• রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

রাবির ভর্তি পরীক্ষা

প্রশাসনের বৃহৎ আয়ের ‘পরিকল্পনা’; সর্বমহলের ক্ষোভ

  নুরুজ্জামান খান, রাবি প্রতিনিধি

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০৯:৫৬
রাবি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (ছবি : সংগৃহীত)

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চলতি বছরের ভর্তি পরীক্ষার প্রাথমিক আবেদন শুরু হচ্ছে আগামী ৩ সেপ্টেম্বর থেকে। আবেদন চলবে ১২ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত। প্রাথমিক আবেদনে শিক্ষার্থীদের ৫৫ টাকা ফি দিতে হবে এরপর তাকে চূড়ান্ত আবেদনের জন্য আরও ১ হাজার ৯৮০ টাকা ফি দিতে হবে।

সব মিলিয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে ইউনিটপ্রতি ২ হাজার ৩৫ টাকা ফি দিতে হচ্ছে। প্রশাসনের এই নিয়ম তাদের বৃহৎ আয়ের পরিকল্পনা বলে মনে করছেন ভর্তিচ্ছু, শিক্ষার্থী ও সচেতন শিক্ষকরা। তাদের দাবি- ভর্তি আবেদন ফরমের মূল্য কমানো এবং নিয়ম পরিবর্তন করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা উপ-কমিটি সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক আবেদনকারীদের মধ্য থেকে উচ্চমাধ্যমিকের ফলের ভিত্তিতে তিনটি ইউনিটে ৩২ হাজার করে ৯৬ হাজার ভর্তিচ্ছু চূড়ান্ত আবেদনের সুযোগ পাবেন। চূড়ান্ত আবেদনকারীরা ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ পাবেন।

জানা যায়, ২০১৭-১৮ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১টি ইউনিটের অধীনে তিন লাখ ১৬ হাজার ১২০জন ভর্তিচ্ছু আবেদন করেন। ওই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি আবেদন ফরমের মূল্য ছিল ২৭৫ টাকা থেকে ৮২৫ টাকা। ২০১৭ সালের পরীক্ষায় প্রায় ১৮ কোটি ৫২ লাখ ৭৭ হাজার ৩০ টাকা আয় করে বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে ‘এ’ ইউনিটে ৩৩ হাজার ৬৮০জন আবদেনকারী কাছ থেকে ৮২৫ টাকা ফি বাবদ ২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, ‘বি’ ইউনিটে ৩১ হাজার ৮৬৯ জন আবেদনকারী থেকে ৩৩০ টাকা করে ফি বাবদ ১ কোটি ৫ লাখ ১৬ হাজার ৭৭০ টাকা, ‘সি’ ইউনিটে ৪৯ হাজার ১৭৪ জন আবেদনকারী থেকে ৭১৫ টাকা করে ফি বাবদ ৩ কোটি ৫১ লাখ ৫৯ হাজার ৪১০ টাকা, ‘ডি’ ইউনিটে ২২ হাজার ৫২৬ জন আবেদনকারী থেকে ৪৯৫ টাকা করে ফি বাবদ ১ কোটি ১১ লাখ ৫০ হাজার ৩৭০ টাকা, ‘ই’ ইউনিটে ৪১ হাজার ২৩২ জন আবেদনকারী থেকে ৭৭০ টাকা করে ফি বাবদ ৩ কোটি ১৭ লাখ ৪৮ হাজার ৬৪০ টাকা, ‘এফ’ ইউনিটে ৩৯ হাজার ৯৩৪ জন আবেদনকারী থেকে ৬৫০ টাকা করে ফি বাবদ ২ কোটি ৫৯ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ টাকা, ‘জি’ ইউনিটে ২৮ হাজার ৭৮৩ জন আবেদনকারী থেকে ৪৪০ টাকা করে ফি বাবদ ১ কোটি ২৬ লাখ ৬৪ হাজার ৫২০ টাকা, ‘এইচ’ ইউনিটে ৩৯ হাজার ৬২৬ জন আবেদনকারী থেকে ৫৫০ টাকা করে ফি বাবদ ২ কোটি ১৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা, ‘আই’ ইউনিটে ৪ হাজার ৩২ জন আবেদনকারী থেকে ৩৮৫ টাকা করে ফি বাবদ ১৫ লাখ ৫২ হাজার ৩২০ টাকা, ‘জে’ ইউনিটে ১৩ হাজার ৬৪২ জন আবেদনকারী থেকে ২৭৫ টাকা করে ফি বাবদ ৩৭ লাখ ৫১ হাজার ৫৫০টাকা, ‘কে’ ইউনিটে ১১ হাজার ৬২২ জন আবেদনকারী থেকে ২৭৫ টাকা করে ফি বাবদ ৩১ লাখ ৯৬ হাজার ৫০ টাকা আয় করে বিশ্ববিদ্যালয়।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষেও প্রায় ১৫ কোটি ৯৪ লাখ ৮৭ হাজার ৫২১ টাকা আয় করে বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বছর দুই ধাপে চলে আবেদন প্রক্রিয়া। প্রাথমিকভাবে ৫৫ টাকা দিয়ে আবেদন করার পর চূড়ান্ত আবেদন করতে হয় ইউনিটপ্রতি নির্ধারিত ফি দিয়ে। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক আবেদন করে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০ জন ভর্তিচ্ছু। এতে আয় হয় প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ ৭৮ হাজার ৩০০ টাকা। চূড়ান্ত আবেদনে আয় হয় প্রায় ১৪ কোটি ৩৮ লাখ ৯ হাজার ২২১ টাকা। এর মধ্যে ‘এ’ ইউনিটে ১ হাজার ২৫৪ টাকা করে ৩০ হাজার ৬৫২ জন ভর্তিচ্ছুর থেকে ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৩৭ হাজার ৬০৮ টাকা, ‘বি’ ইউনিটে ৭২৬ টাকা করে ২৪ হাজার ৪০৬ ভর্তিচ্ছুর থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ ৯ হাজার ১৫৬ টাকা, ‘সি’ ইউনিটে ১ হাজার ২৫৪ করে ৩১ হাজার ৯ জন ভর্তিচ্ছুর থেকে ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৮৫ হাজার ২৮৬ টাকা, ‘ডি’ ইউনিটে ৯৯০ টাকা করে ৩০ হাজার ৮৯০ জনের কাছ থেকে  ৩ কোটি ৫ লাখ ৮১ হাজার ১০০ টাকা এবং ‘ই’ ইউনিটে ১ হাজার ১২২ টাকা করে ৩০ হাজার ৩৯৬ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩ কোটি ৪১ লাখ ৪ হাজার ৩১২ টাকা আয় করে।

চলতি বছরেও দুই ধাপে চলবে আবেদন প্রক্রিয়া। প্রাথমিক আবেদন ৫৫ টাকা এবং চূড়ান্ত আবেদন করবেন তিনটি ইউনিটে ৯৬ হাজার শিক্ষার্থী। চূড়ান্ত আবেদন ফি ১ হাজার ৯৮০ টাকা। সে হিসেবে ৯৬ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় আয় করবে ১৯ কোটি ৫৩ লাখ ৬০হাজার টাকা। প্রাথমিক আবেদন বাড়লে আয় আরও বাড়বে।

সূত্রে জানা যায়, ভর্তি ফরম থেকে আয়ের অর্ধেক অংশ ব্যয় হবে পরীক্ষা সংক্রান্ত এবং এ দায়িত্বে থাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের পারিশ্রমিকে। বাকি ৪০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগার এবং ১০ শতাংশ পাবে অনুষদগুলো।

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অর্থ উপার্জনের জন্য ভর্তি ফরমের মূল্যবৃদ্ধি করছে বলে মন্তব্য করেছেন ভর্তিচ্ছু, অভিভাবক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

আনিকা আনজুম মালিহা নামের ভর্তিচ্ছু বলেন, প্রশাসন নিজেরদের অর্থ উপার্জনের জন্য ভর্তির নিয়ম ও ফরমের দাম বাড়িয়েছে। উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ার স্বপ্ন দেখে। বন্যা কবলিত পরিবারের পক্ষে দুই হাজার টাকা দেওয়া সম্ভব না। তাহলে কি তাদের স্বপ্ন টাকার অভাবে নষ্ট হবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহাব্বত হোসেন বলেন, উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের টার্গেট থাকে রাবি। চলতি বছরের বন্যায় এ অঞ্চলের মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। সেসব পরিবারের পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব কী না তা প্রশাসন ভাবেনি। প্রশাসন শুধু নিজেদের কোষাগার শক্ত করার ফন্দি করে থাকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, আগে থেকেই আবেদন ফি মাত্রা ছাড়িয়েছে। একটি ইউনিটে দুই হাজার টাকা আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে যদি আবেদন ফি কমানো হয় সেক্ষেত্রে আমি খুশি হব।

এছাড়াও নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক আবেদন ফি বৃদ্ধির সমালোচনা করেছেন। তাদের সকলেরই দাবি ফি কমানো। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত ২৯ জুলাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বক্তব্য ব্যাখা করেছেন। বিজ্ঞপ্তিতে প্রশাসন দাবি করেন পূর্বে শিক্ষার্থীরা একাধিক ইউনিটে পরীক্ষা দিত। সে সময় আবেদন ফি কম হলেও একাধিক ইউনিটে আবেদন করতে হলে চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য নির্ধারিত ফি’র চেয়েও বেশি খরচ হতো। এবার একটি ইউনিট হওয়ায় ফি বেশি মনে হলেও আগের তুলনায় কম।

এ বিষয়ে রাবির ভর্তি পরীক্ষা উপকমিটির সভাপতি ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন নয়। আগে এক শিক্ষার্থী অনেকগুলো ইউনিটে পরীক্ষা দিত; এখন একটি ইউনিটের অধীনে কয়েকটি অনুষদের পরীক্ষা নিচ্ছি। এগুলো করা হয়েছে তাদের খরচ ও ভোগান্তি কমাতে। আমাদের টাকা আয়ের উদ্দেশ্য থাকলে শুধু ৯৬ হাজার শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত আবেদনের সুযোগ দিতাম না।

ওডি/আরএআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড