• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ছাত্র-রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না

  সম্পাদকীয়

২১ অক্টোবর ২০১৯, ২২:১০

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে যে শোষণবিরোধী প্রতিবাদমুখী ছাত্রসমাজের চেহারা আমরা উন্মোচিত হতে দেখেছি, সময়ের পরিক্রমায় তাকে আরও পরিণত ও শক্তিশালী হয়ে উঠতেও দেখেছি। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন যে সংগ্রামী চেতনার বীজ বপন করেছিল এদেশের ছাত্রসমাজের হৃদয়-অভ্যন্তরে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তা শক্তিদাত্রী অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

বাষট্টিতে 'শরীফ কমিশন' এর বিপক্ষে শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম, তৎপরবর্তীকালে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন- সকল ক্ষেত্রেই এদেশের ছাত্ররা সর্বাগ্রে এগিয়ে এসেছে, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে একের পর এক সফল আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করেছে।

দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলনই কেবল নয়, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানান ইস্যুতেও ন্যায়বোধের জায়গা থেকে ছাত্রসমাজের সচেতন শক্তিশালী অবস্থান আমাদের জানান দিয়েছে যে যতক্ষণ এ ছাত্ররা দেশের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে, ততক্ষণ দেশের গন্তব্য সঠিক পথে রয়েছে।

গণজাগরণমঞ্চের আন্দোলন থেকে শুরু করে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, বিভিন্ন সময়ে খুন-গুম-ধর্ষণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন- এ সবই দেশের ছাত্রসমাজের সফল সংগ্রামের ইতিহাসের প্রামাণ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইতিহাসের এসব উপাদান বিশ্লেষণের পর সুসংগঠিত ছাত্র-রাজনীতি বা ছাত্রসমন্বিত সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

তবে বিগত কয়েক দশকে দেশের ছাত্র-রাজনীতির যে পথ-পরিক্রমা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে করে এর প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া স্বাভাবিক। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দমনপীড়ন, সন্ত্রাস, দলীয় লেজুড়বৃত্তি ইত্যাদি নানা অভিযোগ এখন রাজৈনতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে। ছাত্র সংগঠনগুলোর যেখানে সাধারণ ছাত্রদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে কথা বলার, রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহের বিপক্ষে অবস্থান করার কথা, সেখানে উল্টো শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি ও আন্দোলনে বাধা প্রদান এবং ভিন্ন মতাদর্শের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন-নীতির কারণে দেশের সচেতন নাগরিকসমাজের দৃষ্টিতে বর্তমান ছাত্র-রাজনীতির অসাড়তাই প্রতীয়মান হচ্ছে। যে ছাত্ররা গণজাগরণমঞ্চ তৈরি করেছিল, সে ছাত্রদেরই একাংশ কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলা করেছে; ছাত্রদের একাংশ যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, রাজনৈতিক আশ্রয়পুষ্ট আরেক অংশ তখন সে আন্দোলনকে প্রতিহত করতে আক্রমণ চালিয়েছে।

এমনই এক বাস্তবতায় সর্বশেষ বুয়েটে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় মেধাবী ছাত্র আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে গেছে। দেশের স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডের পর সকল মহলেই একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে যে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সর্বাপেক্ষা মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে, সেখানে যদি এ রকম পরিস্থিতি হয়, তাহলে অন্যান্য জায়গায় পরিস্থিতি আরও কতটা ভয়ঙ্কর! নেতিবাচক ছাত্র-রাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন রেহাই পায় না, তখন ছাত্র-রাজনীতির বাস্তব প্রয়োজন নিয়েও সংশয় তৈরি হয়।

এ সকল প্রেক্ষাপটে সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের জোড়ালো দাবি উত্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার নিরীখে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রদের অনবদ্য ভূমিকাকে ভুলে যাবারও কোনো সুযোগ নেই। তাই ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের পরিবর্তে একে পরিশুদ্ধকরণের ব্যবস্থা কীভাবে গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে তৎপর হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড