• শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কোথায় গেল ৬০০ একর?

  ইমতিয়াজ আহমেদ শাকিল

০১ জুলাই ২০২০, ১৯:৪৩
ঢাবি
ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একটি রাষ্ট্রভাষার জন্মদাতা, একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দ্রষ্টা। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বললে আর বোঝাতে হয় না দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠটির কথা। ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, ২ হাজার শিক্ষক ও ৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী মাতিয়ে রেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা।

প্রতিনিয়ত এখানে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন বিভাগ। নতুন বিভাগের সঙ্গে যোগ হচ্ছে শিক্ষার্থীও। তবে শিক্ষার্থীর সমানুপাতিক হারে বাড়ছে না এর আয়তন। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আয়তন কমছে ১৩টি অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ, ১১টি ইনস্টিটিউট ও ২০টি হল নিয়ে ঢাকার বুকে সগর্ভে দাঁড়ানো এই প্রতিষ্ঠানটির।

একসময় ৬০০ একরের ওপর দাঁড়ানো এই প্রতিষ্ঠানটি আজ যেন নিজভূমে পরবাসী। কোথায় গেল এই ৬০০ একর জমি আর মনোরম স্থাপনা গুলো? চলুন নামা যাক ৬০০ একরের খোজে, ঘুরে আসি ইতিহাসের পাতা থেকে।

বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ১৯১১ সালে। তখন থেকেই মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বঙ্গের মানুষদের অন্যতম দাবি ছিল ঢাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা। ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় এলে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী এবং নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিশন লর্ডের সঙ্গে সাক্ষাত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন। লর্ড হার্ডিঞ্জ দাবিটি আমলে নেন। এর প্রেক্ষিতে লর্ড ১৯১২ সালের ২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করেন যার সভাপতি ছিলেন তৎকালীন বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ব্যারিস্টার রবার্ট নাথান [আর নাথানিয়েল]। এই কমিশন নাথান কমিশন বলে পরিচিত।

১৯১৭ সালে বড় লর্ড; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য লর্ড চেমস পোর্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম নির্ধারণে আর একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিশন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন বলে পরিচিত। এরপর ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল কর্তৃক ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট অনুমোদন লাভ করে। এর প্রেক্ষিতেই ১ জুলাই ১৯২১ সালে ১২টি বিভাগ, ৩টি অনুষদ, ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী ও ৬০ জন শিক্ষক নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সংখ্যা ছিল তিন টি। ঢাকা হল, মুসলিম হল ও জগন্নাথ হল। তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের অক্সব্রীজ শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূচনালগ্নে বিভিন্ন প্রথিতযশা বৃত্তিধারী ও বিজ্ঞানীদের দ্বারা কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রিত হবার প্রেক্ষাপটে এটি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে স্বীকৃতি পায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব হল বাংলাদেশ স্বাধীন করতে এর বিশেষ অবদান ছিল। যেখানে দেশের সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে বিশেষ অবদান রেখেছিল। প্রতিষ্ঠা লগ্নে অনেকেই বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন বলে শোনা যায়। তবে এ প্রসঙ্গ এখন থাক। আলোচনার মূল প্রেক্ষাপটে ফেরা যাক।

তৎকালীন পরিত্যক্ত সচিবালয় অর্থাৎ বর্তমানের ঢাকা মেডিকেল, গভর্নমেন্ট হাউজ বা পুরাতন হাইকোর্ট ভবন, ঢাকা কলেজের ভবন গুলো অর্থাৎ বর্তমান কার্জন হল ও এর আশপাশের ভবনগুলো, প্রেসক্লাব; মিন্টো রোড; হেয়ার রোড; নীলক্ষেত এসব এলাকার ১০০টির বেশি মনোরম ভবন নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

রমনা সিভিল স্টেশন এলাকার মোট ৬০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রমনা সিভিল স্টেটের মালিকানা নিয়ে ১৯২১ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক সরকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে টানাপোড়েন চলে পরবর্তী সময় বাৎসরিক ১০০০ টাকা ভাড়ার ভিত্তিতে প্রাদেশিক সরকার রমনা সিভিল এলাকার ৭২৮ বিঘা জমি ও এর উপরের সব ভবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে ইজারা দেয়। এ সময় কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে বিশ্ববিদ্যালয় যে ৫০ লক্ষ টাকা পেয়েছিলো তাও প্রাদেশিক সরকারকে দেওয়া হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই-তৃতীয়াংশ জমি ও এর ওপর থাকা ভবন সমূহ রিকুইজিশন করে নেয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় বলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ একর জমি এবং এর ওপরে থাকা ১০০ ভবনের কথা। তাহলে এই সম্পত্তিগুলো কোথায়?। এর হদিস নিতে যেতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি শাখায়।

তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট ম্যানেজারের অফিস থেকে সম্পত্তিগুলোর কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় না। তাহলে প্রশ্ন হলো এই সম্পত্তিগুলো কোথায়? ১৯২৮ এরপর থেকে প্রাদেশিক সরকারকে দেওয়া ভাড়া ও ৫০ লক্ষ টাকারও কোনো নথি পাওয়া যায় না বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি শাখায়। ১৯৪৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট কতটুকু সম্পত্তি পূর্ব পাকিস্তান সরকার নিয়েছে এবং কোন কোন ভবন তার অন্তর্ভুক্ত সে সম্পর্কেও কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাই আবারও একই প্রশ্ন ওঠে কোথায় সেই ৬০০ একর আর কোথায় সেই ১০০ ভবন। চলুন খোঁজ চালানো যাক। একে একে খুঁজে বের করা যাক ৬০০ একরের নিশানা

১. ঢাকা মেডিকেল কলেজ ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই পুরাতন কলা ভবন ও পার্শ্ববর্তী জমি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ।

২. বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জায়গায় গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা আলিয়া মাদরাসা এবং সচিবালয়।

৩.পুরাতন হাইকোর্ট ভবন ১৯২১ সাল থেকেই পুরাতন হাইকোর্ট ভবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। এক সময় ভবন টি ঢাকা কলেজের কার্যক্রম চালানোর জন্য দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে ঢাকা কলেজকে স্থানান্তর করা হয়। তখন এই ভবন টি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হয়। এটি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে তা সরকার দখলে নেয় এবং বর্তমান হাইকোর্ট হিসেবে ভবনটিতে কাজ শুরু হয়।

৪. জাতীয় জাদুঘর ১৯৭৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় জাদুঘরকে তিন একর জায়গা ছেরে দেয়। কথা ছিল জাদুঘর কর্তৃপক্ষের ছেড়ে আসা ৪ একর জমি ও ভবনাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সে জমির দখল নেওয়া যায় নি।

৫. কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের সৃতিস্বরূপ শহীদ মিনারকে কিছু জায়গা পূর্ত মন্ত্রণালয় কে দেওয়া হলেও ২০১৩ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

৬. পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৯২ সালে সরকার পরমাণু কমিশন এর পাশের জায়গা বিশ্ববিদ্যালয় কে হস্তান্তর করে সাভারে কমিশনের নতুন জায়গা নির্ধারণ করে।কিন্তু পরমাণু কমিশন সাভারে কার্যক্রম শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা ছারে নি।

৭. পুলিশ ফাঁড়ি স্যার এফ রহমান হলের শিক্ষার্থীদের অমানবিক জীবন-যাপনের পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় গড়ে উঠেছে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি। অমর একুশে হলের পাশের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি। ২.৬৮ একর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে নিউমার্কেটে থানা।

৮. ব্রিটিশ কাউন্সিল সাত বছর পর পর চুক্তি নবায়ন করে ব্রিটিশ কাউন্সিল ফুলার রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া, ২৪.৩৯ একর জমি দখল করে তৈরি হয়েছে ওসমানী সৃতি উদ্যান ও ওসমানী মিলনায়তন। ৭.২৩ একর জমি দখল করে আনন্দবাজার এবং ৩.১৯ একর জমি দখল করে কর্মজীবী হাসপাতালের পূর্বদিক তৈরি হয়। সচিবালয়, শিক্ষা ভবন ও শিশু-পার্কের দখলেও আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি।

আইবিএ হোস্টেলের পাশে গ্রীন সুপার মার্কেট, কাঁটাবন মার্কেট ও বেশিরভাগ দোকান, গ্রীন রোডের ৫.৯৯ একর জায়গা সহ আরও অনেক জমি রাজনৈতিক নেতারা প্রভাব খাটিয়ে নাম মাত্র মূল্যে দখল করে ভোগ করে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে দেওয়া জি সি দেবের ধানমন্ডির সম্পত্তি দখল করে দরগা শরীফ গঠন করেছে এক পীর। [আজমেরী চিশতিয়া দরবার শরীফ]

আরও পড়ুন : সকল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা জাতীয়করণের দাবি

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গা দখল করে রয়েছে ৫ টি মাজার ও খানকাহ। এসব অবৈধ দখলের ওপরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তেমন কোনো তৎপরতা ছিল না কখনই।

আজিমপুরের কর্মচারী এলাকা, কাঁটাবন মার্কেট, লেদার টেকনোলজি, সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট, কক্সবাজারের এক একর ও অন্যান্য জায়গা মিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী এখন মোট সম্পত্তি ২৭৫.০৮৩ একর। তার মধ্যে ১৭৭ একরের খাজনা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। [পূর্বাচলে নতুন পাওয়া জমির বরাদ্দ এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি] তাহলে প্রশ্ন হলো বাকি সম্পত্তি গেল কোথায়? এর উত্তর দিতে পারেন নি সংশ্লিষ্ট কেউ ই। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ একর নিয়ে সকলের মনে রয়ে গেছে বিভ্রান্তি।

আসলেই ৬০০ একর বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে ছিল কি না থাকলেও তা কতদিন স্থায়ী ছিল, কোন আইনের ভিত্তিতে ছিল তার উত্তর না পেয়ে দিনশেষে হতাশই হতে হয়। কাজীর গরু যেরকম কেতাবে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ একর জমিও তেমনি ইতিহাসের পাতাতেই রয়ে যাবে। দখল দাররা দিন দিন দখল করছে ঢাকার প্রাণ কেন্দ্র এই বিদ্যাপীঠের সম্পত্তি। তার ওপর নগর রেলের উড়াল পথ শিক্ষার পরিবেশ কতটা ক্ষুণ্ণ করবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে এভাবে সময়ের সাথে আয়তন কমতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নিয়ে যে অচিরেই সঙ্কট সৃষ্টি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

jachai
nite
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
jachai

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড