• বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কে মানুষ আর কে অমানুষ?

  রহমান মৃধা

০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৬:০৮
কে মানুষ আর কে অমানুষ?
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

ক্ষেতের লাউ, লালশাক, পুঁইশাক, একটু কচি মিষ্টিকুমড়া এসবের সাথে চাল ডাল দিয়ে অল্প করে একটু খিচুড়ি রান্না করেছি। বাসায় আমি একা, দুপুরে খেতে বসেছি। হঠাৎ ফোন বাজতে শুরু করেছে, কয়েকবার রিং হচ্ছে, উঠে দেখলাম বাংলাদেশ থেকে বহু বছর পর ফোন দিয়েছে সম্পর্কে আমার দুই চাচা। তারা আমার ছোটবেলার খেলার সাথীও বটে।

চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় কোন কথাবার্তা বা দেখা সাক্ষাৎ নেই, তারপরও তাদেরকে আমি চিনে ফেলেছি। বয়স হয়েছে আমার মত দাঁড়ি মোস পেকেছে তবে টেলিফোনে শরীর স্বাস্থ্য দেখে বেশ ভালো মনে হলো। স্বাভাবিকভাবেই সেই ছোটবেলার স্মৃতিচারণ শুরু হলো। আমি জিঙ্গেস করলাম এত বছর পর হঠাৎ ফোন করার কারণ? উত্তরে তারা বললো যে তারা আমাকে ফেসবুকে দেখে, আমার লিখা পড়ে তবে ফোন করতে ইচ্ছে হলেও সাহস করে ফোন করা হয় না ইত্যাদি।

আমি বললাম তাহলে আজ কেন সাহস হলো? তারা দুজনই বললো আমার সদ্য লিখা কবিতা ‘বন্ধু’ এবং ফেসবুকের একটি ভিডিও ‘কে নয় কি শিখি’ তাদেরকে সাহস যুগিয়েছে। শুনে আপ্লুত হলাম আবার মনের মধ্যে খারাপ অনুভব হলো এই ভেবে তাদের মনে দ্বিধা আমি থাকি বিদেশে হয়ত তাদের সঙ্গে কথা বলব না বা চিনব না ইত্যাদি। তার মানে আমার কবিতা এবং ভিডিওতে যে কথাগুলো ফুটে উঠেছে সেটাই কারণ, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ না করা। এ কথা সে কথা শেষে জিঙ্গেস করলাম তাদের ছেলেমেয়েদের কথা। একজন বললো কেউ বিলেতে থাকে, কেউ দেশে প্রতিষ্ঠিত।

অন্যজন বললো ‘ চাচারে আমি মিডিলিস্টে চাকরি করেছি, বাড়িতে টাকা পয়সা দিয়েছি কিন্তু ছেলেরা অমানুষ হয়েছে, কেউ ভালো কিছু করতে পারেনি’। আমি কথাটি শুনে চুপ করে থাকতে পারলাম না, সঙ্গে সঙ্গে জিঙ্গেস করলাম অমানুষ মানে কি বুঝাতে চাচ্ছো? তারা কি মদগাজা খেয়ে, দুর্নীতি করে জীবন বিসর্জন করছে? চাচা উত্তরে বললো না না, তা নয়, তারা কামলা করে খায়, ইচ্ছে ছিল লেখাপড়া শিখে এসির নিচে বসে টাকা পয়সা রোজগার করবে, গাড়িবাড়ি হবে, তার কিছুই হলো না!

আমি তেমন করে ভাবতে পারিনি বা ভাবার চেষ্টা করিনি, হঠাৎ কেন যেন বলে ফেললাম, চাচা এসির নিচে বসে যদি দুর্নীতি করে, দেশের বারোটা বাজিয়ে টাকা কামাই করে বড় লোক হতো তাহলে কি তারা মানুষ হতো? চাচা বললো সেটা না তবে আমার মত সারা জীবন আমলাগীরি করবে সেটা কখনো আসা করিনি। চাচার কথায় মনে হলো সমাজে ছোটখাটো কাজ যারা করে তারা অমানুষ, তাদের সমাজে কোন জায়গা নেই, কোন ভালো পরিচয় নেই। তারা সমাজের হেও-প্রতিপন্ন দিনমজুর যাদের কোন সাধারণ পরিচয় নেই। আছে শুধু যেমন কুলি, মুটে, রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, ঝাড়ুদার ইত্যাদি তাই এদেরকে অমানুষ বলা হয়। আমি চাচাকে বললাম যাই বল না কেন চাচা, তোমার ছেলেরা কষ্ট করে জীবনযাপন করছে, দুর্নীতি বা অনীতি করে নয়, এটা শুনে আমার কাছে কিন্তু ভালো লাগছে।

তুমিও ওদের জন্য দোয়া করো এবং তাদেরকে নিয়ে গর্ব করবে। পৃথিবীতে এখনও এদের সংখ্যা বেশি এবং এরাই প্রকৃতপক্ষে মানুষ হিসেবে সভ্যতাকে ধরে রেখেছে। কারণ শিক্ষিত মানুষগুলো দিন দিন অমানুষে পরিণত হতে চলেছে, যদিও তুমি অর্থনৈতিক অভাবের কাছে পরাজিত হয়েছো তাই তোমার মনে দাগ লেগেছে দারিদ্রতার, যা তোমাকে তোমার মনুষ্যত্বকে দুর্বল করে ফেলেছে। আসলে তোমার ছেলেরা অমানুষ হয়নি, তারা ঠিকই মানুষ হয়েছে। হয়ত অর্থে ধনী হতে পারেনি।

চাচা এতক্ষণে কথা বললেও হঠাৎ মিনিট খানেক চুপ হয়ে আমার কথা শুনতে শুনতে একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে শুধু বললো ‘চাচা তুমি আমাদের জন্য তাহলে দোয়া কর, আল্লাহ রহমানুর রাহীম’। আমাদের কথা শেষ হলো বটে তবে আমার ভাবনায় থেকে গেল কে প্রকৃতপক্ষে মানুষ আর কে অমানুষ! ঘটনাটি ঘটেছে গতমাসের ৭ই সেপ্টেম্বর আমি শুধু ভাবছি তা নয়, লিখে শেয়ার করলাম সবার সঙ্গে আমার শেয়ার ভ্যালু থেকে।

লেখক : রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।

[email protected]

আপনার ক্যাম্পাসের নানা ঘটনা, আয়োজন/ অসন্তোষ সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড