• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

স্বপ্নের দেশ ইরানে মেডিকেল পড়াশোনার দিনগুলো

  কামরুজ্জামান নাবিল ০৩ মার্চ ২০১৯, ১৬:১২

ইরান
ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (ইনসেটে লেখক), ছবি : সম্পাদিত

অনেকের অনেক স্বপ্ন থাকে তেমনি আমার স্বপ্ন ছিল ইরান ভ্রমণের, কিন্তু তা মেডিকেলে পড়াশোনার সুযোগের মাধ্যমে পূরণ হবে তা ছিল সত্যিই অকল্পনীয়। যখন ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার মেইলের মাধ্যমে কনফার্ম হলাম আমাকে বৃত্তির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে তখন তা দেখে নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না।

প্রথমে যখন মরহুম বাবাকে খুশির সংবাদটি দিয়েছিলাম তখন তিনিও অবাক হয়েছিলেন। অতঃপর ২০১৪ সালের শুরুতে মেডিসিনে ফুল বৃত্তি নিয়ে ইরানে পদার্পণ। ইরানে আসাটা সেসময় অনেকটা সহজ হলেও পরের ধাপগুলো ততটা সহজ ছিল না। ধাপে ধাপে অনেক কঠিন মুহুর্তের সম্মুখীন হতে হয়েছে তবে প্রবল ইচ্ছাকে সে কঠিন মুহূর্তগুলো এখন পর্যন্ত দমাতে পারেনি।

এক গভীর রাতে তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ, অতঃপর রাজধানী থেকে ১৫০ কি. মি. উত্তর-পশ্চিমের শহর কাজভিনের পথে যাত্রা। সেখানে ৬ মাসের ফার্সী ভাষা কোর্সের জন্য ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া।

অজানা এক ভাষা শিখতে হবে, সেটা কী সম্ভব হবে, এমন সব ভাবনায় ইরানে আসার প্রথম দিনগুলো কেটে যায়। প্রায় ৪০টি দেশের শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্সী ভাষা শিখছেন। শুরুর দিনগুলোতে ফার্সী ভাষা কিছুটা কঠিন মনে হলেও পরবর্তীতে শিক্ষকদের সহায়তা আর নিজের চেষ্টায় এই ভাষা খুব সহজেই নিজের আয়ত্তে চলে আসে।

এভাবেই চলে যায় ছয়টি মাস। এরই মাঝে কাজভিনে নেমে আসে তুষারপাত, এটায় ছিল জীবনের প্রথম নিজের চোখে তুষারপাত দেখার অভিজ্ঞতা। চারদিকে সাদা আবরণে আচ্ছাদিত গাছপালা, অন্যদিকে চলার পথগুলোও যেন সাদা আবরণে আচ্ছাদিত। এমন পরিবেশ সত্যিই অনেক চমৎকার আর উপভোগ্য ছিল। তার কিছুদিন পরেই সুযোগ হয় কাজভিন থেকে ৩০০ কি. মি. দূরে হামেদান শহরে মেডিকেল সায়েন্সের অন্যতম সেরা চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক আবু আলি ইবনে সিনার সমাধিসৌধ ভ্রমণ ও জিয়ারত করার। কাছ থেকে এই মহান ব্যক্তির স্মৃতিবিজড়িত ব্যবহৃত আসবাবপত্র দেখে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছিল। এই মুহুর্তটি ছিল ইরানে আসার প্রথমদিকের অন্যতম একটি পাওয়া।

ছয় মাস শেষে শুরু হয় বাংলাদেশে এইচএসসিতে পড়া বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলো নিয়ে প্রি-ইউনিভার্সিটি কোর্স। সাধারণত সে পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করা হয়। তারপরে চলে আসা ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর অফ মেডিসিন পড়তে।

ইরান

ক্লাসরুম

ইরানের মেডিকেল সায়েন্স একসময় বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থানে থাকলেও সেই ইরান এখন মেডিকেল সায়েন্সে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে। অনেকেরই জানার কথা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরে সেই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী ইমাম খোমেনি রহ. ইরানকে নতুন করে গড়তে এবং ইরানের মেডিকেল সায়েন্সকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে সেই সময় বাংলাদেশের মতো দেশ থেকেও অনেক ডাক্তারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যে ক্ষেত্রে তিনি অনেকখানিই সফল হয়েছিলেন। যার সত্যতাও ইরানের বর্তমান মেডিকেল সায়েন্সের সাফল্যই জানান দেয়।

ইরানে বর্তমানে প্রায় প্রত্যেকটি বড় শহরেই একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যার মোট সংখ্যা প্রায় ৪৭টি হবে। এছাড়া, কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। যার মাঝে প্রথমসারির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে এক হাজারের মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে, কয়েকটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্যাম্পাস। তেহরান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শিরাজ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আগেই খোলা হয়েছে বিদেশীদের জন্য ক্যাম্পাস, আর সম্প্রতি ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ও যুক্ত হয়েছে সেই সারিতে। এসব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকভাগে মেডিসিন, ডেন্টাল বিভাগে বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। যার বিস্তারিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব সাইটে দেওয়া আছে।

ইরানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন সাফল্যের জন্য যে মানুষগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর সেই সকল শিক্ষকরা। ইরানের প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সাপ্তাহিক ছুটি বাদে অন্যান্য সরকারি ছুটির কারণে যেসব ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না তা সপ্তাহের অন্য কোনোদিনে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেন, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বললে ভুল হবে না।

বলাবাহুল্য যে অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাদানে অসংখ্য বিদেশী শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে হাতেগোনা কিছু বিদেশী শিক্ষক ছাড়া প্রায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকই সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে সেখানেই চাকরিতে নিয়োজিত রয়েছেন। যার মাঝে অনেক শিক্ষকই বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসে নিজ দেশের মেডিকেল সায়েন্সকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয় ইরানের সকল বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশের মতো অপরাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই বাংলাদেশের মতো মিছিল, মিটিং, হরতাল, মারামারি, গোলযোগ ইত্যাদি। আমাদের মেডিসিন শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে দুইটি সেমিস্টার হয়ে থাকে। সেমিস্টারের ক্রেডিট নির্বাচন করার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সেই বছরের ক্লাস ও পরীক্ষার সময়সূচির বড় একটা রুটিন সকল শিক্ষার্থীর হাতে দেওয়া হয়। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সমস্যা নেই সেহেতু বছরের শুরুতে দেওয়া রুটিন মাফিকই শিক্ষাবর্ষের সমাপ্তি ঘটে থাকে।

তিন বছরের মেডিকেল পথচলায় অনেক অভিজ্ঞতায় যুক্ত হয়েছে যা লিখে শেষ করা যাবে না। তাই সুযোগ পেলে আবারও লেখা হবে এমন আশা রাখি। সবশেষে আপনাদের দোয়ায় সামনের পথ যেন আরও সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত হয় সে কামনা করছি।

লেখক : শিক্ষার্থী, (ডক্টর অফ মেডিসিন) ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড