• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

ধূমপানের ক্ষতি ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রও ভুক্তভোগী

  সম্পাদকীয় ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:২৭

সম্পাদকীয়

সিগারেট৷ এটি সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র বস্তু যার প্যাকেটের গায়ে 'ক্যান্সারের কারণ', 'মৃত্যু ঘটায়' ইত্যাদি কথাগুলো লেখা থাকে৷ বলা হয়— মৃত্যু মানুষের দিকে আসে না, মানুষই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়৷ এ কথার সত্যতা পাই, যখন 'ধূমপান মৃত্যু ঘটায়' লেখা প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে সেটা মানুষ মুখে দেয়৷ গ্যাস হবার সম্ভাবনা আছে বলে যে ব্যক্তি তেলেভাজা খাবার বর্জন করেন, 'ধূমপান ক্যান্সারের কারণ' লেখাটি দেখার পরেও সিগারেট খেতে তার মধ্যে কোনো দ্বিধা সৃষ্টি হয় না৷

ইউএস সার্জন জেনারেল ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেস এক সমীক্ষায় বলছে, ধূমপানের ধোঁয়ায় প্রায় ৭ হাজার ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যার মধ্যে ৬৯টি ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। কেবল ক্যান্সারই নয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধূমপায়ীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় দ্বিগুণ। এ ঝুঁকি স্ট্রোকের ক্ষেত্রে তিন গুণ, দেহের পেশীতে রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টির দিক থেকে পাঁচ গুণ এবং বুকের ব্যথা বা অ্যানজিনার ক্ষেত্রে বিশ গুণ। একজন অধূমপায়ী ব্যক্তি কেবল ধূমপায়ীদের সঙ্গে থাকার কারণেই শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে নিকোটিন গ্রহণ করেন, এতে তার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। অনেকে মনে করে থাকেন যে ধূমপান বা তামাক সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ না করেও কেবল এর পরিমাণ কমিয়ে আনলেই হৃদরোগ এড়ানো সম্ভব৷ কিন্তু বাস্তবে এ ধারণা পুরোপুরি ভুল। কেননা কোনো ব্যক্তি দিনে একটি সিগারেট খেলেও হৃদরোগের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়, আর স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ৷

ধূমপান ছাড়াও, যে কোনো উপায়ে তামাক সেবনের ক্ষেত্রে, যারা তামাক সেবন করেন না, তাদের চাইতে তামাক সেবনকারীদের মধ্যে তামাকজনিত প্রধান ৭টি রোগের একটিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫৭ শতাংশ বেশি এবং তামাকজনিত ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি ১০৯ শতাংশ বেশি৷ বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি, ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ কর্তৃক যৌথভাবে পরিচালিত একটি গবেষণা-প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়৷

সাম্প্রতিককালে, অকালমৃত্যুর কারণের তালিকায় হৃদরোগ ৭ম স্থান থেকে উঠে এসেছে ১ম স্থানে; এই পরিবর্তনের হার ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ। আর এ মৃত্যুর জন্য দায়ী হিসেবে তামাক রয়েছে ৪র্থ অবস্থানে। একটি গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৩০ শতাংশের জন্যই দায়ী ধূমপান। টোব্যাকো এটলাস ২০১৮ উল্লেখ করেছে, তামাকের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ৬২ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করছে৷

এতকিছুর পরেও তামাক ও তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জায়গা দখল করে নিচ্ছে তামাকের চাষ৷ এ খাত থেকে সরকার বড় আকারের রাজস্বও আয় করছে৷ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, তামাক খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পাচ্ছে। রাজস্ব আয় হচ্ছে ঠিক, কিন্তু তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যয় করতে হচ্ছে, তার পরিমাণ রাজস্ব আয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ৷

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউএস ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউট এর এক যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পৃথিবীতে ধূমপানের পেছনে খরচ হয় বছরে এক লাখ কোটি ডলারেরও বেশি; বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৮০ লাখ কোটি টাকার বেশি৷ সমীক্ষার প্রকাশিত তথ্যমতে, বিশ্বের যে ১৩টি দেশে সিগারেট-বিড়ি, জর্দা, গুল ও সাদাপাতার মতো ক্ষতিকর তামাকপণ্য সবচাইতে বেশি উৎপাদিত হয়, তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার ওপরে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ধূমপানসহ তামাক জাতীয় পণ্যের পেছনে বাংলাদেশের ব্যয় এক্ষেত্রে বিশ্বের মোট ব্যয়ের অন্তত এক শতাংশ৷ এ হিসাবে, বাংলাদেশে ধূমপান ও তামাকপণ্য ব্যবহারের কারণে অপচয় হচ্ছে বছরে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির ৩ শতাংশেরও বেশি৷

এছাড়াও, দেশে অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতিরও অন্তত ১৫ শতাংশের জন্য দায়ী সিগারেটের টুকরা৷ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে৷

এ সকল দিক বিবেচনায় নিয়ে সরকার আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এটি একটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ৷ দ্রুততম সময়ের মধ্যে যেন দেশবাসী এর সুফল পেতে শুরু করে, সে ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে৷ কেবল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দ্বারা এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়৷ তাই ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেও সকলকে ধূমপান ও তামাক সেবনের ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে সচেতন হতে হবে৷

ওডি/আরএইচএস

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড