবিতা লিখতে পারেন। বোধকরি, বেশির ভাগ কবি প্রথম জীবনে কবিতা লিখেছেন ছন্দের পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন না করেই। ধীরে ধীরে প্রত্যেকেই সেই ভিত তৈরি করে নেন। অনেকেই অন্ত্যমিল যুক্ত লেখা দেখলেই দারুণ ছন্দ খুঁজে পান। কিন্তু ছন্দের ভেতরে যে আরও ছন্দের কাঁপন আছে সেই শিহরণ গতানুগতিক ছন্দবিদ দেখতে পান না।

প্রকৃত কবি কাব্যচর্চার ঊষালগ্নে ছন্দ সম্পর্কে আনাড়ি হলেও ধীরে ধীরে ছন্দের অলিগলি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। অভিজ্ঞ কবি একপর্যায়ে কবিতার বিষয় ও ভাবের প্রয়োজনে ছন্দ ভাঙেন, ছন্দ গড়েন। ছন্দের এই ভাঙাগড়ার খেলায় তিনি সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন। আদতে কবিতা কখনো একেবারেই ছন্দহীন হতে পারে না। কারণ যেখানে স্বাভাবিক গদ্যেও আমরা ছন্দের নানা ভাঁজ খেয়াল করি, সেখানে কবিতায় ছন্দ থাকে না এমন চিন্তা করাও ভুল বৈকি।

ছন্দের সাথে ধ্বনিময়তাও গুরুত্বপূর্ণ। কবির ধ্বনিগত রসবোধের ওপর নির্ভর করে ছন্দের স্ফূর্তি। কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ ছন্দ ও ধ্বনিময়তার গুরুত্ব উপলব্ধি করে এপ্রসঙ্গে চমৎকার মন্তব্য করেছেন। মন্তব্যটি দীর্ঘ হলেও প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় উল্লেখ করছি- ‘ছন্দ ছন্দ নয়। ছন্দ নয় যন্ত্রাংশ, ছন্দ জীববিদ্যার অন্তর্গত। না, শেষ-অব্ধি ছন্দ কবিতার শরীরও নয়- ছন্দ কবিতার অংশ, ধ্বনি কবিতার অংশ। আমরা কি তাকেই এক-মুহূর্তে কবিতা বলে শনাক্ত করিনা, যার অব্যাখ্যাত আওয়াজ মন্ত্রের মতো, মন্ত্রোচ্চারিত সম্মোহনের মতো? কবিতা যে- সম্মোহন বা আবেশ সৃষ্টি করে, তা কিসের? তা উচ্চারণের, তা ধ্বনিময় শব্দের, তা শব্দোত্থিত আওয়াজের। অনেক কবিযশোপ্রার্থীর ছন্দ ঠিক থাকে, কিন্তু ধ্বনি সৃষ্টি হয় না। আবার অনেক কবিতার ছন্দ ঠিক থাকে না, কিন্তু আশ্চর্য ধ্বনি সৃষ্টি হয়। কবিতার ঐ ধ্বনিই কবিতার জাদুমন্ত্র। ছন্দের অভীষ্ট ঐ ধ্বনি, ছন্দ পথের মতো ঐ মঞ্জিলের উদ্দেশে চলে গেছে, মঞ্জিল যেখানে সেখানে প্রকৃত-ছন্দ, আর প্রকৃত-ছন্দ যেখানে সেখানেই কবিতার অধিষ্ঠান।’ (কবিতা / করতলে মহাদেশ)
কবিতার ‘ভাব’ কবির প্রয়োগ-দক্ষতার ওপর নির্ভর করে উদ্দিষ্ট ছন্দে নিজেই বাঁধা পড়ে। এখানে ছন্দ ভাবের অনুগামী। কখনো ব্যতিক্রমও হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত অল্প। মূলত মৌলিক কবি একেবারে সচেতন হয়ে, ছন্দের সংখ্যা হিসেব কষে কবিতা লিখতে বসেন না। এটা ছড়াকারের বেলায় হতে পারে। কবি আচমকা ভূতগ্রস্ত মানুষের মতো হয়ে যান। কবিতায় নিমগ্ন হয়ে ডুব দেন ঘোরের পুকুরে। তখন কবির আরাধ্য কেবল ছন্দ নয়; সর্বাঙ্গীণ সুন্দর পঙক্তির আশায় তিনি যেন কবিতার ডুবুরি। রূপ-রস-গন্ধ সমেত বাণী যখন যথোপযুক্ত ছন্দে বাঁধা পড়ে। তখন কবিতার অন্তরঙ্গ অনুভব তনুমনকে স্পর্শ করে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, কবিতায় রস আরও বেশি মধুর হয়ে উঠতে পারে কেবল ছন্দের যথার্থ বুননের ফলে।

বাংলা কবিতার ধারাবাহিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ছন্দনির্ভর কবিতার দারুণ অধিকার। অর্থাৎ প্রকৃতিগত ভাবে বাংলা কবিতা ছন্দঘনিষ্ঠ। ছন্দের বন্ধনে কবিতার ভাব পাঠকের মনকে বেশি আন্দোলিত করেছে। কিন্তু হাল-আমলে ছন্দের ব্যাপারে কবিগণ কিছুটা বিমুখতা দেখিয়েছেন। মূলত এটাও একধরনের প্রবণতা। কবিতার টেকনিক বদলের ধারাবাহিকতায় হতে পারে এটাও একধরনের প্রয়াস। আলংকারিক উপকরণ ব্যতীত ছন্দের কোনো সার্থকতা তারা খুঁজে পাননি। আর তাই ‘গদ্য’ বা ‘পদ্য’ দু’টোই কবিতার মাধ্যম হিসেবে তারা বিবেচনা করেন। তবুও ছন্দকে এড়িয়ে আদৌ কবিতা লেখা সম্ভব কী? সম্ভব নয়। কারণ কবি না চাইলেও কোনো না কোনো ছন্দের ফ্রেমে বাঁধা পড়বেন। ছন্দমুক্তি খুব কঠিন। তবে 'ছন্দই কবিতা' এমন অবশ্যম্ভাবী মন্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

কবিতায় ছন্দ প্রয়োগে মুন্সিয়ানা দেখানো মানেই উত্তম কবিতা নয়। অনেকেই দাবি করেন, তাঁর কবিতা ছন্দে লেখা বলে তিনি কালোত্তীর্ণ কবিতা লিখেছেন। আমরা ভুলে যাই, ‘মিস্তিরি শিল্পী নন, কিন্তু প্রতিটি শিল্পীই নিপুণ মিস্তিরি।’ অর্থাৎ শিল্পী এবং মিস্তিরি এ দু'য়ের সমন্বয়ে তৈরি হয় শিল্প তথা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক। প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ 'কবিতা কি ও কেনো' প্রবন্ধে বেশ সাহসের সাথে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী এবং ঈশ্বর গুপ্তের রচনাকে ‘পদ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, আগে বাংলা কবিতা হতে গেলে দুটি ধাপ অতিক্রম করতে হতো। প্রথমে পদ্য, তারপর কবিতা। অনেক কবির কবিতা ছন্দের নিপুণতায় ‘পদ্য’ স্তরে এসে থেমে যেতো। যেহেতু একালে গদ্য হয়ে উঠেছে কবিতার মাধ্যম, সেহেতু কবিতাকে মুখ্যত ছন্দের স্তর অতিক্রম করতে হয় না। ফলে ‘ছন্দোবদ্ধ রচনামাত্রই পদ্য’, কবিতা নয়। হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, ‘আমাদের গৌণ কবিদের কথা ছেড়ে দিই; প্রধান কবি বলে যাঁদের গণ্য করি, তাঁদের বহু রচনাকে ছন্দোবদ্ধ রচনা ছাড়া কিছুই বলা যায় না। কিন্তু প্রথাগতভাবে সেগুলোকে কবিতাই বলি আমরা, কারণ ওই রচনাগুলো মিটিয়েছে কবিতার সমস্ত রৌপ শর্ত।’

কবিতার আঙ্গিক বিবেচনায় ছন্দের উপস্থিতি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে কবিতা লেখার প্রাথমিক পর্যায়ে কবি যেন ছন্দ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে না ভোগেন। ছন্দ কবিতার অলঙ্কার; ছন্দই কবিতা নয়। এই বিশ্বাস নিয়ে তিনি অগ্রসর হবেন কবিতাভিমুখে। ছন্দের বই পড়ে বোধকরি কোনো কবিই কবিতা লেখায় অবতীর্ণ হননি। ফলে ছন্দ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কিংবা জড়তার কিছু নেই। মৌলিক কবি ধীরে ধীরে ছন্দকে আয়ত্বে এনে শাসন করেন আপন ইচ্ছায়। ছন্দ কবিতা হয়ে ওঠার বাহন মাত্র। কবিতার বিষয় কিংবা ভাবকে আরও বেশি ক্ষিপ্রতা দেয়ার জন্যেই ছন্দের স্পন্দন প্রয়োজন। তাই কবিতায় ছন্দ থাকুক। ছন্দনির্ভর পদ্য যেন কবিতা হয়ে ওঠে সেদিকেও দৃষ্টি পড়ুক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড