• শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কুবির দুই বঙ্গবন্ধু পরিষদে আদর্শের চর্চায় দ্বন্দ্ব কেন?

  কুবি প্রতিনিধি

০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬:২২
কুবির দুই বঙ্গবন্ধু পরিষদে আদর্শের চর্চায় দ্বন্দ্ব কেন?
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) (ফাইল ছবি)

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বৃহস্পতিবার (১ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল শিক্ষক সমিতির ২০২৩ সালের কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচন। তবে শিক্ষকদের একটি পক্ষের কেন্দ্র দখল ও ভোট প্রদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা দেয় কমিশন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের মধ্যে দুটি পক্ষ রয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদেরকে বঙ্গবন্ধু পরিষদ বলে দাবি করে।

শিক্ষকদের এবারের নির্বাচনেও বঙ্গবন্ধু পরিষদের একটি অংশ (সাইদুল-মুর্শেদ সমর্থিত) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও আরেক বঙ্গবন্ধু পরিষদ (ওমর-জাহিদ সমর্থিত) শুরু থেকেই নির্বাচনের বিরোধিতা করে এসেছিল। ১ ডিসেম্বর একাদশ শিক্ষক সমিতির নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র দখল করে নির্বাচন কমিশনকে ভোটগ্রহণ করতে দেয়নি ওমর-জাহিদরা। ভোটগ্রহণের সময় শেষ হওয়ার পর নির্বাচন স্থগিত করে কমিশন। এরপর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছে ওমর-জাহিদ পরিষদ সমর্থিত শিক্ষকরা। তবে সাইদুল-মুর্শেদ পরিষদ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন বানচালকারীদের শাস্তির দাবি জানায়।

ঘটনার দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের পরিসংখ্যান বিভাগের একটি ক্লাস রুমে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নেয় কমিশন। এসময় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাইদুল-মুর্শেদ পরিষদের শিক্ষকেরা ভোট দিতে লাইনে দাঁড়ালেও ওমর-জাহিদ সমর্থিত বঙ্গবন্ধু পরিষদের শিক্ষকেরা এতে বাধা দেয়।

তাদের দাবি, নির্বাচন শিক্ষক লাউঞ্জে না হয়ে ক্লাসরুমে হতে পারে না এবং গঠনতন্ত্র মোতাবেক নির্বাচন হচ্ছে না। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হলে কার্যক্রম স্থগিত রাখে কমিশন।

যদিও সে সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. জি এম মনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, শিক্ষক লাউঞ্জে নির্বাচনের অনুমতি তারা চেয়েছিলেন। প্রশাসন তাদেরকে অনুমতি না দেওয়ায় এবং বৃহস্পতিবার সশরীরে ক্লাস বন্ধ থাকায় তারা বিজ্ঞান অনুষদের শ্রেণিকক্ষে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।

ঘটনার পরিক্রমায় এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখন বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী পক্ষের শিক্ষকদের মধ্যেই এত দলাদলি এবং আন্তঃ কোন্দল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ? আবার বঙ্গবন্ধুর আদর্শ চর্চায় বঙ্গবন্ধু পরিষদের দুটি অংশ কোন স্বার্থে? এছাড়া সম্প্রতি সাইদুল-মুর্শেদ পরিষদ থেকে কয়েকজন শিক্ষক পক্ষ পরিবর্তন করে ওমর-জাহিদ পরিষদে যোগদান করেন। তারাই প্রকাশ্যে সাইদুল-মুর্শেদ পরিষদকে 'বিএনপি জামাতের স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে' বলে অভিযোগ করার পর বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কারা মৌলিক আদর্শের চর্চা করছেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ চর্চার নামে ব্যক্তিস্বার্থই কি মৌলিক লক্ষ!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদের বেশিরভাগই ওমর-জাহিদ পরিষদের শিক্ষকদের দখলে। এমনকি সাইদুল-মুর্শেদ পরিষদের যে কয়েকজন শিক্ষক সম্প্রতি পক্ষ পরিবর্তন করেছেন তারাও বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে রয়েছেন। আবার যারা এখনও পদ-পদবী পায়নি, তারা এবিষয়ে জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

সঙ্গত কারণেই এখন প্রশ্ন উঠছে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মৌলিক কাজ কী এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক কী কারণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে? আদতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে আগেকার সাদা দল এবং নীল দলের দ্বন্দ্বকে ছাপিয়ে বর্তমানে আওয়ামীপন্থি নীল দলের শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়ানোর কারণ কী? তবে এখানে আদর্শ চর্চাই মুখ্য উদ্দেশ্য নাকি আদর্শকে পুঁজি করে স্বার্থের দ্বন্দ্বে এতটা রেষারেষি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারের সাম্প্রতিক চাহিদা অনুযায়ী ইনোভেশন, বিশেষায়িত গবেষণা প্রকাশনা ও কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ। সে অনুযায়ীই এখন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং বাণিজ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে তুলনামূলক অনেক বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে বা বিনিয়োগের তাগিদ সৃষ্টি হচ্ছে।

কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই চিত্র কতটুকু বহাল আছে কিংবা সম্মানিত শিক্ষকদের অতি রাজনীতির প্রভাবে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে কিনা সেটিই এখন মূল আলোচনার বিষয়বস্তু।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে তুলনামূলক নিষ্ক্রিয় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিষয়টি সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। শিক্ষকদের মধ্যে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন অভিযোগ তুলেন। তাদের মতে, আদতেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ চর্চার কথা বলে শিক্ষকদের বড় একটি অংশ এখন স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত।

বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাইদুল-মুর্শেদ অংশের সভাপতি সাইদুল আল-আমীন বলেন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ একটি আদর্শিক সংগঠন। আমরা মনে করি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ চর্চায় কারও অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। বরং যারা অনুমোদনের নামে নৈতিকতা বিরোধী কাজ করছেন আমি মনে করি তাদের সে বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত।

কিন্তু যারা পক্ষ ত্যাগ করেছেন তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিলে দেখবেন, প্রতিটি প্রশাসনে তারা বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানেও তারা ক্ষমতায় থাকতে পক্ষ ত্যাগ করেছেন।

ওমর-জাহিদ অংশের সভাপতি কাজী ওমর সিদ্দিকী বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় অনুমোদন রয়েছে এবং সেটিতে আমরা কাজ করছি। অপর একটি পক্ষ নিজেদেরকে বঙ্গবন্ধু পরিষদ দাবি করলেও তাদের কোনো অনুমোদন নেই। এমনকি আদর্শিক এ সংগঠনের নাম বিক্রি করলেও তারা বিএনপি জামাতের আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করেন৷

দুই বঙ্গবন্ধু পরিষদ নিয়ে অবস্থান জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এ বি এম ফারুক জানান, আমাদের অবস্থান খুবই পরিষ্কার। অসাম্প্রদায়িক নীতির বাইরে আমরা যাব না। যদি কেউ সাম্প্রদায়িকতার সাথে জড়িত থাকেন তাদের স্থান আমাদের এখানে নেই।

বঙ্গবন্ধু পরিষদ যা কিছুই করবে সেটি অবশ্যই কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করতে হবে। তবে আমি বলব যদি কোন সমস্যা থাকে সমন্বিত পরামর্শের ভিত্তিতে সেটির বিষয়ে তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এমনকি যদি প্রয়োজন হয় যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য কেন্দ্র সেখানে হস্তক্ষেপ করবে।

কিন্তু পক্ষ পরিবর্তন এবং সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের উচিত হবে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। আমাদের কাছে লিখিত কোন অভিযোগ আসলে আমার পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

এ দিকে শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বিঘ্নিত করছে কি-না জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আব্দুল মঈন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং সামনে আনতে যে-ধরনের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ প্রয়োজন এমন পরিবেশে সেটি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক লক্ষ অর্জনেও এমন পরিস্থিতি অন্তরায়। একইসাথে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আদর্শ চর্চার বিষয়ে তিনি বলেন, জাতির পিতার সংগ্রামী জীবন ছিল অন্যায় এবং অনৈতিকতার বিরুদ্ধে। এমনকি তার জীবন উৎসর্গ হয়েছে দুর্নীতি এবং সুশাসনের পক্ষে থাকার কারণে। আমি আশা করবো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আদর্শ চর্চা হবে এবং শিক্ষকেরা এ বিষয়ে নিজেদের আরও পরিপক্বতার পরিচয় দিবেন।

আপনার ক্যাম্পাসের নানা ঘটনা, আয়োজন/ অসন্তোষ সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড