• সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রসমূহের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন

  সম্পাদকীয়

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৩:০৫
সম্পাদকীয়

বিগত কয়েক দশকে পৃথিবীতে মানববসতির ক্ষেত্রে হুমকি হিসেবে সবচাইতে আলোচিত বিষয়টি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। সঙ্গত কারণেই সর্বশেষ কয়েকটি জাতিসংঘ অধিবেশনে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে এ বিষয়টি। 

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেল (আইপিসিসি) কয়েক বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানববসতির ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং ভবিষ্যতের পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য আশঙ্কা নিয়ে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করে আসছে। 

ইন্টারগভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) এবারের জাতিসংঘ অধিবেশন চলাকালে চলতি বছরে পরিচালিত তাদের তৃতীয় গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে যে সকল অনুমান তুলে ধরা হয়েছে, তা রীতিমত ভয়ঙ্কর। তাদের মতে, অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও বরফ গলার হার বাড়ছে৷ সাথে সাথে বরফের আচ্ছাদন বিলীন হবার দরুণ বেড়ে চলেছে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা।

গবেষণা বলছে, ২০০৭ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে তার আগের ১০ বছরের তুলনায় অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলেছে প্রায় তিনগুণ। অ্যান্ডিজ, মধ্য ইউরোপ এবং উত্তর এশিয়ায় যেসব হিমবাহ রয়েছে, সেগুলোর বরফ ২১০০ সাল নাগাদ ৮০ শতাংশ গলে যাবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

বরফ গলা এ পানি গিয়ে পতিত হচ্ছে সাগরে৷ ফলে এভাবে চলতে থাকলে আগামী দশকগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আইপিসিসির নতুন এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ২১০০ সাল নাগাদ সাগর-পৃষ্ঠের উচ্চতা ১.১ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এ ধারণা বাস্তবে রূপ নিলে পৃথিবীর নিচু অঞ্চলগুলোতে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধির পরিণতি হবে মারাত্মক। পৃথিবীর এসব নিচু উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত অন্তত ৭০ কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। 

এছাড়া সমুদ্রের ওপর এ ধরনের চাপ পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচাইতে আশঙ্কাজনক সম্ভাবনার মধ্যে বাংলাদেশের মতো দ্বীপ এলাকাগুলো যেমন রয়েছে, এ সকল ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে বাদ যাবে না নিউইয়র্ক বা সাংহাইয়ের মত বিত্তশালী নগরগুলোও।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর ক্ষতিকর প্রভাব কতটা ভয়ানক হবে বা কতটা তা কমিয়ে আনা যাবে, তার নিয়ন্ত্রণ এখন পর্যন্ত আমাদের হাতেই রয়েছে৷ প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এখনকার তুলনায় কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমপক্ষে ৪৫% কমাতে হবে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের হার শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে জ্বালানি, শিল্প, ভবন, পরিবহণ ও শহরগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। এর আগে অপর একটি প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শও দিয়েছে আইপিসিসি। 

বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং খাদ্যাভ্যাসের ধরনের কারণে নজিরবিহীন হারে ভূমি ও পানির ব্যবহার হচ্ছে। আইপিসিসির মতে, আগের চেয়ে খুব পরিমিত ও দক্ষভাবে ভূমি ব্যবহার করতে হবে। ফেরাতে হবে পশু-পাখির ভূমি। মাটির ক্ষয় ও মরুকরণ ঠেকাতে বড় ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে৷ জলবায়ু ব্যবস্থায় মাটির ভূমিকাকে প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়া হয়। অথচ সমুদ্রের পর মাটি হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তর কার্বন মজুদের স্থান। গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণ করে এবং তা মাটিতে ছেড়ে দেয়। তবে বন উজারিকরণ ও কম কৃষি চর্চার কারণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে মাটির ক্ষয় হয়ে কার্বনডাইঅক্সাইড আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যায়। 

তাই নিয়ন্ত্রিত পশুচারণ ও বৃক্ষ রোপণসহ ভালোভাবে জমি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন৷ এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন দারিদ্র্য কমানো যায়, সেই সাথে জোরালো করা যায় খাদ্য নিরাপত্তাও৷ পাশাপাশি শাক-সবজি জাতীয় খাবারকে প্রাধান্য দিয়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা হলে ২০৫০ সাল নাগাদ বেশ কয়েক লাখ বর্গ কিলোমিটার ভূমি মুক্ত করা সম্ভব হবে। এতে বছরে ০.৭-৮.০ গিগাটন কার্বনডাইঅক্সাইড কমানো যাবে।

সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের এ বিষয়টি যে মানবসভ্যতার জন্য সবচাইতে বড় হুমকি এবং সে হুমকি যে অত্যন্ত দ্রতবেগে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে— এ ব্যাপারে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে৷ জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে যে সকল শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো বহুলাংশে দায়ী, তাদের এ সমস্যাটি মেনে নিতে হবে৷ যে সকল রাষ্ট্র অত্যধিক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে৷ ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার দাবি নিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন৷ জীবাশ্ম-ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি থেকে মানুষকে রক্ষা করার দাবিতে সুইডেনের কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গের শুরু করা এই বিক্ষোভে সামিল হওয়ার জন্য ১১ লক্ষ শিশু গত ২০ সেপ্টেম্বর তাদের ক্লাস বর্জন করে। 

বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে৷ এ ধরনের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আরও জোরালো করতে হবে৷ পৃথিবীর ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রসমূহের নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারলে এবং জলবায়ুর ক্ষতিকর পরিবর্তন বিষয়ে বিশ্বব্যাপী মানুষকে সচেতন করে তোলা সম্ভব হলে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে মানবসভ্যতা রক্ষা পেতে পারে৷ এর অন্য কোনো বিকল্প নেই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড