• মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

অপেক্ষার পালা শেষ, তিতুমীরের শ্রেণিকক্ষগুলোতে খুশির মেলা

  মোহাম্মদ রায়হান, তিতুমীর কলেজ প্রতিনিধি

২৫ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৫৭
তিতুমীর কলেজ
মন্তব্য প্রদানকারী শিক্ষার্থীরা (ছবি : সম্পাদিত)

কেটেছে শুনশান খুলেছে আলয়, ফিরেছে স্বজন নীড়ে- দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশী ঘরবন্দী সময় পার করে ক্যাম্পাসে ফেরা শুরু করেছে রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা। গত বছরের মার্চে করোনা সংক্রমণের কারণে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো বন্ধ হয়ে যায় তিতুমীর কলেজও। রবিবার (২৪ অক্টোবর) থেকে সশরীরে পাঠদান শুরু হয়েছে কলেজটিতে। এতে বাঁধভাঙা খুশির আমেজ শিক্ষার্থীমহলে। সবাই আবারও ফিরতে পেরেছে স্ব স্ব ক্লাসরুমে। তিতুমীর কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফেরার অনুভূতি জানাচ্ছেন দৈনিক অধিকারের তিতুমীর কলেজ প্রতিনিধি, মোহাম্মদ রায়হান-

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ (স্নাতকোত্তর) বিভাগের ছাত্র মো. সাইফুল ইসলাম নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, স্বাভাবিক জীবনের কিছু স্মৃতি নিয়ে এত দিন করোনাকাল পার করলাম৷ প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতো এই বুঝি আর ক্যাম্পাসে যাওয়া হবে না, প্রাণের ক্যাম্পাসের গেটের সামনে রাস্তা বন্ধ করে বন্ধুদের নিয়ে কলেজের নাম খোদাই করা লেখা গেটের সঙ্গে ছবি উঠানো হবে না। মাঠের কোণে গানের আসর হবে না, অগ্রজ ও অনুজদের সঙ্গে হাসি গল্পে মেতে ওঠা হবে না। এরকম ভাবতে ভাবতে নিজেকে বহুবার হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু না এখনো আমি বেঁচে আছি, কল্পনার জগত থেকে কিছুটা বের হয়ে এসেছি পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার দয়াতে। তাইতো আজ শুনলাম সুসংবাদ। কলেজ খুলেছে আবার হাসবো, আবার গান গাইবো শিক্ষকদের বুকে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করবো আমাদের কি মনে আছে? আমরা আপনাদের সন্তান কতটা দূরে ছিলাম সে হিসাব মিটিয়ে নিব এখন প্রতিটি ক্লাসের মাঝে, কোনো শিক্ষককেই আর হাত ছাড়া করবো না।

তিনি আরও বলেন, ৫৮৫ দিন পর কলেজ খুলেছে এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কারণ মানুষ যখন আশার থেকে বেশি কিছু পেয়ে যায় তখন ভাষা থাকে না। এতদিন পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরবো এটা কেউ ভাবিনি। কত আপনজন হারিয়েছি, কত কাছের মানুষের হারানোর সংবাদ পেয়েছি, মন পোড়ার গন্ধ শুঁকেছি কিন্তু কিছু করার ছিল না। কতটুকু সান্ত্বনা দিলে পুরো করোনাকালের দুঃখ ভুলতে পারবো? কিছু নীরব ক্ষতি মেনে নিয়েও ২০১৯ সালের অনার্স কম্পিলিট করলাম ২০২১ সালে। এখন মাস্টার্সে ভর্তি হলাম জানি না কত বছর লাগবে মাস্টার্স শেষ হতে। শ্রেণী কক্ষে আবার ফিরতে পেরে মনে হচ্ছে বছরর দুই ঈদে বাড়িতে বাবা মায়ের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে এসেছি। বাবা মায়ের বুকে ফিরলে যেমন শান্তি অনুভব করি ঠিক তেমনি প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে অনুভব করছি। মুক্তির স্বাদ কার না ভালো লাগে। এত দিন পর স্বাধীনভাবে হাসবো ভালোবাসায় ভাসবো প্রাণের ক্যাম্পাসে। তবে হ্যাঁ মহামারির কালো আভাস এখনো কাটেনি সুতরাং সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আকুতি ও অনুরোধ রেখে যাচ্ছি । "শিক্ষাগুরু, বন্ধু-বান্ধব, অগ্রজ-অনুজদের সঙ্গে হাসতে চাই আপন আলোয় মুক্তির স্বাদ পেতে চাই।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের জহিরুল ইসলাম হাসিব বলেন, সেই অনির্দিষ্টকালের জন্য যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলো প্রায় দুই বছর পর তা নির্দিষ্ট করে খুলল। প্রথমে যদিও খুশি হয়েছিলাম কিন্তু বন্ধু-বান্ধবদের ছাড়া সে খুশি বেশী দিন স্থায়ী হলো না। এ দুই বছরে অনেক কিছুই পালটে গেছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী যেহেতু মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির তাই কারো আর ঢাকা থাকা হলো না। যারা পার্ট টাইম জব করে খরচ চালাত তাদের জব নেই, যারা টিউশন করত তাও নেই। মা বাবার চিন্তা ছিল ছেলের দ্রুত অনার্স শেষ হলে একটা চাকরি নিয়ে ফ্যামিলির হাল ধরবে। তা আর হলো কই! ফেসবুকের কল্যাণে দেখলাম করোনায় কিছু মেয়ে সহপাঠীর বিয়ে হয়ে গেছে, কিছু ছেলে বন্ধু পাড়ি জমালো ভীন দেশে। কারণ, তার ফ্যামিলির হাল ধরতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কলেজ খোলার প্রথম দিন ক্লাস রুমে গিয়েই একটা হাহাকার অনুভব করি। তৈরি হয় এক আবেগঘন মুহূর্ত। বেঞ্চগুলো যেন আমার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে। তারা জানতে এতদিন কোথায় ছিলাম? তাদের ভুলে কীভাবে ছিলাম? আস্তে আস্তে ক্লাস রুমটা মুখোর হতে চলল সহপাঠীদের আড্ডায়। পরিচিত অনেক মুখ সামনে এলো। অনেক মুখকে দেখতে পেলাম না। হয়তো অনেক স্বপ্ন ধামাচাপা দিয়ে জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েছে কেউ, কেউবা স্বামীর সংসার সামলাতে এখন ব্যস্ত, আর কেউ টাকা, চাকরী, টিউশন ইত্যাদির অভাবে ঢাকায় আসারই সাহস পাচ্ছে না। শিক্ষকও অনেক দিন পর পেয়ে গল্প জুড়ে দিলেন আমাদের সঙ্গে। সেই চিরচেনা ক্লাস রুম আবার ফিরে পেলাম আমরা। ক্লাস শেষে জম্পেশ এক আড্ডা দিয়ে সেই আবার বাসায় ফেরার তাড়া। জ্যামের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া।

হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের আয়েশা সিদ্দিকা নুসরাত নিজের অনুভূতি জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবার খুলেছে ক্যাম্পাস, এ নিয়ে আনন্দের যেন শেষ নেই। করোনা মহামারীতে অনেকদিন প্রাণের ক্যাম্পাসে ক্লাস করা হয় না, মেতে ওঠা হয় না আড্ডায়, আবার সেই প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরতে পারবো ভাবিনি। শিক্ষার্থী শূন্য শ্রেণিকক্ষগুলো যেন প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অনেক মিস করেছে, তেমনি ক্যাম্পাসের ক্লাসে বসে গান, সেই সঙ্গে শিক্ষকদের পাঠদান কিংবা তাদের আদরভরা শাসনগুলো বেশি বেশি মিস করেছি। প্রতিদিন ক্যাম্পাসে সকাল হতে না হতেই আসা, সারাদিন ক্লাস করে ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করা, সেই সঙ্গে আমার নেশা ক্যাম্পাসের নতুন কোনো কিছু পেলে সেটা দেখা, এক কথায় সুন্দর ক্যাম্পাসের মোহে পড়ছিলাম। সেই সঙ্গে বন্ধু বান্ধবরা থাকলে তো কথাই নেই! ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠান- পহেলা বৈশাখ, ২১ ফেব্রুয়ারি, সেই সঙ্গে নানা ধরনের অনুষ্ঠানে মুখরিত আমাদের ক্যাম্পাস। করোনাকালীন আমরা বেশি মিস করেছি ক্যাম্পাসকে, আর সেই সঙ্গে ক্যাম্পাস আমাদের অপেক্ষায় ছিল কবে আমাদের আড্ডায় আবার মুখরিত হবে, পদচিহ্ন পড়বে নবীন, পুরাতন, আর ক্যাম্পাসের মোহে পড়া সব শিক্ষার্থীদের। করোনা মহামারীতে প্রতিটি শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের ক্লাসে ফেরার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল, আজ সে অপেক্ষার পালা শেষ, আমরা ফিরছি আমাদের প্রাণপ্রিয় বিদ্যাপীঠে। আবারও মুখরিত হচ্ছে আমাদের ক্যাম্পাস। শ্রেণিকক্ষগুলো আজ খুশি। আমরা বসতে পারছি চিরচেনা ক্লাসরুমে।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাকিল আহমেদ বলেন, মানুষ হৃদয়হীন নয় আর শিক্ষার্থীরাও মানুষের বাইরে নয়। মনের ওপর মানুষের মানসিকতা নির্ভর করে। আমাদের মন চাঙ্গা রাখতে এবং ইতিবাচক চিন্তা করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনন্য ভূমিকা পালন করে। করোনা মহামারীর কারণে দীর্ঘ দেড় বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার ফলে আমি মানসিকভাবে অনেক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ায় আমার অনুভূতি বর্ণনাতীত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া আমার কাছে একভাবে মানসিক প্রশান্তির কারণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ফলে আমার দ্রুত স্নাতক সম্পন্ন হবে এবং আমি পূর্বের থেকে পাঠ্যবই পড়ার প্রতি বেশি অভ্যস্ত হব। আমাদের ক্যাম্পাস খুলে দেওয়াতে ঘরবন্দী জীবনের একঘেয়েমিতা দূর হয়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানমুখী হতে পেরে আমি খুবই খুশি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয় প্রতিষ্ঠানের পুরাতন ক্লাসরুমে চিরচেনা বন্ধুটির পাশে বসে ক্লাস করার যে আনন্দ, বইয়ের পাতার প্রতিটি অক্ষরে যে অনুভূতি লুকায়িত তা আমি ব্যতীত অন্য সবার কাছে অজানায় থেকে যাবে।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড