• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

মানবিকতা নয়, এখন প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের

  সম্পাদকীয়

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৩৪
রোহিঙ্গা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গত দুবছরে সবচাইতে আলোচিত এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সাথে সর্বাপেক্ষা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে যে বিষয়টি, সেটি হলো শরণার্থী হিসেবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান এবং তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন। 

শুরুর দিকে মানবিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেশের অধিকাংশ মানুষ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও ধীরে ধীরে এ বিষয়টি এক অর্থে 'মরার উপর খাড়ার ঘা' হয়ে দেখা দিয়েছে। 

একদিকে ব্যাপক হারে বৃক্ষ উজাড় ও পাহাড়ের ক্ষয়ক্ষতির ফলে পরিবেশের নিদারুণ ক্ষতি, অপরদিকে লক্ষ লক্ষ অতিরিক্ত মানুষের বোঝা, পাশাপাশি থেমে থেমে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-বিশৃঙ্খলা, মাদকের উপদ্রব বৃদ্ধির আশঙ্কা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে রোহিঙ্গাদের এদেশে অবস্থান এক ধরনের আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টির দুয়ার উন্মুক্ত করছে বলে অনেকেরই ধারণা।

গত দুবছরে রোহিঙ্গা ইস্যুটি দুটো দেশের সমস্যার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি-কূটরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপক হিসেবে ধরা দিয়েছে৷ ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাবার উদ্যোগ নেয়া হলেও দুই বার সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নিজ দেশে ফিরে যাওয়া নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যেকার অনীহা যখন দেশের সচেতন নাগরিকমহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, ঠিক এমনই এক সময়ে গত ২৫ আগস্ট সারা দেশকে হতবাক করে দিয়ে তারা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন এক শরণার্থী সমাবেশ করে ফেলেছে। 

উক্ত সমাবেশ থেকে কয়েক দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, যেগুলো পূরণসাপেক্ষে তারা নিজ দেশে ফেরত যেতে সম্মত বলে জানানো হয়েছে৷ যদিও তাদের এ সকল দাবিদাওয়া নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে আদায়ের পরামর্শ দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছিলেন, রোহিঙ্গাদের বর্তমান পেশকৃত দাবিগুলো তার সাথে যথেষ্টই সামঞ্জস্যপূর্ণ৷ সে সময় প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপিত প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে একটি ছিল সহিংসতা ও 'জাতিগত নিধন' বন্ধ করা, যা রোহিঙ্গাদের দাবিগুলোর মধ্যেও একটি। 

প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি প্রস্তাব ছিল এই যে বার্মার অভ্যন্তরে যেন জাতিসংঘের সুরক্ষাবলয় তৈরি করা হয়, রোহিঙ্গাদের 'পূর্ণ নিরাপত্তা' নিশ্চিতের দাবির সাথে এখানে কোনো দ্বৈরথ নেই। প্রধানমন্ত্রী রাখাইন হতে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনের যে প্রস্তাবটি সে সময় করেছিলেন, রোহিঙ্গা নেতাদের নাগরিকত্ব ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবিও একই কথাই বলে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে না চাওয়ার প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বলা কথাগুলোর অর্থ কী? পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে বললেন "রোহিঙ্গাদের আমরা আর বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারব না", এর মানে কি এই যে বিষয়টি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বা গেছে? 

২৫ আগস্টের সমাবেশের পর থেকে অবশ্য সেটাই মনে হচ্ছে৷ কেননা রাখাইন রাজ্যে যে রোহিঙ্গা পরিবারগুলো ছিল পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন, মাত্র দুবছরে তারা এত সংগঠিত কীভাবে হয়ে উঠলো— সেটা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার চাইতেও বড় কথা, এত বড় একটি সমাবেশ তারা আয়োজন করে ফেললো, অথচ স্থানীয় প্রশাসন তার কিছুই জানলো না, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও সে বিষয়ে কোনো পূর্ব তথ্য থাকলো না— এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে সন্দেহ নেই। 

রোহিঙ্গাদের এ সমাবেশের ধরন দেখে নিশ্চিতভাবেই বলে দেয়া যায় যে এটি দারুণভাবে সংগঠিত ও মজবুতভাবে পরিকল্পিত একটি সমাবেশ ছিল। তাই এর পেছনে অন্য কোনো শক্তি বা অন্য কোনো গল্প আছে কি না, সেটাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সেই সাথে, অতিদ্রুত যেন রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকার প্রদানে মায়ানমার বাধ্য হয়, সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির প্রক্রিয়াও জোরদার করা প্রয়োজন।

ওডি/আরএডি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড