ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ইতিহাস কী বলছে?

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:২৮

  মো. মাহাদী হাছান

আসন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ( ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের কৌতূহলের শেষ নেই। ঢাবি ক্যাম্পাসে চায়ের আড্ডায় এখন শিক্ষার্থীদের একমাত্র আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিতব্য ডাকসু নির্বাচন। কিন্তু ডাকসু নির্বাচনের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে হয়তো অনেকেরই জানা নেই। সেই সব পাঠকের কথা চিন্তা করে দৈনিক অধিকারের আজকের আয়োজন ডাকসু নির্বাচনের অতীত ইতিহাসের আলোকে বর্তমান প্রেক্ষাপট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক বছর পরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এটি। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে পূর্বনাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’(ডাকসু) রাখা হয়।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই ছাত্র সংসদ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনসহ আরও অনেক উল্লেখযোগ্য আন্দোলনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা।

সর্বপ্রথম ডাকসু নির্বাচন :

প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন হল- ঢাকা হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও জগন্নাথ হল থেকে একজন করে শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধি এবং উপাচার্য মনোনীত একজন শিক্ষক দিয়ে সংসদ গঠিত হত। ১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সংসদের সাধারণ সভায় খসড়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। ১৯৫৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ডাকসুর প্রথম নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হত। ডাকসুর প্রথম সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এবং প্রথম নির্বাচিত সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হলেন এস এ বারী ও জুলমত আলী খান।

স্বাধীন বাংলায় ডাকসু নির্বাচন :

প্রতিষ্ঠার পর থেকে শুরু করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মোট ৩৬ বার। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৭ বার। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী ১৯৯০ সালে প্রায় ২৮ বছর পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ডাকসু নির্বাচন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান। সর্বশেষ ১৯৯০-৯১ সেশনের জন্য সহসভাপতি নির্বাচিত হন আমানউল্লাহ আমান এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন খায়রুল কবির খোকন।

পুনরায় ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা :

২০১২ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ শিক্ষার্থীর করা একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ বছরের ১৭ জানুয়ারি রায় দেয়, যেখানে ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগামী ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে।

ডাকসু

ডাকসু সংগ্রহশালা

 

ডাকসুর গঠনতন্ত্র :

ডাকসুর গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে ডাকসু নির্বাচনের পর মাত্র এক বছর পর্যন্ত তার কার্যকারিতা থাকবে। এক বছর পর যদি ডাকসু নির্বাচন না হয় তবে ৩ মাস পর্যন্ত উহার কার্যকারিতা থাকবে। এরপর আপনা আপনিই ডাকসু বাতিল হয়ে যাবে। আর কেবল নিয়মিত ছাত্ররাই ডাকসুর কর্মকর্তা কিংবা সদস্য হতে পারবে। যদি ডাকসুর কর্মকর্তা নির্বাচিত হওয়ার পর কারো ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যায় তবে সঙ্গে সঙ্গে ডাকসু হতে তার পদ বাতিল হয়ে যাবে। এই ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পুনরায় ওই পদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেবেন।

ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন ও পরিমার্জন :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের গঠনতন্ত্রের কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় গঠনতন্ত্রের এই সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়। 

গঠনতন্ত্রের যে সব সংশোধন করা হয়েছে তা হলো- 

১. যে সকল শিক্ষার্থী ১ম বর্ষ স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অনার্স/মাস্টার্স/এমফিল পর্যায়ে অধ্যয়নরত আছে এবং যারা বিভিন্ন আবাসিক হলে আবাসিক/অনাবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে সংযুক্ত রয়েছে এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখে যাদের বয়স কোনক্রমেই ৩০ বছরের অধিক হবে না, কেবলমাত্র তারাই ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার হতে পারবে। সকল ভোটারই প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা রাখে

২. সান্ধ্যকালীন বিভিন্ন কোর্সে অধ্যয়নরত কোনো শিক্ষার্থী ভোটার হতে পারবে না

৩. সরকারি/বেসরকারি অথবা দেশে বা বিদেশের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো শিক্ষার্থী ভোটার হতে পারবে না

৪. অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প কলেজের কোনো শিক্ষার্থী ভোটার হতে পারবে না

৫. গঠনতন্ত্রের/প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আবাসিক হলেই ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হবে

৬. সময়ের চাহিদা বিবেচনায় ডাকসু ও হল সংসদে কয়েকটি সম্পাদক ও সদস্য পদ সৃষ্টি করা হয়েছে 

ডাকসুর নির্বাচন ও আচরনবিধি প্রণয়ন কমিটি :

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক এস এম মাহফুজুর রহমানকে প্রধান নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ন কর্মকর্তাকে সহায়তা করার জন্য আরো পাঁচ জন নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

তারা হলেন- মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. দিদার-উল-আলম, গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. অমল কৃষ্ণ হালদার, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। এছাড়াও ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য নাসরীন আহমাদকে আহ্বায়ক করে ৭-সদস্য বিশিষ্ট ‘আচরণবিধি প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য

বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য ( ডাকসু সংগ্রহশালা)

 

কমিটির সদস্যরা হলেন- আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অনুষদের ডিন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন, আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল মোকাদ্দেম এবং টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ জে এম শফিউল আলম ভূইয়া।