• বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

দৈনিক অধিকার ঈদ সংখ্যা-১৯

গৃহকর্তার ঈদ

  কবির কাঞ্চন

০৬ জুন ২০১৯, ১৬:৪৮
গল্প
ছবি : গৃহকর্তার ঈদ

ঈদের বাজার করে বাসার দিকে হাঁটছেন আবু জায়েদ। দু’হাতে ঈদের শপিংব্যাগ। এই বাজার করতে পকেটের সব টাকা শেষ। বাবা-মা, ছোট ভাই-বোন থাকেন গ্রামের বাড়িতে। তার ওপর শহরে নিজের এক ছেলে, এক মেয়ে, বৌ আর একমাত্র ছোট ভাই আছে। মেয়েটা এখনও ঈদ শপিং না বুঝলেও ছেলে কিন্তু ঈদ শপিং এর জন্য রীতিমতো কান্না জুড়ে দিয়েছিল।
তাই ওর জন্য ভালোভাবে ঈদের পোশাক কিনতে হয়েছে। 

বৌকে গত ঈদেও কোনকিছু কিনে দিতে পারেননি। এবার না দিলে নিশ্চিত ওর প্রতি অবিচার করা হবে। তাছাড়া স্বামী হিসেবে এককাপড়ে স্ত্রীকে দেখতে তার আর ভালো লাগে না। তাই বৌ'র জন্য একখানা নতুন শাড়ী কিনেছেন। 

ছোটভাই এখানে থেকেই পড়াশুনা করছে। হিসাববিজ্ঞানে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। নিজে দু’বেলা দু’টো টিউশনি করে যা পায় তা দিয়ে ওর পকেট খরচ হয়। বাকী সব আবু জায়েদকেই দেখতে হয়। ছোটভাইয়ের জন্য ২৫০০টাকা দিয়ে একটি পাঞ্জাবি নিয়েছেন। 

সবার জন্য কেনাকাটা শেষ করে মানিব্যাগটার দিকে একবার দেখে নিলেন। আর মাত্র শ' খানেক টাকা আছে। এবারও নিজের জন্য কিছুই কেনা হলো না। ইচ্ছে ছিল  এই ঈদে একটি সুন্দর পাঞ্জাবি নেবেন। একই পাঞ্জাবি পরে সব সময় মসজিদে যেতে হয়। পাশের লোকে কি বলে? আবার ভাবতে লাগলো, আমি একই পাঞ্জাবি বারবার পরলেও তা সবসময় পরিপাটি পরি। এবারও ভালোভাবে ধুয়ে ইস্ত্রি করে পরবো। তাহলে নতুনের মতো লাগবে। 

কিন্তু পায়ের জুতার কি হবে! একজোড়া নরমাল  জুতা নিতে গেলেও তো ২০০/৩০০ টাকা লাগবে। 
না থাক, যেটি আছে তা মুছির কাছে সেলাই করে পালিশ করে নিলেই সুন্দর হয়ে যাবে।  
ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে কখন যে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন তা তার খেয়াল ছিল না। প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে এসেছেন। দরজার কলিংবেলে আঙ্গুল চাপতেই ওপার থেকে দৌড়ে এসে দরজা খুলে দেয় অনাবিল। বাবার হাতে ঈদের শপিং ব্যাগ দেখে খুশিতে, ‘মা!, মা!’ বলে জোরে ডাকতে থাকে সে। 
অনাবিলের মা, সুমাইয়া আক্তার তখনও ইফতারি তৈরি করছেন। ছেলের ডাকে চুলার আগুন একটু কমিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে ফিরে আসেন। অনাবিল মাকে শপিং ব্যাগগুলো দেখিয়ে বলল,
- মা, দেখো, আব্বু, আমাদের সবার জন্য সুন্দর সুন্দর পোশাক এনেছেন।
- ঠিক আছে। এখন ওসব রেখে দাও। ইফতার করে নামাজ পড়ে সবাই মিলে একত্রে সব পোশাক দেখবো। 
‎অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ইফতারির সময় হয়ে গেল। সবাই একত্রে বসে ইফতার করলো। এরপর নামাজ আদায় করে খাটের ওপর গোল হয়ে বসলো।  ততক্ষণে অনাবিলের ছোটচাচা, আলীও পাশের সোফায় এসে বসলো। 
আবু জায়েদ মিষ্টি হাসি দিয়ে শপিং ব্যাগ থেকে অনাবিলের ও স্নেহার ঈদ পোশাক বের করলেন। এরপর অনাবিলের পোশাকটি বামহাতে তুলে ধরে অনাবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা তোমার জন্য। কি বাবা, তোমার পছন্দ হয়েছে?’
‎অনাবিল খুশি হয়ে বাবার হাত থেকে নিয়ে পরতে লাগলো। এরপর আবু জায়েদ একে একে সবার ঈদ শপিং বুঝিয়ে দিলেন। 
‎পাশ থেকে সুমাইয়া আক্তার জিজ্ঞেস করলেন,
‎- তোমারটা কোথায়?
‎স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় ইতস্তত করে বললেন,
‎- না, মানে ইয়ে! আজকাল জিনিসপত্রের যে দাম, মানুষ কিভাবে কেনাকাটা করবে! ঈদের এই সামান্য বাজার করতেই আমার বেতন-বোনাসের সব টাকা শেষ হয়ে গেল। বলি, আমাদের যদি এমন অবস্থা হয়, তবে যারা আমাদের চেয়ে খারাপ 
‎অবস্থানে আছে তাদের কী অবস্থা হবে! আল্লামা মালুম।
‎- তার মানে তুমি এবারও নিজের জন্য কিছু নেওনি?
‎আবু জায়েদ নিচু মাথায় আস্তে করে বললেন,
‎- নিয়েছি তো। তোমাদের সবার জন্য যা নিয়েছি তা তো আমারই। 
‎সোফায় বসে বড়ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আলী। সেই ছোটবেলা থেকে বড়ভাই পিতার  আদরে-শাসনে বড় করেছেন। একসময় শহরে নিয়ে আসেন। সেই থেকে সবকিছু ভাইয়াই দেখছেন। নিজের সন্তানের মতো আমায় দেখেন।  ভাবিও আমার সাথে সুন্দর আচরণ করেন। নিজের ছোট ভাইয়ের মতো জানেন। আমার পড়াশুনার খোঁজ রাখেন। কি খাই, কিভাবে ঘুমাই, কোথায় যাই, সব।  আমি এও বুঝি, আমার ভাইয়া আমার দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখেন বলেই সব ঠিক আছে। 
‎কিন্তু ভাইয়া সবার জন্য ঈদের বাজার করে আনলেন।  নিজের জন্য কিছুই আনলেন না। ভাইয়ার কথার ধরণে বোঝা যাচ্ছে, ভাইয়ার কাছে আর টাকা নেই। আরেকটা কথা কোনভাবেই মাথায় ঢুকছে না। সবার জন্য দামী দামী সুন্দর পোশাক এনেছেন। তাছাড়া আমার জন্য যে পাঞ্জাবিটা এনেছেন সেটির টাকা দিয়ে ইচ্ছে করলে দুইটা পাঞ্জাবি কিনতে পারতেন। 
‎ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে আলী খাটের পাশে এসে বলল, ‘ভাইয়া, আমার একটা কথা আছে।’
‎আবু জায়েদ আলীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‎- কী! পাঞ্জাবি পছন্দ হয়নি?
‎- আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু--।
‎- তাহলে আবার কিন্তু কি?
‎- আমাদের সবার জন্য আনলেন; আপনার জন্য আনলেন না কেন?
‎আবু জায়েদ অপ্রস্তুত গলায় বললেন,
‎- আমার তো আছে।
‎- আমাদেরও তো আছে। তারপরও তো এনেছেন। আপনার কি কোন শখ নেই?
‎- শখ আছে কিন্তু সাধ্য নেই। আমার মতো বড় হও, তখন তুমিও বুঝবে। বাড়িতে বাবা-মা, ছোটবোন আছে। তাদের জন্য ঈদের পোশাকআশাক কিনেছি মাত্র। তাদের খাবার খরচও তো পাঠাতে হবে। পুরানো জামা ইস্ত্রি করে গায়ে জড়ালে লোকে নিন্দা দিবে না। কিন্তু আমাদের মতো এমন জোয়ান ছেলে থাকতে বাবা-মা না খেয়ে মরলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবো না।
‎আলী মাথা নিচু করে ভাবে, ভাইয়া তো ঠিক কথায় বলেছেন। ভাইয়ার অবস্থান থেকে তিনি করে যাচ্ছেন। কিন্তু সন্তান হিসেবে তাঁদের জন্য আমি কি করছি! তাছাড়া ভাই হিসেবেও কি করছি!
‎হঠাৎ মানিব্যাগটা বের করে পাঁচ হাজার টাকা আবু জায়েদের হাতে দিয়ে বলল,
- ‎ভাইয়া, এই টাকাগুলো রাখুন। আমার প্রাইভেটের বেতন। আর একটা কথা, এগুলো থেকে কিছু দিয়ে আপনার জন্য সুন্দর  দেখে একটি পাঞ্জাবি নিবেন। তা না হলে আমি এই পাঞ্জাবিটা পরবো না। 
‎আবু জায়েদ ভাইয়ের মুখের দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।
 

আরও পড়ুন - চিঠি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড