• বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

দৈনিক অধিকার ঈদ সংখ্যা-১৯

মোবাইল

  মাশাওফি আমিন

০৭ জুন ২০১৯, ১০:১০
গল্প
ছবি : মোবাইল

- মা আমাকে একটা ইন্সট্রাগ্রাম একাউন্ট খুলে দেবে?
আচমকা ১২ বছরের মিঠির মুখে এরকম কথা শুনে চমকে উঠলো বিপাশা। মেয়ের রুমের আলমিরার কাপড় গোছাচ্ছিল সে। মেয়েটা ঠিকমত গুছিয়ে রাখেনা কিছুই। এ নিয়ে প্রায়শই বকাঝকা করে মেয়েকে, ‘বড় হচ্ছো, একটু তো গুছিয়ে রাখতে পারো নিজের রুমটা ! আর কতদিন আমি তোমার সবকিছু এভাবে গুছিয়ে দিবো?’
মিঠি আহ্লাদী স্বরে বলে, ‘মা, আমি এসব পারিনা!’

বিপাশাও কিছু বলে না, নিজেই গুছিয়ে দেয়। দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে মেয়েটা ছোট। সবার খুব আদরে আদরে বড় হচ্ছে। পড়াশোনা, গান, ছবি আঁকা আর খেলাধুলা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আজও আলমিরা গোছাচ্ছিল বিপাশা। মিঠি সমাজ বিজ্ঞান বই পড়ছে। মাঝে মধ্যে এটা ওটা বুঝতে না পারলে জানতে চাইছে মায়ের কাছে। কাজ করতে করতেই বুঝিয়ে দিচ্ছে বিপাশা। পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই সে কথাটা বললো। বিপাশা ঘুরে তাকালো মেয়ের দিকে। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো, ‘ইন্সট্রাগ্রামে একাউন্ট? তোমাকে?’
মিঠি সুর করে উত্তর দিল, ‘আমার ক্লাসের সব বন্ধুদের ইন্সট্রাগ্রাম একাউন্ট আছে, ওরা সবাই কত ছবি পোস্ট করে! আমি কিছুই করতে পারিনা একাউন্ট নাই বলে!’
বিপাশা অস্হির বোধ করলো। কি বলছে এসব! 
মনে মনে রাগ হলেও নিজেকে সংযত রেখে বললো, ‘তোমার বন্ধুরা ইন্সট্রাগ্রাম একাউন্ট ব্যবহার করে? মানে তারা মোবাইল ব্যবহার করে নাকি এইটুকু বয়সে?’ 
মিঠি আগ্রহের সাথে বললে, ‘হুম করে তো অনেকেই। তবে যাদের মোবাইল নেই, তারা ওদের মায়ের মেবাইলে একাউন্ট খুলেছে। মা, ওদের কত্তো মজা! ওরা ইন্সট্রাগ্রামে গ্রুপ চ্যাট করে গল্প করে! আমি কিছুই করতে পারিনা। ওরা স্কুলে সেইসব গল্প করে,আমি শুধু শুনি, আমার খুব মন খারাপ হয় তখন।’

মিহির গলায় হতাশা ঝরে পড়লো! বিপাশার হতবিহ্বল লাগছে। একটা ১২ বছরের মেয়ে মোবাইল ব্যবহার করতে চাইছে কারণ তার সমবয়সী বন্ধুরা প্রায় সবাই মোবাইলে ফেসবুক বা ইন্সট্রাগ্রাম ব্যবহার করছে!  বিপাশার ছেলে যখন কলেজে উঠলো তখন তাকে বাধ্য হয়ে মোবাইল দিতে হয়েছিল কারণ কলেজ থেকে বাসার দূরত্ব ছিলে বেশ খানিকটা। তাই যাতে কোন অসুবিধা হলে ছেলেটা ওদের জানাতে পারে বা ওরাও ফোন করে ছেলের খোঁজ নিতে পারে সেজন্য মোবাইল দিয়েছিল। তবে কলেজ থেকে ফিরে আসার পর আবার মোবাইলটা বিপাশা নিয়ে নিতো। সর্বক্ষণ ভিতরে ভিতরে সর্তক থাকতো যেন ছেলেটা মোবাইলের উল্টোপাল্টা ব্যবহার না করে। আর আজ তার ঐটুকু পুচকে মেয়ে ইন্সট্রাগ্রামে একাউন্ট খুলতে চাইছে ? কেন চাইছে? তাহলে কি সে ঠিকমত শিক্ষা দিয়ে মানুষ করতে পারছে না? 
বিপাশা কাপড় গোছানো শেষ করে মেয়ের সামনে এসে মুখোমুখি বসলো। তারপর বললো, ‘তোমার বয়স কত?’
মিঠি অবাক হয়ে বললো, ‘মা তুমি জানোনা? আমার তো বারো বছর বয়স।’
বিপাশা স্থির ভঙ্গিতে বললো, ‘তোমাকে তো বলেছি এত ছোট বয়সে মোবাইল বা ফেসবুক ব্যবহার করাটা একদমই উচিত নয়।’
মিঠি খানিকটা অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে বললো, ‘আমার বন্ধুরা তাহলে কেন করে?’ 
বিপাশা মিঠির হাতটা ধরে বললো, ‘তোমার বন্ধুরা কি সবাই তোমার মত? তাদের মায়েরা কি সবাই একদমই আমার মত?’
মিঠি মাথা নাড়াল, ‘না না মা, এক রকম কেন হতে যাব? আমরা একেক জন একেক রকম। আর ওদের মা তোমার মত না। একেক রকম তবে ওদের মায়েরা ওরা ভুল করলেই অনেক বকে - মারে, চিল্লাচিল্লি করে ওদের সঙ্গে। তোমার মত করে বুঝিয়ে বলেনা মা। ওরা কত মন খারাপ করে এজন্য।’
- কিন্তু তাতে কি হয়েছে মা?
এবার বিপাশা বললো, ‘তাহলেই বোঝ। তোমরা সবাই এক রকম নও, তাহলে ওরা যা করছে তোমাকে তা কেন করতে হবে?’
 
ওদের মায়েরা হয়তো খেয়াল করছেন না ব্যস্ততার জন্য। আর আমি চাই তুমি সবকিছু সময়মত শেখো। আচ্ছা ধরো, আমি যদি ওদের মায়েদের মতন খুব বকতাম, কথায় কথায় মারধোর করতাম, আবার ইন্সট্রাগ্রামের একাউন্টও খুলে দিতাম, তাহলে বুঝি তুমি খুব খুশী হতে? শোন মিঠি, প্রত্যেক বাড়ীতেই তাদের নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন থাকে। সেরকমই আমার বাড়ীর নিয়ম হলো বাচ্চারা সেলফোন ব্যবহার করবে ১৮ বছর বয়স থেকে। হয়তো তোমার যেসব বন্ধুরা ফোন ব্যবহার করছে তাদের বাড়ীতে ফোন ব্যবহার নিয়ে এরকম কোন কড়া নিয়ম নেই, তাই ওরা এইটুকু বয়সে ফোন ব্যবহার করা, নেট ইউজ করে একাউন্ট খোলাকে খুব স্বাভাবিক ভাবছে। কিন্তু আসলে তো এটা উচিত নয় একেবারেই। একটানা অনেক গুলো কথা বলে থামলো বিপাশা। মিঠি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ বলে উঠলো, ‘তাহলে তানিজা এত ছোট হয়েও ফেসবুক ইউজ করে কেন মা? ওর মা তো ওকে ক্লাস ট্যু থেকেই মোবাইল ইউজ করতে দিয়েছে, তুমি জানো?’ 
বিপাশা খুবই অবাক হয়ে গেল মিঠির কথা শুনে। কারণ তানিজাদের সাথে ওদের আসা-যাওয়া আছে। মিঠির বাবার কলিগ তানিজার বাবা। তানিজার বাবা-মাকে যথেষ্ট সচেতন মনে হতো বিপাশার। তাহলে এরকম ভুল কিভাবে করছেন উনারা? বিপাশা বললো, ‘তুমি কি জানো একাউন্ট খুলতে গেলে ফর্মে বয়স লিখতে হয় এবং সেটা অবশ্যই ১৮+ হতে হয়? ১৮+ না লিখলে আইডি খোলা যায়না।’
মিঠি অবাক হয়ে বললো, ‘তাই নাকি মা?’ 
বিপাশা বললো, ‘হ্যাঁ তাই। এখন তুমি ফর্মে কত লিখবে তোমার বয়স? ১৮ বছর নাকি ১২ বছর ?’
মিঠি চিন্তিত মুখে বললো, ‘মা ১২+ লিখলে একাউন্ট খোলা যাবেনা কিন্তু ১৮+ লিখলে তো মিথ্যা কথা লেখা হয়ে যাবে!’ 
- তাহলে কি করবো মা?' 
বিপাশা  হাসলো, ‘তুমি এখন ভেবে বলো কি করবে, মিথ্যা কথা লিখে একাউন্ট খুলবে? নাকি যেদিন সত্যি লিখে একাউন্ট খুলতে পারবে সেদিনই খুলবে?’ 
মিঠির একটু মন খারাপ হলো কিন্তু সে স্পষ্ট করেই বললো, ‘আমি বড় হয়েই একাউন্ট খুলবো। কারণ আমি মিথ্যা কথা বলে কিছু চাইনা।’
বিপাশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো, ‘দ্যটস্ লাইক আ গুড গার্ল!’ 
মিঠি মাথা কাত করে বললো, ‘থ্যাঙ্কয়্যু মা।’
বিপাশা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো। বললো, ‘একটা কথা মনে রাখবে, আগেও বলেছি তোমাকে, মাকে কিচ্ছু লুকোবে না, ঠিক আছে?’
- আচ্ছা মা মনে থাকবে',আদুরে গলায় বললো মিঠি।

গত কিছু দিন থেকে বিপাশা খেয়াল করছিল, মিঠির মোবাইলের প্রতি আগ্রহ। সে মোবাইল ধরতে চাইতো, গেম খেলতে চাইতো। আজ বুঝতে পারলো কেন এই আগ্রহ। স্কুল থেকে বন্ধুদের কাছে এসব গল্প শুনে শুনেই নিশ্চয় ওর কৌতুহল বেড়েছে। 
বিপাশা মোবাইলে গেম খেলা পছন্দ করে না। ইনফ্যাক্ট বাচ্চাদের হাতে মোবাইল দেয়াটাই ওর খুব অপছন্দ। ওর টেনশন বেড়ে গেল, মিঠি কি একা একাই আইডি খুলতে শিখে ফেলেছে? যেহেতু তার বন্ধুরা কাজটা পারে, সেও তো শিখে যেতেই পারে তাদের দেখে দেখে! 

মিঠি বলছিল, ওর বন্ধুরা কেউ কেউ মোবাইল সাইলেন্স করে ব্যাগে লুকিয়ে স্কুলে নিয়ে আসে। কি সাাংঘাতিক ব্যাপার! ইদানিং অনেক মা তাদের ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিয়ে নিজেরা ফ্রি থাকতে চায়। আশে পাশে, আত্মীয় স্বজনদের মধ্যেও এরকম দেখেছে বিপাশা। এটা যে কতটা ক্ষতিকর কেন বুঝতে পারেনা এইসব মায়েরা? বিপাশার এক প্রতিবেশী ছিল। মহিলা লেখাপড়া তেমন জানতো না কিন্তু সারাদিন ফেসবুকে পড়ে থাকতো। দেড় বছরের বাচ্চাটার হাতে সারাক্ষণই ট্যাব দিয়ে রাখতো।
হয় কার্টুন দেখছে, না হয় হিন্দি ফিল্মের গান দেখছে। বিপাশা কতদিন বলেছে, ‘এভাবে বাচ্চার হাতে ট্যাব দেন কেন?’ 
- ওর যে ক্ষতি হচ্ছে বুঝতে পারেন না আপনি? 
মহিলা নির্বিকার ভঙ্গিতে হেসে বলতো, ‘কিছু হবেনা আপু, বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
বেবী ট্যাব নিয়ে থাকলে একটুও কান্না করে না। আমিও একটু আরামে থাকতে পারি।’
মহিলার অজ্ঞতায় বিরক্ত বিপাশা আর কথা বাড়াতো না, ‘কারণ তাকে বোঝানোর কোন মানে হয় না।’

রাতে ঘুমানোর আগে মুরাদকে সবকিছু জানালো বিপাশা। চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো মুরাদের মুখে। মুরাদ-বিপাশা ওদের সন্তানদের জন্য অনেক কষ্ট করে। ছেলে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত বাসায় ইন্টারনেট কানেকশনও নিয়েছিলনা ওরা। এখন নিতে হয়েছে, কারণ পড়াশোনার জন্য ছেলের দরকার হয়, আবার মুরাদের তো লাগেই। বিপাশা মিঠিকে নিয়ে চিন্তায় থাকে। তবে মিঠিকে গল্পের বই পড়তে শিখিয়েছে,ছবি আঁকার স্কুলে পাঠায়,গানের স্কুলেও যায়। এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকে মিঠি। কিন্তু স্কুল এবং বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শুনে আসে। অবশ্য বাসায় এসেই মাকে সব কথা তার বলা চাইই চাই! বিপাশাও মন দিয়ে শোনে ওর সব কথা।  এজন্যেই জানতে পারে,বুঝতে পারে মিঠির ভাবনার জগতে কি চলছে।

একদিন মার্কেটে দেখা হলো তানিজার মায়ের সঙ্গে। বেশ খানিকক্ষণ কথা হলো। কথা প্রসঙ্গে বিপাশা বললো, ‘ভাবী, তানিজা এত ছোট, ওকে মোবাইল দিয়েছেন? আবার নাকি ফেসবুকও ইউজ করে?’ 
তানিজার আম্মু হেসে বললো, ‘হ্যাঁ ভাবী, আর বলবেন না। আমরা দু'জনই এত ব্যস্ত থাকি যে তানিজাকে সময় দিতে পারিনা। বাসায় একা থাকতে থাকতে মেয়েটা খুব বোর হয়ে যায়, তাই মোবাইল দিয়েছি। ফেসবুক একাই খুলে নিয়েছে।’
বিপাশা খুব অবাক হয়ে গেল শুনে যে, ‘ক্লাস ট্যুতে পড়া একটা বাচ্চা একা একাই ফেসবুক আইডি খুলেছে এবং সেটা তার মা জেনে শুনেই তাকে ইউজ করতে দিচ্ছে!’
তানিজার মা বললো, ‘ভাবী জানেন কি হয়েছে? সেদিন তানিজা বুয়াকে জিজ্ঞাসা করেছে সেক্স মানে কি? বুয়া তো বলতে পারেনি। তারপর গুগল থেকে অর্থ জেনেছে কিন্তু বুঝতে পারেনি। তারপর আমাকে বুঝিয়ে দিতে বললো। আমি বলেছি বড় হলে বুঝবা,এখন বোঝার দরকার নেই।বোঝে নাই ভাবী। কাজেই চিন্তা নাই।’

বিপাশা খুব শঙ্কিত বোধ করতে লাগল মনে মনে। যে বাচ্চাটা গুগলে সেক্স শব্দটা লিখে সার্চ দিয়ে অর্থ জানতে চেষ্টা করে, সে তো ইউটিউবে সেক্স লিখে সার্চ দিলে এডাল্ট ভিডিও দেখে ফেলতেই পারে! বলতে গেলে একটা শিশু, সে জানবে, দেখবে সেইসব বিষয় যা তার একেবারেই দেখার কথা নয় এখন! এটা কি একটুও মাথায় আসছে না তানিজার মায়ের?

সেদিন রাতে মিঠিকে পড়াচ্ছিল বিপাশা। মিঠি হঠাৎ বলে উঠলো, ‘মা আমার ক্লাসের অনেক মেয়েই ক্রাশ খেয়েছে।’
বিপাশা অবাক হয়ে বললো, ‘কি খেয়েছে?’
- উফ্ফ মা! তুমি কিচ্ছু জানো না। ক্রাশ খেয়েছে! ক্রাশ!
বিপাশা সরল গলায় বললো, ‘ক্রাশ খাওয়া মানে কি?’
মিঠি সবজান্তা ভঙ্গিতে বললো, ‘ক্রাশ খাওয়া মানে কাউকে খুব ভালো লাগা।’ 
বিপাশা চোখ কপালে তুলে বললো, ‘এটাকে ক্রাশ খাওয়া বলে! আর তোমার ক্লাসমেটরা এটা খায়? ওরা ভালোলাগা মানে বোঝে?’ 
মিঠি অবজ্ঞার সুরে বললো, ‘মা ওরা সিরিয়ালের নায়কের উপরও ক্রাশ খায়। কি যে এক একটা গাধা কি বলবো!’
বিপাশা ইচ্ছে করেই জানতে চাইলো, ‘তুমিও কি ক্রাশ খাও মিঠি?’
ঝটপট উত্তর দিলো মিঠি, ‘খাই তো! তোমার আর বাবার উপর ক্রাশ খাই মা। তোমরা আমার ক্রাশ!’

বিপাশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। সে মনে করার চেষ্টা করলো মিঠিদের বয়সে সে বা তার বন্ধুরা কি এই রকম ছিল? তারা কি এ বয়সেই কাউকে ভালোলাগে বলতো বা বুঝতো?  অথবা তারা কি এত ফ্রি ছিল নিজেদের বাবা মায়ের সাথে? মিঠিকে কি ঠিক মত মানুষ করতে পারছে সে? বর্ষণকে তো ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত নিয়ে এসেছে কোন ঝামেলা ছাড়াই। মিঠিকেও পারবে তো?

আজ সকাল দশটায় মিঠির স্কুলে জরুরী প্যারেন্টস মিটিং। গতকাল মেসেজ এসেছিল। প্রিন্সিপ্যাল হঠাৎ করেই এই মিটিং কল করেছেন। এজন্য আজ মিঠির স্কুল ছুটি হয়ে গেছে আগেই। কারণ এই মিটিং এ নাকি স্কুলের সকল টিচাররাও উপস্হিত থাকবেন।
মিঠি  বলছিল ওদের স্কুলে একটা মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, মেয়েটা অনেক অসুস্হ। স্কুলের গেট এ স্টুডেন্টদের আসা-যাওয়ার ব্যাপারে আরও বেশী কড়াকড়ি করা হয়েছে। এর বেশী কিছু সে জানে না। বিপাশাও তাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। বিপাশা ঠিক দশটায় স্কুলের অডিটোরিয়ামে পৌঁছে গেল। মুরাদ আসেনি, তার অফিসে অনেক ব্যস্ততা।

সাধারণত; ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা এবং তাদের মানুষ করতে যত দৌড়াদৌড়ি সবই বিপাশা করে। অটোরিয়াম ভর্তি অভিভাবক। সাড়ে দশটায় মিটিং শুরু হলো। প্রিন্সিপ্যাল বলতে শুরু করলেন। মিঠিদের স্কুলের ক্লাস এইটের একটি মেয়ে (মেয়েটির সম্মানের কথা ভেবে প্রিন্সিপ্যাল তার নাম বলেননি), অন্য কলেজের একটি ছেলের সাথে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত হয়। তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। সম্পর্কটা গভীর হতে সময় লাগেনি। ছেলেটা মেয়েটাকে বাইরে দেখা করতে বলে। মেয়েটিও রাজি হয়ে যায়। সে স্কুলে আসার কথা বলে ছেলেটির সাথে দেখা করতে চলে যায়। তারপর স্কুল ছুটির সময়ে বাসায় ফিরে যায়। কিন্তু তারপর দিন ছেলেটি মেয়েটিকে বলে আমাকে দশ হাজার টাকা দাও। মেয়েটি বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের হলেও এত টাকা কোন কারণে বাবা-মায়ের কাছে চাইবে বুঝতে পারছিলনা। বাবা-মা দু’জনই ব্যস্ত, মেয়েকে সময় তেমন একটা দিতেন না। ছেলেটি  কিছু ছবি ও ভিডিও মেয়েটির মোবাইলে পাঠিয়ে বলে, টাকা না পাঠালে ছবিগুলো সে ইউটিউবে ছেড়ে দিবে।

মেয়েটা তখন খুব ভয় পেয়ে যায়, অসহায় বোধ করে। বুঝতে পারে ভালোবাসার নাম করে সেদিন যখন ছেলেটি তার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছিল, তখন গোপনে সেইসব মূহুর্তের ছবি তুলে  ও ভিডিও করে রেখেছিল। নিজের বোকামি বুঝতে পেরে ছোট মেয়েটা ভয়ে অস্হির হয়ে ওঠে। কি করবে না করবে বুঝতে পারেনা। গতকাল স্কুলের ওয়াশরুমে তাকে অজ্ঞান অবস্হায় পাওয়া গেছে। ধারালো ব্লেড দিয়ে সে তার বাম হাতের রগ কেটে ফেলেছিল। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। মেয়েটা এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। স্তব্ধ হয়ে শুনছিল বিপাশা। বুকের ভিতরটা ধক ধক করছে। মিঠির মুখটা মনে পড়লো। অস্হির লাগতে লাগলো তার। 

প্রিন্সিপ্যাল বললেন, ‘আজ আপনাদের যে কথাগুলো বলার জন্য আসতে বলেছি তা হলো-আপনারা বাবা-মা। আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ আরেকটু বেশী সময় দিন আপনাদের সন্তানদের। আর টেকনোলজি ব্যবহারে সচেতন হোন প্লিজ। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছেন। একবারও ভাবছেন না একটা এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট কানেকশন হাতে পাওয়া মানেই পুরো দুনিয়া হাতের কাছে চলে আসা। কিন্তু আপনার সন্তান এই পুরো দুনিয়ার সব ভালোর সাথে সাথে, সব খারাপের সাথেও পরিচিত হয়ে যাচ্ছে সময়ের আগেই। ওদের শৈশব, কৈশোর আটকে যাচ্ছে মোবাইল, ট্যাব  আর ল্যাপটপের মধ্যে। ওরা ১০/১২ বছরেই জেনে যাচ্ছে সেইসব বিষয়, যেসব বিষয় এখনই ওদের এই বয়সে জানার কথা নয়। কেন খেয়াল করছেন না আপনার সন্তান কি করছে?  কার সাথে মিশছে? কোথায় যাচ্ছে? ঘরই হলো প্রকৃত শিক্ষালয় আমি মনে করি। আমাদের স্কুলের একটি ছোট্ট মেয়ে, ছোট্ট-ই তো! পরিবারের উদাসীনতায় আজ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। স্কুলে অনেক সময় ব্যাগ সীজ করে মোবাইল পাওয়া যায়। ব্যাগে লুকিয়ে স্কুলে মোবাইল নিয়ে চলে আসে। বাড়ী থেকে সেই শিক্ষাটা আপনার দিন যে, মোবাইল ব্যবহারের বয়সই তাদের এখনও হয়নি। আমি জানি এখানে যত অভিভাবক আছেন তাদের মধ্যে সকলেই এমন উদাসীন নন। কেউ কেউ আছেন যারা খুবই সচেতন, সন্তানের প্রতি অনেক যত্নবান কিন্তু আমি জানি সকলে তা নন। তাই আমার অনুরোধ আপনারা সকলেই আরও সচেতন হন এবং আপনার সন্তানকে আরও বেশী করে সময় দিন, তাদের প্রতি যত্নবান হন যাতে এরকম দূর্ঘটনা আর না ঘটে ‘

অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে গেট পর্যন্ত হেঁটে আসতেই যেন কত যুগ লেগে গেল, এমন মনে হচ্ছে বিপাশার! অবষাদে ছেয়ে গেছে মনটা। মেয়েটার মা নিশ্চয় এখন খুব আফসোস করছে? কিন্তু কি লাভ? সময়ের কাজটা সময়েই করা উচিৎ। তিনি সময়মত তার মেয়েটাকে সময় দেননি। যদি দিতেন তাহলে হয়তো আজ এই দিন দেখতে হতোনা। আসলে মা হওয়াটা খুব সহজ কিছু নয়। সন্তান জন্ম দিলেই মা হওয়া যায়না। মা হতে গেলে অনেক ত্যাগ, অনেক ধর্য্যের প্রয়োজন হয়।

বিপাশা বাসায় ফিরে মিঠির রুমে চলে আসলো। মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। মিঠি রুমেই ছিল। বিপাশা মেয়েকে আঁকড়ে ধরলো বুকের মধ্যে। সে আগলে রাখবে তার মেয়েকে। একটুও ভুল করতে দেবে না। কিছুতেই না। ইন শাহ আল্লাহ! নাম না জানা হাসপাতালের বেড এ শুয়ে থাকা মেয়েটির জন্য খুব কষ্ট হতে লাগলো বিপাশার। চোখ ভরে উঠলো জলে। আহারে...
 
মিঠিকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বিপাশা যেন নিজেকেই প্রশ্নটা করলো, ‘এ কোন সময়ে বাস করছি আমরা?’ 

আরও পড়ুন- শুঁটকি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড