• মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

অপরাধের বীজ সুপ্ত থাকে বিচারহীনতায়

  অধিকার ডেস্ক    ২৮ জুন ২০১৯, ২২:৪৯

বিশ্বজিৎ

"এক একটি বছরের ফারাক, আর দেখি কলকাতা আরও দুঃসহ, আরও যন্ত্রণাময়। মনে হয় নোংরা যেন আরও বীভৎস, হতাশা আরও মরিয়া। যতবার কলকাতার মুখোমুখি হই, মনে হয় এ এক নারকীয় শহর; যার শিয়রে হয়তো-বা সমূহ সর্বনাশ।”

কথাগুলো মৃণাল সেনের ‘পদাতিক’ (১৯৭৩) ছবির শুরুতে সংযোজিত ভয়েস-ওভারটিতে শোনা যায়। আজ থেকে সাড়ে চার দশক আগে কলকাতাকে নিয়ে বলা কথাগুলো এতদিন পরে এসে বাংলাদেশের জন্য দিনকে দিন দারুণভাবে প্রযোজ্য হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা যেভাবে বেড়েছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক রেজাউল করীম সিদ্দিকী, গাজীপুরে সাবেক কারারক্ষী, কলাবাগানে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য-সংস্থার কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান, তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়, সূত্রাপুরে ব্যস্ত রাস্তায় সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী নাজিমুদ্দিন সামাদ— দুর্বৃত্তদের কর্তৃক কুপিয়ে হত্যার ঘটনার তালিকা করতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যাবেরেজাউল

ব্লগার রাজীব হায়দার, বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী নীলাদ্রি নিলয় যেভাবে খুন হয়েছিলেন, তা কখনো ভুলার নয়।প্রকাশ্য দিবালোকে বিশ্বজিৎ-কে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্ববিবেককে! সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি নাম— রিফাত। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে দিনের আলোয় প্রকাশ্য রাস্তায় জনসম্মুখে স্ত্রীর সামনে রিফাতকে কুপিয়ে জখম করা হলে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হলো। অন্যান্য আরও এ ধরনের ঘটনাগুলোর মতো এবারও এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ফলস্বরূপ অতীতের সকল সময়ের মতোই সরকারের তরফ থেকে নানান তৎপরতার কথা ইতোমধ্যেই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত করুণ বাস্তবতা হলো, নতুন আরেকটি ঘটনা সামনে আসতে না আসতেই আগের ঘটনাটি গুরুত্ব হারায়, বিস্মৃতিতে চলে যায়; ম্রিয়মান হয়ে পড়ে অপরাধীদের আটক করার সকল প্রচেষ্টাও৷ এভাবেই বিস্মৃতিতে চলে গেছে তনু হত্যা, সাগর-রুনি হত্যাসহ আরও অগণিত অপরাধের খল-চরিত্ররা।

দিনকে দিন এসব অপ্রত্যাশিত ঘটনা বৃদ্ধি পাবার প্রধান কারণ হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। একটি ঘটনার পর অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবার, পার পেয়ে যাবার সুযোগ তৈরি হলে অন্যান্য অপরাধপ্রবণ মানুষেরা অপরাধ সংঘটনে উৎসাহী হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে একটি অপরাধ আরেকটি অপরাধ সংঘটনের বীজ বপন করে যায়। সবশেষ রিফাত হত্যার মূল হোতা নয়নের অতীত খুঁজে দেখা গেছে সে ইতোপূর্বেও নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিল। এটা তো নিঃসন্দেহে বলা যায় যে অনেকগুলো 'ছোট ছোট' অপরাধ তাকে একটি বড় অপরাধে দিকে ঠেলে দিয়েছে; অনেকগুলো অপরাধে পার পেয়ে যাবার ফলে সে এত বড় একটি অপরাধকর্ম ঘটিয়ে ফেলার সাহস অর্জন করেছে। দেশে ঘটে যাওয়া এতগুলো ঘটনার মধ্যে অন্তত একটি-দুটি ঘটনাতেও অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আটক করা সম্ভব হলে, তাদের কঠিনতম শাস্তির মুখোমুখি করা গেলে অন্যান্য অপরাধীদের কাছে একটি সতর্কবার্তা অন্তত পৌঁছানো যেত, যা করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। গত এক যুগ ধরে রচিত হতে থাকা আমাদের এ ব্যর্থতার ইতিহাস ঘেঁটে আমাদের লজ্জিত হতে হবে৷ তা না হলে এ থেকে মুক্তি আসবে না।

এসব অপরাধ নিয়মিতভাবে সংঘটনের আরেকটি কারণ হলো গণ-প্রতিবাদের স্থায়িত্বের অভাব৷ একটি ঘটনা ঘটার পর কয়েকদিন নানা দিক থেকে প্রতিবাদ হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনির ওপর চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব হয়; ফলে অপরাধীদের আটকে তৎপরতাও দেখা যায় বেশ। কিন্তু জনগণের এ ধরনের প্রতিবাদগুলো খুবই স্বল্পকাল স্থায়ী হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের একটি ক্রিকেট ম্যাচ অথবা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার একটি ফুটবল ম্যাচ, এমনকি কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বালখিল্য ধরনের বক্তব্যের ঘটনাও এতটাই শক্তিশালী হয়ে থাকে যে হত্যার মতো ঘটনার প্রতিবাদমুখিতা তার কাছে সহজেই পরাজিত হয়ে যায়৷ জনতার প্রতিবাদমুখিতা হ্রাসের সাথে সাথেই অতি স্বাভাবিকভাবেই সে ব্যাপারে দায়িত্বশীল মহলের তৎপরতাও হ্রাস পায়৷ আমরা অপেক্ষা করতে থাকি আরও একটি অমানবিক ঘটনার সাক্ষী হবার জন্য।

বছরের পর বছর এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে৷ অতিসত্বর এগুলো রোধ করা না গেলে একটি অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের সামনে আমাদের দাঁড়াতে হবে সন্দেহ নেই৷ এসব ঘটনা যে কেবল জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্নেই মারাত্মক, তা নয়; সরকারের ভিত্তি ও শক্তিমত্তা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও হুমকিস্বরূপ৷ তাই, এসব ঘটনা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনিকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে; অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতেই হবে— এ বার্তা পৌঁছে দিতে হবে সকল অপরাধীর আস্তানায়৷

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড