• শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হার না মানা আব্দুস শাকুর

  আরিফুল ইসলাম আরিফ, জাবি প্রতিনিধি

২০ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৪৯
জাবি
আব্দুস শাকুর (ছবি : সম্পাদিত)

খুব ছোট বেলায় মাকে হারান। এরপর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এক দিকে পরিবারের দারিদ্র‌্য, আর অন‌্য দিকে দ্বিতীয় মায়ের সংসারে ভালোভাবে লেখাপড়ায় মন বসাতে পারেননি তিনি। তাই প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা শেষে জীবন বাঁচানোর তাগিদে সবকিছু ছেড়ে নেমে পড়েন অর্থ উপার্জনের জন্য। সোনালী শৈশবকে ত্যাগ করে শুরু করেন রিকশা চালানো।

এতক্ষণ যার কথা বলছি তিনি আব্দুস শাকুর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে সদ্য মাস্টার্স শেষ করেছেন তিনি। আব্দুস শাকুরকে বলতে হবে জীবন যুদ্ধের একজন লড়াকু সৈনিক। তিনি পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঘটকের আন্দুয়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক খবির হাওলাদারের ছেলে। ছয় ভাই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি।

রিকশা চালাতে চালাতেই পরিচয় হয় মৌলভী মোহাম্মদ নূর হোসেন মুন্সির সঙ্গে। তিনি একজন আল্লাহ প্রেমিক লোক ছিলেন। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিল ও ইসলামিক জলসায় যেতেন। তার আসা-যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল শাকুরের রিকশা। এই আসা যাওয়ার মাধ্যমেই তার সঙ্গে শাকুরের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে। তিনি শাকুরকে তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় অষ্টম শেণিতে ভর্তি করে দেন এবং মাদ্রাসার এতিম খানায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দেন। তার জীবন থেকে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি হারিয়ে যায়। সেখানে তার থাকা খাওয়ার কোনো প্রকার খরচ লাগত না। এভাবেই শুরু হয় তার নতুন জীবন। সেখান থেকেই শাকুরের বদলে যাওয়া শুরু।

এভাবে কিছুদিন পর তার সঙ্গে পরিচয় হয় আরেকজন মানুষের সঙ্গে, যিনি শাকুরের জীবনে আসেন একজন দূত হয়ে। তার নাম মনিরুল ইসলাম। তিনি অনার্স পড়ুয়া ছিলেন। মনিরুল ইসলামও ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার বাবা মির্জাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের দেখাশোনার কাজ করতেন। তাই তার জন্য একটি রুম দেওয়া হয়েছিল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। সেই রুমে একা থাকতেন মনির। তার রুমের সঙ্গী হিসেবে থাকার জন্য শাকুরকে তার কাছে নেয়। কারণ, মাদ্রাসা আর ইউনিয়ন পরিষদ ছিল পাশাপাশি। মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি প্রথমে শাকুরকে সঙ্গী হিসেবে নিয়েছিলেন তার একা থাকতে ভয় করত তাই।

মনিরুল ইসলাম বলেন, শাকুরের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৬ সাল থেকে। আমি একা থাকতে ভয় পেতাম, তাই শাকুরকে আমার কাছে নিয়ে আসি থাকার জন্য। ওই খাওয়া-দাওয়া মাদ্রাসার এতিমখানায় করত এবং আমার সঙ্গে রুমে থাকত। ও রুমে বসে পড়ত, আর আমি ওকে কোনো সমস্যা হলে দেখিয়ে দিতাম। পরে অবশ্য আমি যখন প্রাইভেট পড়ানো শুরু করি, সঙ্গে ওকেও পড়াতাম।

শাকুরকে সেখানে থাকা অবস্থায় লেখাপড়ায় সাহায্য করাসহ লেখাপড়া করতে উৎসাহিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখাতেন মনির। আর এসব পেয়ে শাকুর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। নিজের মধ্যে থাকা ইচ্ছেশক্তিকে জাগিয়ে তোলেন। ফলে, সকল প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে ঘটকের আন্দুয়া সালেহিয়া ফাযিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। যেটা এখনো পর্যন্ত তার মাদ্রাসার সেরা সাফল্য।

এরপর ভর্তি হন নিজ উপজেলার সুবিদখালী সরকারি কলেজে। এখানে পড়া অবস্থায়ও নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয় তাকে। কিন্তু কোনো প্রতিবন্ধকতাই যেন তার ইচ্ছেশক্তি আর আত্মবিশ্বাসকে আটকাতে পারেনি। এইচএসসিতে ৪.৮০ পেয়ে উত্তীর্ণ শাকুর কলেজে ফার্স্ট হয়।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য ঢাকায় চলে আসেন শাকুর। বন্ধুর থেকে ধার নিয়ে ইউসিসি কোচিংয়ে ভর্তি হয়। এরপর ভর্তি পরীক্ষা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেও তাকে ফরম তোলার টাকার জন্য বিভিন্ন জনের দ্বারস্থ হতে হয়। কিন্তু তাতে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন তিনি। পরে ভর্তি হয় ঢাকা কলেজে ইংরেজি বিভাগে। কিন্তু তিনি কিছুতেই তার স্বপ্নকে ভুলতে পারেননি। আবার প্রস্তুতি নেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য। এবার সুযোগ পান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির। অনেক কষ্ট করে অর্থ যোগাড় করে (চাষের জমি বিক্রি করে) ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে। এখানেও তাকে বাস্তবতার কঠিনতম বেড়াজালে শিকার হতে হয়। টিউশনের টাকা দিয়ে নিজের খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচসহ বিভিন্ন খরচ করে কিছু অর্থ জমাতে শুরু করেন।

২০১৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩.৬৪ পেয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করে স্নাতক পাস করেন। ২০১৭ সালে একই বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩.৭৫ পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে স্নাতকোত্তর পাস করেন।

আর বর্তমানে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। তার স্বপ্ন এখন আকাশ ছোঁয়া। এই কঠিনতর পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এখন সফলতার দ্বারপ্রান্তে!

এ বিষয়ে আব্দুস শাকুর বলেন, জীবনে অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আজকে আমি এই অবস্থানে। জীবনে চেষ্টা আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করা সম্ভব। ভালো কিছু করার জন্য এখনো আমাকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আমি ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডার হতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।

ওডি/আরএআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড