• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

একটি কক্ষেই সৃষ্টি হয় একাধিক গল্প : বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল 

  রিয়াজুল ইসলাম, জবি প্রতিনিধি

১৮ এপ্রিল ২০২২, ১৩:৪৯
একটি কক্ষেই সৃষ্টি হয় একাধিক গল্প : বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল 
বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, জবি (ছবি : সংগৃহীত)

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল চালু হয়েছে, যা জবির ইতিহাসের এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। তার সঙ্গে ঘুচে গিয়েছে অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমাও।

গত ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ছাত্রী উঠানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথম হলে আবাসন প্রাপ্তির আবেগ, অনুভূতি, পাওয়া না পাওয়া নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী-

নতুন পরিচয়ের উচ্ছ্বাস

মাস দুয়েক আগেও বাংলাদেশের একমাত্র অনাবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ছিলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল জবির এই দীর্ঘকালীন পরিচয় সংকট কাটাতে সক্ষম হয়। পুরান ঢাকার মেস ব্যবসা, বাড়িওয়ালাদের অযাচিত ভাড়ার দায়, অস্বাস্থ্যকর ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ছোঁয়াবিহীন অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও রেহাই মিলেছে হল-এর মাধ্যমে। নির্মল আলো বাতাসের কমতি নেই হলে। তবে যে হারে ভর্তুকি মিলেছে ছাত্রী প্রতি ব্যয়ের খাত ততখানি গুণগতভাবে রক্ষা করা হচ্ছে কি না, বিষয়টি খতিয়ে দেখার মতো। হাউজ টিউটরদের নম্বর সর্বত্র খুঁজে পাওয়া গেলেও প্রয়োজনে তাদের দেখা পাওয়া দায়। খাবারের মানের তুলনায় দাম যথেষ্ট বেশি। ছাত্রীদের হলে আবাসন সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্র, মেধাবী, বাসার দূরত্ব বিবেচনায় রাখার কথা থাকলেও সব মিলিয়ে অনিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে কোনো ছাত্রীর হক যাতে নষ্ট না হয়, এদিকটা আরও সচেতনভাবে দেখা উচিত ছিলো বলে মনে হয়েছে। হলের প্রভোস্ট ম্যামের আচরণ ছাত্রীদের প্রতি প্রচণ্ড আন্তরিক ও বেশ সদয়। হলের পরিবেশ সুন্দর। প্রথম হল হিসেবে এ যাত্রায় আরও বেশি সংস্কৃতিমনা পরিবেশ ও সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলো যুক্ত হবে বলে আশা রাখি।

শারমিন সুলতানা নিশি, অনার্স চতুর্থ বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

খুঁজে পাওয়া আপন ঠিকানা

লবণ ছাড়া তরকারি যেমন স্বাদহীন, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করবেন আর হলে থাকবেন না, তাতে যেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ষোল আনাই বৃথা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৫ সালে কলেজ থেকে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের। কলেজ সময়কালে যেসব হল ছিল সবগুলো দখল বিভিন্ন মাথাচাড়া দেয়া গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় চলতে শুরু করল হলবিহীন, তবে বিশ্ববিদ্যালয় মানেই যে ইতিহাস সৃষ্টির কারখানা, নতুন কিছু আদায়ের স্থান। হলের জন্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে প্রশাসন বাধ্য হয়ে ছাত্রীদের জন্য হলের কাজ শুরু করে এবং অবশেষে ২০২২-এর ১৭ মার্চ বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল উদ্বোধনের মাধ্যমে ছাত্রীরা পা রাখল তাদের একমাত্র হলে।

পূর্বে হল সুবিধা না থাকায় অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের থেকে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক চর্চাসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম থেকে তুলনামূলকভাবে অনেকটা পিছিয়ে ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। এছাড়া তারা হলবিহীন তকমাও অনেকদিন ধরে নিজেদের নামের পাশে বহন করে চলেছিল। কিন্তু এখন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের সুবাদে ছাত্রীরা নিজেদেরকে আরও ভালোভাবে বিকশিত করতে পারবে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক চর্চা, রাজনৈতিক চর্চাসহ সিনিয়র-জুনিয়রের যে মেলবন্ধন, সবকিছুর একটি সুবিকশিত পথের সৃষ্টি হবে। ছাত্রীরা এখন নিজেদেরকে প্রাণ খুলে প্রকাশ করতে পারবে। সকল কাজ শেষে দিন শেষে নিজের আপন ঠিকানায় একটুখানি প্রশান্তির শ্বাস নিতে পারবে।

আনতাজ হেনা আঁখি, অনার্স ৪র্থ বর্ষ, মনোবিজ্ঞান বিভাগ

আবাসিক হল বহুল আকাঙ্ক্ষার বিষয়

অনুভূতি প্রকাশের শুরুতেই স্মরণ করতে চাই যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্দোলনের ফলে আজ আমরা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল পেয়েছি। নিঃসন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আবাসিক হল, যা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বহুল আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। সিনিয়রদের সাথে রুম বা বেড ভাগাভাগি করে থাকার নানান শঙ্কা নিয়ে রুম নাম্বার ৮০৫-এ শুরু হয় আমার জীবনের নতুন গল্প। একটি রুমেই সৃষ্টি হয় একাধিক গল্প। যার কোনোটা সুখময় আবার কোনোটা হৃদয়বিদারক! কতগুলো অচেনা মুখ হঠাৎই আপন হয়ে ওঠে। কেউ আঁকছে, কেউ গোপনে বালিশ ভেজাচ্ছে, কেউবা আবার ভবিষ্যতের চিন্তায় বইয়ে মুখ ডুবিয়ে আছে। কখনোবা মেতে উঠি গল্প, আড্ডা, খুনসুঁটিতে। হলের প্রভোস্ট ম্যাম ও হাউজ টিউটররা ছাত্রীদের প্রতি খুবই আন্তরিক। সব মিলিয়ে হল আমার কাছে একটি আবেগের জায়গা। তবে মুদ্রার এপিঠ যেমন আছে ওপিঠও আছে। খাওয়া-দাওয়া, পরিষ্কার টয়লেট নিয়ে সংগ্রাম চলে প্রতিনিয়ত। এ বিষয়গুলোর কিছুটা উন্নতি হলে বেশ ভালো হয়। কত শত গল্পের সাক্ষী থাকে এখানে! তবে হলের সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, ১৬ তলা থেকে দাঁড়িয়ে বুড়িগঙ্গা, লঞ্চ, নৌকা দেখা। প্রবল বাতাস যেন সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দেয়। হল জীবনের প্রতিটা স্মৃতি অম্লান হয়ে থেকে যাবে জীবনের পাতায়।

নিগার নিশাত, অনার্স তৃতীয় বর্ষ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ

অনাবাসিক তকমা থেকে মুক্তি পেল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

১৭ মার্চ ২০২২-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০২তম জন্মবার্ষিকীতে ছাত্রীদের হলে ওঠার মাধ্যমে অবসান হলো জবির অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা।

একজন জবিয়ান হিসেবে আবাসন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই খুশি। আমি মনে করি আবাসন সংকট দূর হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট অনেকটা কমে যাবে এবং তাদের সময় এবং শ্রম দুটোই বাঁচবে। এতে করে সেই বাড়তি সময়টা তারা সৃজনশীলতার বিকাশে যথাযথ ব্যবহার করতে পারবে।

তাছাড়া হলকেন্দ্রিক সংগঠন চালু হলে অনেকে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। পূর্বে যে প্লাটফর্মটা ছিলো না বলে অনেকেই নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখতো, সেই সমস্যা দূরীভূত হবে। সর্বোপরি আমি মনে করি শিক্ষার্থীদের মেধাচর্চার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে। বিগত দিনগুলোর তুলনায় প্রতিটি ক্ষেত্রে মেয়েরা এখন আরও বেশি এগিয়ে যাবে বলে আশা করি।

মুনিয়া আক্তার যুথী, অনার্স তৃতীয় বর্ষ, ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট

নতুন অধ্যায়ের স্বাক্ষী

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হল এমন এক আবাসস্থল যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা জীবনের পরবর্তী ধাপগুলোর জন্য ধৈর্য্য, নেতৃত্ব, সহনশীলতা, সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধতার মত দারুণ সব গুণাবলি অর্জনের সুযোগ পান। প্রিয় বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও পথচলা যেমন ঐতিহাসিক তেমনই এর হল গুলোর নেপথ্যেও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। অবিভক্ত ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় আবাসিক সুবিধাসংবলিত কলেজগুলোর অন্যতম একটি ছিল প্রিয় এ শিক্ষাঙ্গন। তৎকালে আবাসিক হল ছিল ১১ টি যেগুলো কাল পরিক্রমায় বেদখল হয়ে যায় আর অনাবাসিক তকমা জোটে বিশ্ববিদ্যালয়টির। তবে ইতিহাস থেকেই প্রাপ্ত অধিকার আদায়ে দীক্ষিত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন-ত্যাগের মুখে ও প্রশাসনের সুদৃষ্টির কল্যাণে হারিয়ে যাওয়া হলগুলো পুনরোদ্ধার না হলেও সূচনা হয় নতুন এক পথচলার। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল। প্রায় সাড়ে বারোশত ছাত্রীদের বৃহৎ এ পরিবারের একজন হতে পেরে ভাগ্যবতী মনে হয় নিজেকে যারা নতুন এ অধ্যায়ের স্বাক্ষী হয়ে থাকবে জবির ইতিহাসের পাতায়। সারাবেলা ছুটোছুটি-ক্লান্তির পর বিহঙ্গের স্বস্তির নীড়ের ন্যায় নিরাপদ ও প্রশান্তিময় আমাদের এ নিবাস। মুদ্রার এপিঠ- ওপিঠ এর ন্যায় সুবিধা-অসুবিধা, পূর্ণতা-অপূর্ণতার উর্দ্ধে হল জীবন চমৎকার সব অভিজ্ঞতা ও ভালোলাগাতেই কাটছে। ছাত্রীদের দায়িত্বশীলতা ও প্রশাসনের আন্তরিকতায় এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক।

নওশীন নাওয়ার জয়া, তৃতীয় বর্ষ , প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ

ওডি/ইমা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড