• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩৫ °সে
  • বেটা ভার্সন

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

রেজিস্ট্রার-শিক্ষকের অনিয়ম ও অর্থ কেলেঙ্কারি, বিপাকে উপাচার্য

  সরকার আব্দুল্লাহ তুহিন, জাককানইবি প্রতিনিধি

২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:৪৭
জাককানইবি
ড. মো. হুমায়ুন কবীর, উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমান ও ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকী (ছবি : সম্পাদিত)

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীরকে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের (ইএসই) সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ চেষ্টা ও চীনের ফার্স্ট ইনস্টিটিউট অব ওসেনোগ্রাফি (এফআইও) থেকে একটি প্রকল্প নিয়ে একই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও গবেষক ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীকে নিয়ে সম্প্রতি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে।

পক্ষে-বিপক্ষে অভিযোগের প্রেক্ষিতে এর অনুসন্ধানে নামে দৈনিক অধিকার।

দৈনিক অধিকারের অনুসন্ধানে ওঠে আসে, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে নিজের নিয়োগ চূড়ান্ত করতে ক্ষমতার ব্যবহার করে নিজের মতো নিয়ম করে বৈধ করার চেষ্টা করেন। রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) এর পূর্বেও ইউজিসির নিয়ম ভেঙে নিজে ও পছন্দের ব্যক্তিদের পদোন্নতি করিয়ে সমালোচনার মুখোমুখি হন। একক আধিপত্য বিস্তারে নিজের মতো করে ক্ষমতার ব্যবহার করে তৈরি করেছেন আইন।

বিভাগে শিক্ষক হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান বিভাগের প্রধান ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকী। বাধাকে সরাতে ড. আশরাফকে বেকায়দায় ফেলতে রেজিস্ট্রার বেছে নিয়েছেন চীন থেকে নিয়ে আসা প্রকল্পকে। যে প্রকল্পে ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর প্রকল্প ব্যয় অস্বচ্ছ।

যার মধ্যে নিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. নকিবুল হাসান খান বলেন, আশরাফ সিদ্দীকীর অনিয়মে বিভাগ সংকটে আছে। তার প্রকল্পের ব্যয়ে অনেক ভুল তথ্য দেওয়া আছে। তার প্রকল্পে ব্যয় করা অর্থের ব্যবহার অস্বচ্ছ। যেখানে পানির মূল্য, বাস ভাড়া, ডালের বিলের যে পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করেছে তা ভিত্তিহীন। দৈনিক অধিকারের অনুসন্ধানে এই শিক্ষকের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।

প্রকল্পের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ড. আশরাফ প্রকল্পের ব্যয়ের জন্য আনা অর্থ তিন কিস্তিতে মোট ১ কোটি ৬৯ লাখ ৩৫ হাজার ৯০ টাকা উত্তোলন করেন। যা উত্তোলন ও সংরক্ষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এসটিডি হিসাব-৩৩২৮২০৩০০০০২৪ ও এসটিডি হিসাব-৩৩২৮২০৩০০০০০২ ব্যবহার করেছে। যেখানে এসটিডি হিসাব-৩৩২৮২০৩০০০০২৪ থেকে অর্থ উত্তোলন করতে হলে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা দপ্তরের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়।

ড. আশরাফকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিট হয় না এমন একটি হিসাব ব্যবহারের পরামর্শ দেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান। যার এসটিডি হিসাব-৩৩২৮২০৩০০০০০২। যার প্রমাণ মেলে প্রথম কিস্তিতে চীন থেকে আসা অর্থ উত্তোলনের সময়। ২৫ লাখ টাকা অর্থ উত্তোলন করার সময় কেবল ৫০০০ টাকা (পাঁচ) ব্যাংক চার্জ কর্তন করে পুরো টাকা নিয়ে নেন আশরাফ, কিন্তু পরবর্তীতে ১ কোটি ৫০ লাখ ১১ হাজার ৩৬৭ টাকা উত্তোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০ শতাংশ অর্থ দিতে হবে বলে জানায়, যেখানে পূর্বে লেনদেনের সময় কোনো অর্থ চায়নি প্রশাসন।

এ দিকে, দেশের বাইরে থেকে আসা ফান্ড ব্যবহারে কোনো নীতিমালা নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। পরবর্তীতে উপাচার্যের মৌখিক নির্দেশে মোট অর্থের ৪ শতাংশ অর্থ অ্যাকাউন্টে রাখতে হয়। এ বিষয়ে ট্রেজারার অধ্যাপক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, মৌখিকভাবে মোট অর্থের ৪ শতাংশ কর্তন করে বাকি টাকা দিতে উপাচার্য নির্দেশ দিয়েছেন যা আমি জানতাম না। আমার জানামতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী সেটি ১০ শতাংশ রাখার কথা ছিল। তবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কোথাও ২-৩ শতাংশ কর্তন করে যেমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে কর্তন করে না। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করতে দিয়ে ড. আশরাফ সিদ্দিকীর লেনদেনকে বৈধতা দিয়েছে প্রশাসন।

২০১৬ সালে প্রস্তাবনা পাঠানোর মধ্যদিয়ে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের অর্থ প্রথমবার ১৬ নভেম্বর ২০১৭ সালে ও পরবর্তীতে ৩ জানুয়ারি ২০১৯-এর উত্তোলনের অনুমতি দেয় প্রশাসন। দাপ্তরিক কাগজাদিতে বৈধ হলেও ব্যয় নির্ধারণে অনেকটাই অন্ধকারে ড. আশরাফ।

অন্যদিকে, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের জেরে বিভাগের প্রধান ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকী ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. হুমায়ুন কবীরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। যেখানে নিয়োগ পেতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিভিন্ন শর্তে পরিবর্তন করানো হয়, তবে বিভাগীয় প্রধান ড. আশরাফের আপত্তিতে শেষ রক্ষা হয়নি রেজিস্ট্রার ড. হুমায়ুন কবীরের। ৫ আগস্ট ২০১৮ এ বিভাগের ৩ সদস্যের প্লানিং কমিটির এক সভায় কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত-৩ এ উল্লেখ থাকে- সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদনকারী কেউ শর্ত পূরণ করেনি তাই প্রবেশপত্র প্রেরণ না করার সুপারিশ করা হলো।

যে আবেদনকারীদের মধ্যে কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীর ছিলেন। পরবর্তীতে ১৮ মার্চ ২০১৯-এর প্ল্যানিং কমিটির সভায় কমিটির দুইজন সদস্য সহকারী অধ্যাপক মো. রকিবুল হাসান ও মো. নকিবুল হাসান খান পূর্বের সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে প্রবেশপত্র পাবার সুপারিশ করে, কিন্তু কমিটির সভাপতি আপত্তি জানিয়ে তা আবার প্রেরণ করেন প্রশাসনকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ৯২ পৃষ্ঠায় ৯ নম্বর এ বলা হয়েছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার সিদ্ধান্তের সহিত ভাইস চ্যান্সেলর ঐক্যমত পোষণ না করিলে, তিনি তাহার দ্বিমত পোষণের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া সিদ্ধান্তটি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ বা সংস্থার নিকট পুনর্বিবেচনার জন্যে ফেরত পাঠাইতে পারিবেন এবং যদি উক্ত কতৃপক্ষ বা সংস্থা পুনর্বিবেচনার পর ভাইস চ্যান্সেলরের সহিত ঐক্যমত পোষণ না করেন তাহা হইলে বিষয়টি সিদ্ধান্তের জন্যে চ্যান্সেলরের নিকট প্রেরণ করিতে পারিবেন এবং এই ক্ষেত্রে চ্যান্সেলরের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হইবে’। কিন্তু এই আইন না মেনে সিন্ডিকেটে বিষয়টি উপস্থাপন করে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যা রেজিস্ট্রারের পক্ষপাতদুষ্ট।

পুরাতন বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ড. হুমায়ুন কবীর অযোগ্য বিবেচিত হলেও উপাচার্যের ইচ্ছায় পুনর্বিবেচনার জন্যে আহ্বান জানানো হয়েছিল। নিয়োগে রেজিস্ট্রারের মূল বাধা বিভাগের প্রধান ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকী। বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে তাকে অপসারণ করাতে আশরাফের আনা প্রকল্পের অনিয়মকে বেছে নেন হুমায়ুন। যেখানে হুমায়ুনের পরোক্ষ সঙ্গী হন বিভাগের অন্য শিক্ষক।

ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর প্রকল্পের ব্যয় হিসাবে রয়েছে অস্বচ্ছতা–এমন অভিযোগের সত্য মিলেছে। একদিকে, উপাচার্যের সদিচ্ছায় হুমায়ুনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের চেষ্টা, অন্যদিকে আশরাফের প্রকল্পে উপাচার্যের স্বাক্ষর এবং অর্থ  উত্তোলনে নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে উভয় সংকটে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমান।

শিক্ষক নিয়োগ ও প্রকল্পের অস্বচ্ছতা নিয়ে ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকী বলেন, রেজিস্ট্রার (হুমায়ুন) আমার বিভাগের শিক্ষক হবার জন্যে এটা নিয়ে রাজনীতি করছেন। তার যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক হতে চাওয়াটা অন্যায়, আর আমি তা মানব না তাই আমাকে সরানোর জন্যে সে আমায় আর আমার প্রোজেক্টের পেছনে লেগেছে। আমাকে সরাতে পারলে তার রাস্তা পরিষ্কার হয়।

প্রকল্প বিতর্ক আর নির্দিষ্ট স্বার্থে শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, আমি কোনো রাজনীতির মধ্যে নেই। প্রশাসনের যা দরকার সেটা মনে করেই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসন (উপাচার্য) পরিবর্তন হলে নিয়মেও পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। আর উনার (ড. আশরাফের) প্রকল্পে অস্বচ্ছলতা আছে। ভুল বুঝিয়ে উপাচার্যের স্বাক্ষর নিয়েছেন তিনি, যেখানে সেই স্বাক্ষর করার কথা আমার। এটা আইনের বাইরে বেআইনি কাজ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু-নীলদলের সভাপতি সিদ্ধার্থ দে সিধু বলেন, যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটিও শর্ত না মানে তবে সেই নিয়োগ হওয়া উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের বাইরে কোনো কিছু হতে পারে না।

অন্যদিকে, শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে যেটা হচ্ছে সেটা দুঃখজনক, বিভাগীয় প্রধানের বিষয়টি তদন্তাধীন। আমি জানি উনি কারণ দর্শানোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি সকল অন্যায়ের বিপক্ষে, কিন্তু ঐ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে আবেদনের যোগ্যতা যে প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা হয়েছে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। বর্তমান সময়ে ৪টি প্রথম শ্রেণি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ কোনোভাবে কাম্য নয়। প্রশাসনকে ইউজিসির নীতি অনুসরণ করা উচিত বলে মনে করি।

রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ও উপাচার্যের কাছে দেওয়া ড. আশরাফ সিদ্দিকীর কারণ দর্শানোর উত্তর যা প্রশাসনিকভাবে গোপনীয়, সেই নথি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. নকিবুল হাসান খানের হাতে দেখতে পাওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিজীবী পেনশন পেতে হলে কমপক্ষে ২৫ বছর কর্মরত থাকতে হয়। যা হুমায়ুন কবীর রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে পাবে না, অন্যদিকে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে পারলে তা সম্ভব। 

অন্যদিকে শিক্ষকদের অন্তর্কোন্দলে প্রায় অচল হয়ে পরেছে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের (ইএসই) কার্যক্রম। তীব্র সেশনজটের আশঙ্কায় রয়েছে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে চালু হওয়া বিভাগের চার ব্যাচের মোট দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। তারা জানান, বিভাগের অস্থিতিশীল এই পরিবেশ আমরা চাই না, সময়মতো আমাদের ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া হোক।

ওডি/আরএআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড