• রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

উচ্চশিক্ষায় বেহাল অবস্থার জন্য দায়ী কে?

  সম্পাদকীয়

১৩ মে ২০১৯, ২০:১৭
সম্পাদকীয়

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে এবং সে ধারা অব্যাহত রাখতে সে দেশের উচ্চশিক্ষাস্তরকে সময়োপযোগী ও কার্যকরি হতে হয়৷ কেননা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও নেতৃত্বদানের জায়গাগুলোতে যারা আসীন হন, তাদের শিক্ষা পরিপূর্ণ না হলে এবং তাদের দ্বারা নতুন জ্ঞান ও ধারণা জন্ম না নিলে, উদ্ভাবনের নানা ক্ষেত্রে নতুন চিন্তার প্রয়োগ না ঘটলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গুণগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়৷ তাই এ সকল দিক বিবেচনায় পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রসমূহ উচ্চশিক্ষাস্তরে গুণমান বজায় রাখতে এবং মানোন্নয়নে সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা নিশ্চিতে সবসময় সচেষ্ট থাকে৷

সম্প্রতি টাইম্স হায়ার এডুকেশন শিক্ষা ও গবেষণায় সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি তুলনামূলক তালিকা প্রকাশ করেছে৷ সেখানে সুনির্দিষ্ট ১৩টি দিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে৷ এ তালিকায় দেখা গেছে, এশিয়ার সেরা ৪১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েরও নাম নেই৷ অথচ সেখানে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও তাইওয়ানের মতো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থান পেয়েছে৷ এমনকি পাকিস্তানের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় এ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে৷ বিশ্বের ২৮০০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের যে বিশ্ববিদ্যালয়টি সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে, সেটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, যার অবস্থান ৩০১৩৷ এ তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৭৯০৩৷ এমনকি দেশের সেরা দশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই৷ দেশের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৪৩তম৷

এই যখন অবস্থা, তখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের উচ্চশিক্ষাস্তরের মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়ে যায়৷ দেশের উচ্চশিক্ষাস্তরে এ দশার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করছে৷ প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি প্রধান কাজ হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেকখানি পিছিয়ে রয়েছে৷ নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ও গবেষণাগার হিসেবে রূপান্তর করতে হবে৷ আর এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে; অর্থের বরাদ্দ ও নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে৷ দ্বিতীয়ত, মানসম্মত শিক্ষার প্রধান শর্ত হচ্ছে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষা-উপযোগী পরিবেশ৷ এটি নিশ্চিত করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-নিয়োগপ্রক্রিয়াকে যুগোপযোগী ও স্বচ্ছতর করা৷ বিশেষত সুযোগ্য, বিজ্ঞানমনস্ক, উদার, মুক্তমনা ও সাহসী শিক্ষক যারা উন্নত আধুনিক বিশ্বের উন্নয়ন-গতিধারার বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখেন— এমন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ করা প্রয়োজন৷ সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব থেকে ক্যাম্পাসগুলোকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ এছাড়া, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক৷ এ ব্যাপারে ইতোমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ অবশ্য নেয়া হয়েছে৷ উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) আওতায় ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও কারিকুলাম আধুনিকীকরণের ব্যবস্থা নিয়েছে। এ প্রকল্পকে যেকোনো মূল্যে সফল করতে হবে৷ শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয় যার প্রথম ক্যাটাগরিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান কাজ হলো নতুন জ্ঞান ও নতুন চিন্তা-চেতনা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা, যা একটি দেশ বা জাতিকে অন্য দেশের তুলনায় এগিয়ে রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের চাহিদা অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েট সরবরাহ করে থাকে, যা একটি দেশকে বর্তমান অবস্থায় টিকে থাকতে সাহায্য করে৷ কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আমাদের দেশে প্রথম ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয় নেই৷ এ অভাব পূরণে পর্যাপ্তসংখ্যক পিএইচডিধারী মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে, যারা এ সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে। যেহেতু আমাদের প্রথম ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব, তাই এক্ষেত্রে আমাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে হবে, সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে৷ সেই সাথে, যেসব মেধাবী মানুষেরা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হতে হবে৷ এজন্য এককভাবে সরকারকেই ভূমিকা নিতে হবে৷

সব মিলিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা এবং নতুন নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করতে হবে৷ গবেষণার নানা ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখতে হবে৷ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নোংরা রাজনীতির কবল থেকে বাঁচাতে হবে৷ এভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান পুনরুদ্ধার করতে না পারলে এবং নতুন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দিতে না পারলে দিনকে দিন আমাদের আরও পিছিয়ে পড়তে হবে, যা দেশের চলমান উন্নয়নের গতিপথকে রুদ্ধ করে দিতে পারে৷ তাই এ বিষয়গুলোকে আর হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই৷

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড