• রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কোন পথে কুবির ভবিষ্যত : ডায়নামিক উপাচার্যের উপাখ্যান

  কুবি প্রতিনিধি

১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:৩২
ড. এমরান কবির চৌধুরী
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী

স্বপ্ন দেখা মহৎ গুণ। কিন্তু অবাস্তবতার ভিড়ে স্বপ্নের বুলি ছড়ানো নিশ্চয়ই সমৃদ্ধির কাজ নয়। সবাই স্বপ্নই দেখতে চান, তবে এই স্বপ্নকে  অবাস্তব ও স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে কেউই চান না। বরং বাস্তবায়নযোগ্য কাজকে স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাকে সস্তা স্বপ্ন বললে ভুল হবে না।

এমনি স্বপ্নের মধ্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বপ্নের ঘোরে নামকাওয়াস্তে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন নিয়েই চলেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী। স্বপ্নবাজ হওয়ার কারণে তার কাছে ঘেঁষতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক তাকে ‘ডাইনামিক উপাচার্য’ বলে অভিহিত করে থাকেন। 

জানা যায়, চলতি মাসের ৩১ জানুয়ারি উপাচার্য পদে নিয়োগ পাওয়ার এক বছর পূর্ণ করবেন ড. এমরান কবির চৌধুরী। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে সবসময়েই অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়ে ও গম্ভীর বক্তৃতা দিয়ে এবং রাজনৈতিক দৌরাত্মের অবস্থান নিয়ে সময় পার করেছেন তিনি।

একজন উপাচার্যের সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের কথা ‘উপাচার্যের নিয়োগ পত্রে’ উল্লেখ থাকলেও কাজ থাকুক বা না থাকুক সপ্তাহের দুই থেকে তিন দিন তিনি রাজধানী ঢাকাতেই অবস্থান করেন। এমনকি তিনি যোগদান করার পর পূর্বের রেজিস্ট্রারকে সরিয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু তাহেরকে রেজিস্ট্রারের চলতি দায়িত্বে নিয়ে আসেন। চলতি দায়িত্বের রেজিস্ট্রারও সপ্তাহের অনেক দিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান না করার কারণে প্রশাসনিক অনেক কাজই আটকে থাকে। 

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়েরর গঠিত আইন না মেনে অনেক কাজই নিজের মত করে চালিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় ডায়নামিক খ্যাত উপাচার্যের নামে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন অনুযায়ী যদিও সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠানের জন্য তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পরিষদের এই সিন্ডেকেট সভা কখনও চার মাস কখনও বা পাঁচ-ছয় মাস সময়ের ব্যবধানে করেছেন বিশ্ববিদ্যালযের উপাচার্য। 

তার এই অনিয়মতান্ত্রিকতায় সঙ্গি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাধিক শিক্ষক নেতা ও কর্মকর্তা। নাম সর্বস্ব পদ ও পদবীতে খুশি করে তিনি নিজের সকল ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের জন্য সঙ্গে রাখেন এসব শিক্ষকদের। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বা সিন্ডিকেট অনুমোদ না করিয়ে দু’তিনজন শিক্ষককে নিজের বানানো বিশেষ উপদেষ্টার পদে বসিয়েছেন। অথচ এমন পদের কথা উল্লেখ নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামেও।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাচার্য মহোদয়ের বিভিন্ন আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ১ বছরের মধ্যে না হওয়ায় বিষয়গুলো স্বপ্ন দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছেন তিনি। 

প্রতিষ্ঠার এক যুগের বেশি সময় অতিবাহিত করলেও নানা সমস্যা, সংকট এবং অপুর্ণতা যেন পিছু ছাড়ছে না বিশ্ববিদ্যালয়টির। প্রশাসনের স্বদিচ্ছা থাকলেই বাস্তবায়ন সম্ভব এমন সব দাবিও আন্দোলন করে আদায় করতে হয় বলে দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। 

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি নিয়ে উপাচার্যকে স্মারকলিপি প্রদান করার পর সে সব দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন উপাচার্য। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও আজও তার কোন সঠিক বাস্তবায়ন দেখেনি শিক্ষার্থীরা। এতে ক্ষোভ বিরাজ করছে শিক্ষার্থীদের মনে। শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে ছিল স্নাতোকোত্তরে ভর্তি ফি কমানো, সমাবর্তনের আয়োজন, শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল গঠন, বাস সংখ্যা বৃদ্ধি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন’র (বিআরটিসি) ফিটনেসবিহীন বাস পরিবর্তন, সমগ্র ক্যাম্পাস ওয়াইফাই আওতাভুক্ত করণ, হলের খাবারে ভর্তুকি প্রদানসহ বিভিন্ন দাবি।

এসব দাবিগুলো সর্বোচ্চ বিবেচনায় বিভিন্ন মেয়াদে বাস্তবায়নের আশ্বাসের পরও মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও উপাচার্যের প্রশাসন কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি বলে শিক্ষার্থীরা জানান। শিক্ষার্থীদের পরিবহন বাসের স্বল্পতা থাকলেও শুধুমাত্র চালকের অভাবে অনেক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাস অব্যাবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন সময়ে পত্র পত্রিকাতে একাধিক নিউজে হওয়ার পরেও এসববিষয়ে স্থায়ী কোন সমাধান দিতে ব্যার্থ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কাউন্সিলে স্নাতোকোত্তরে ভর্তি ফি কমানো নিয়ে গুরুত্বের ভিত্তিতে আলোচনার আশ্বাস দিলেও আদোতে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। 

অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুষদসমূহের সকল ভবনই বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। ভবনগুলোর প্রক্ষালণ কক্ষ (টয়লেট), ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরের সড়ক গুলো ধুলোর সাগরে পরিণত। রয়েছে প্রকটভাবে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটও।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য ৬৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প ২০১৪-১৫ অর্থবছরে শুরু হয়ে বর্তমান চলমান থাকলেও তা চলছে ধীরগতিতে। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের জুন মাসে।

এছাড়া একন ক সভায় নতুন করে ১ হাজার ৬৫০ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকার মেঘা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছরের অক্টোবর মাসে। প্রকল্পটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের জীমনেসিয়াম, উন্নত মানের গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ, বিউটিপার্লার, অধ্যাধুনিক ক্লাস রুম, অডিটোরিয়ারমের স্বপ্ন দেখালেও তা শুধুমাত্র প্রচার প্রাচার প্রচারনাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। গত বছরের নভেম্বর থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তার কোন সম্ভাবনাই দেখছে না শিক্ষার্থীরা। এ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও ক্যাম্পাসকে দুই অংশে বিভক্ত করা হচ্ছে বলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনও করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব বিষয়ে কথা বললে দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং বিশিষ্ট জনেরা বিষ্ময় প্রকাশ করেন। 

এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ বলেন, ‘সীমাবদ্ধ সম্পদ দিয়েই শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে আরও আন্তরিক হতে হবে এবং জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কিছুই পূরণ করা সম্ভব নয়, তাই বলে কি স্বাভাবিক কার্যক্রম থেমে থাকবে? এমন অবহেলিত মনোভাবের পরিবর্তন হওয়া দরকার।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে বিভিন্ন সময় সংবাদকর্মীরা যোগাযোগ করলে তিনি কোন বক্তব্য প্রদান না করে তার নিয়োগকৃত গণমাধ্যম উপাদেষ্টার সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। এ প্রতিবেদনের জন্যও তার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাকে ফোন দিয়ে পাওয়া যায়নি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের বলেন, ‘উপাচার্য মহোদয়ের আদেশে বিষয়গুলো আমরা গুরুত্বের সাথে দেখতেছি। ইতোমধ্যে স্নাতোকোত্তরে ভর্তি ফি কমানোর জন্য কমিটি করে দেওয়া হয়েছে, সমাবর্তনের জন্য ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আশা করি ডিসেম্বরে আমরা সমাবর্তন করতে পারবো, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাস্তার টেন্ডার খুব শিগগিরই হবে এবং বাস চালক নিয়োগের কার্যক্রমও চলছে। খুব দ্রুতই আমরা সব সমস্যার সমাধান করতে পারবো।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ. আ. ম. স. আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘একজন উপাচার্যের সার্বক্ষণিকই ক্যাম্পাসে থাকা উচিত, আইন অনুযায়ীই নিয়মিত সিন্ডিকেটে সভা করা উচিত। কিন্তু তিনি আমার সাবেক সহকর্মী ছিলেন, তাই তার বিষয়ে মন্তব্য করাটা আমার জন্য বিব্রতকর।’

আপনার ক্যাম্পাসের নানা ঘটনা, আয়োজন/ অসন্তোষ সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড