• রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৯, ৮ বৈশাখ ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

বহিঃস্থ শিক্ষকের বিলম্ব, ক্লাসরুম ও শিক্ষক সংকটকে দায়ী করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

জাককানইবির চারুকলা বিভাগে ৮ শিক্ষক দিয়ে চলছে ৮ ব্যাচ

  সরকার আব্দুল্লাহ তুহিন ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৩৫

জাককানইবি
ছবি : সংগৃহীত

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) বিভিন্ন বিভাগের সেশনজট নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের ২য় পর্বে আজ থাকছে চারুকলা বিভাগ...

সেশনজটের যাঁতাকলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ফলশ্রুতিতে জীবন থেকে চলে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময় আর পিছিয়ে পড়ছে বাস্তবতার দৌড়ে। এ বছরের নতুন ব্যাচ বাদে বিভাগের বর্তমান ব্যাচের সংখ্যা মোট- ৮টি। যা বিভাগের বর্তমান মোট শিক্ষক সমষ্টির সমান।

দৈনিক অধিকার এর অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভাগের প্রথম ব্যাচের (২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষ) অনার্স ও মাস্টার্স (২ বছর মেয়াদি) শেষ করতে সময় লেগেছে প্রায় ৯ বছর। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মাস্টার্সের সর্বশেষ পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে।

এছাড়া ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের চলছে মাস্টার্স এর ক্লাস। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের অনার্স পরীক্ষা গত বছরের জুনে সম্পন্ন হলেও এখনো ফল প্রকাশ করা হয়নি। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের চলছে ৪র্থ বর্ষ ১ম সেমিষ্টার, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ৩য় বর্ষ ২য় সেমিস্টার। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে চলছে ৩য় বর্ষ ১ম সেমিস্টারের পরীক্ষা। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার এবং সর্বশেষ ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে চলছে ১ম বর্ষের ২য় সেমিস্টারের ক্লাস।

ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের নবীন বরণের তারিখ। বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষিত আগামী ২২ জানুয়ারি নতুন ব্যাচের ক্লাস শুরুর মধ্য দিয়ে বিভাগের ব্যাচ সংখ্যা দাঁড়াবে- ৯টিতে।

বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে সেশনজটের কারণ হিসেবে ক্লাসরুম সংকট, শিক্ষক সংকট, বহিঃস্থ শিক্ষকের পরীক্ষার খাতা পুনঃমূল্যায়নে বিলম্বিত করার কারণসহ উঠে এসেছে বেশ কিছু বিষয়। এছাড়া পরীক্ষার ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতাকে সেশনজটের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করছেন তারা।

সেমিস্টার পদ্ধতি না রেখে বাৎসরিক পদ্ধতি (ইয়ার সিস্টেম) চালু করলে এ সমস্যা অনেকটা লাঘব হবে বলে মনে করেন স্নাতকোত্তর সম্পন্ন বিভাগের প্রথম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী। তিনি আরও বলেন, ৬ মাসের সেমিস্টার দেড় বছরে সম্পন্ন করলে শিক্ষার্থীদের অনেকে ক্লাসে মানবিক কারণে উপস্থিত না হলেই তাদের প্রতি স্যাররা উপস্থিতির হার নিয়ে নির্মমতা দেখান।

বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীকে সেশনজট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, আব্বু ফোনে আজও বলে তোমার জুনিয়র পোলাপানের পড়াশুনা শেষ তুমি আর কত ৬মাস-৬মাস করবা।

২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, এর আগে বেশ কয়েকবার সেশনজট নিরসনে মানববন্ধন ও জোর আন্দোলন চললেও পরিত্রাণ মিলেনি। সর্বশেষ ২০১৭ সালে আমাদের মানববন্ধনে স্যাররা লিখিত হলফনামায় বিভাগের সকল সেশনজট ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ করবেন এবং না পারলে আমাদের ভরণপোষণসহ যাবতীয় পেশাগত দায়ভার নেবেন বলে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। ২০১৯ চলছে, আদৌ শেষ করতে পারবো কিনা তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।

অনুযোগের স্বরে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের ব্যাচের প্রায় সব বিভাগে র‍্যাগ ডে করছে আর আমরা ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে এসেও সেই তৃতীয় বর্ষেই পড়ছি। আমাদের জীবনের মূল্যবান সময় তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্যাররা শুধু বাইরের শিক্ষকের খাতা দেরীর অযুহাত দেন।

মানসিক হতাশা নিয়ে বিভাগের সিনিয়র এক শিক্ষার্থী জানান, চারুকলা একটি ব্যয়বহুল সাবজেক্ট। সবার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা এক নয়, অনেকেই এর ব্যয়ভার চালিয়ে যেতে হিমশিম খায়। যেসময়ে সমবয়সীরা পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের হাল ধরে, তখনো আমরা পরিবার থেকে হাত পেতে পড়াশোনার খরচ নিচ্ছি। পরিবারের বোঝা মনে করে এটা একটা মানসিক চাপ তৈরি করে। পড়াশোনাসহ ব্যক্তিগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভর্তি হওয়ার সময় যেটুকু আত্মবিশ্বাস নিয়ে এসেছিলাম, দিনদিন সেশনজটের কারণে সব হতাশায় পরিণত হচ্ছে।

বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক নগরবাসী বর্মন (পার্থ) বলেন, আমাদের মূল সমস্যা ক্লাসরুম ও শিক্ষক সংকট। মাত্র ৮ জন শিক্ষক নিয়ে আমাদের ক্লাস-পরীক্ষা নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ৪টি ক্লাসরুম ও ২টি ল্যাব দিয়ে বিভাগে চলমান ৩টি স্ট্রিমের (ড্রইং এন্ড পেইন্টিং, গ্রাফিক ডিজাইন ও প্রিন্ট মেকিং) কার্যক্রম পরিচালনা করা ইচ্ছে থাকলে সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে বিভাগ থেকে রেজিস্ট্রার দপ্তরে বারংবার আবেদন জানানো হলেও দৃশ্যমান কোন ফল এখনো পাচ্ছি না।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ চলছে, অতিদ্রুত আমরা নতুন ক্লাসরুম পেয়ে যাবো। শিক্ষক নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানুগ্রাম অনুযায়ী বিভাগের চাহিদা মতো আমরা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বরাবর আবেদন জানিয়েছি, এখনো আমরা অনুমোদন পাইনি। অনুমোদন পেলেই এ সমস্যার সমাধান হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু-নীলদলের সভাপতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দে (সিধু) বলেন, দ্বিতীয়বার মূল্যায়নের জন্য বহিঃস্থ শিক্ষকের কাছে না পাঠিয়ে বিভাগের শিক্ষকদের মাধ্যমে খাতা পুনর্মূল্যায়ন করালে ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেত। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন পদ্ধতি হওয়া দরকার যেন শিক্ষকরা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে সফট ফাইল দেওয়ার মাধ্যমে খাতা মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ডিজিটালাইজড নিয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর এমন হওয়া উচিৎ যেন প্রত্যেকটা শিক্ষার্থী তার পাসওয়ার্ড দিয়ে নিজস্ব আইডিতে লগ ইন করে নিজের রেজাল্ট দেখতে পারবে এবং পড়াশুনা শেষে ইচ্ছেনুয়ায়ী সার্টিফিকেটও প্রিন্ট করতে পারবে। এছাড়া চারুকলাকে আলাদা অনুষদ করার জোর দাবি জানান তিনি।

বিভাগীয় প্রধান আরও বলেন, শিক্ষকদের আন্তরিকতা রয়েছে, পর্যায়ক্রমে আমরা এ বছরের মধ্যে সকল জটের ব্যাচ সমূহ শেষ করতে পারবো প্রত্যাশা করছি। বাইরে খাতা যায় বিধায় আমরা এরকম পিছিয়ে আছি। সময়মত খাতা আসে না আবার খাতা আসলে নম্বর আসে না, খাতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আসা না আসার দায়ভার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের বিভাগের নয়।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. নির্মল চন্দ্র সাহার সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে দুর্ব্যবহার করেন। এছাড়া শিক্ষানবীশ সাংবাদিকতাকে অবজ্ঞা করে তথ্য দেওয়া ‘প্রশাসনের নিষেধ’ এর কথা জানান। এ বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক উত্তর দিতে পারতেন মন্তব্য করে রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, গোপনীয় বিষয়াদি বাদে প্রকাশের যোগ্য তথ্য বলায় প্রশাসনের কোন অসুবিধা নেই।

উল্লেখ্য, ৮ জন শিক্ষকের সকলেই পুরুষ! বিভাগের শিক্ষার্থীদের দাবী- পরবর্তী শিক্ষক হিসেবে যেন অন্তত একজন ম্যাডাম তারা পায়।

আপনার ক্যাম্পাসের নানা ঘটনা, আয়োজন/ অসন্তোষ সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড