• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

নুসরাতের পরিণতি আর কারও যেন না হয়

  সম্পাদকীয় ১১ এপ্রিল ২০১৯, ১৮:১৩

editorial_odhikar

‘আমি লড়বো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে। সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো৷' এই দৃঢ় প্রতিবাদের ভাষা যে মেয়েটির কলম থেকে প্রকাশিত হয়েছে, তার নাম নুসরাত জাহান রাফি৷

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত অধ্যক্ষ কর্তৃক তার শ্লীলতাহানী প্রসঙ্গে বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে চিঠিটি লিখেছে৷ যে মেয়েটি এমন অদম্য মানসিক শক্তির অধিকারী, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে, সে আর আমাদের মাঝে নেই৷ অভিযুক্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার হুমকিধমকি সত্ত্বেও শ্লীলতাহানীর অভিযোগে করা মামলা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানালে অধ্যক্ষের সাঙ্গপাঙ্গরা শরীরে তেল ঢেলে নুসরাতকে নির্মমভাবে অগ্নিদগ্ধ করেছিল গত ৬ এপ্রিল৷ অমানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে চারটি দিন পার করার পর অবশেষে গত ১০ এপ্রিল রাতে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় সে মারা যায়৷ মারা যায়, কিন্তু রেখে যায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের অনন্য দৃষ্টান্ত৷

সামাজিক অস্থিরতা, যৌন নিপীড়ন, নারী নির্যাতন, ইভটিজিংয়ের মতো অন্যায়গুলোকে প্রতিরোধ করতে আমরা যেখানে ধর্মীয় অনুশাসনের কথা বলি, শিষ্টাচারের কথা বলি, সেখানে একজন মাদ্রাসা-শিক্ষক কর্তৃক এ ধরনের জঘণ্য কর্মকাণ্ড আমাদের কী শিক্ষা দেয়? আমাদের সন্তানদের নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা নিশ্চিত করতে তাহলে আমরা কার দ্বারস্থ হবো?

একজন নুসরাতের কথা ভেবে যেখানে সারা দেশ উত্তাল, সেখানে এ রকম আরও কত শত নুসরাতের ঘটনা আড়ালে থেকে যাচ্ছে, সে খবর কী আমরা রাখি? একটি গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রতি চার জন মেয়ে শিশুর মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়৷ আর প্রতি ছয় জন ছেলে শিশুর মধ্যে যৌন নিপীড়নের শিকার হয় একজন৷ এবং এ সকল ঘটনার ৭৫ শতাংশ ঘটে থাকে ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারা; এগুলো সাধারণত ঘটে বাড়িতে, আত্মীয় বা পারিবারিক বন্ধুদের বাড়িতে, স্কুলে, স্কুলে যাওয়ার পথে বা পরিচিত পরিবেশে৷

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৭১ জন শিশু৷ এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৪ জন৷ এছাড়া যৌন হয়রানি ও ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছে ১৩০ জন শিশু৷ কেবল চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৬৪টি৷ তবে এ সংখ্যাটি সেসব ঘটনার, যেগুলো প্রকাশিত হয়েছে; এর বাইরে আরও কত কত ঘটনা সামাজিকভাবে অপদস্থ হবার ভয়ে অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে, তা কে বলতে পারে! এ তথ্যগুলোই বলে দেয়, বর্তমানে দেশে শিশুরা কতটা অনিরাপদ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠছে৷

দিনকে দিন এ ধরনের ঘটনাগুলো বৃদ্ধি পাবার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, যারা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, সামাজিক লোকলজ্জার ভয় ও নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ না খোলা৷ যারা অন্যায়ের শিকার হবার পরে সে বিষয়ে অভিযোগ ও মামলা দায়ের করেন, তাদের সুফল লাভের পরিসংখ্যানটিও স্বস্তিদায়ক নয়৷

সরকার ২০০১ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও ফরিদপুর জেলায় ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু করে। এ সেন্টারগুলো থেকে এ যাবত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এখানে এ পর্যন্ত যতগুলো ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে, তার প্রায় ৭৩ শতাংশই নিষ্পত্তি হয়নি৷ যে ২৭ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে তার মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তিরা শাস্তি পেয়েছে৷ এটি নিঃসন্দেহে হতাশাব্যঞ্জক৷

এ ধরনের মামলাগুলোর অধিকাংশের ক্ষেত্রেই অভিযোগকারী সুবিচার না পাবার পেছনে ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ থেকে শুরু করে মামলার তদন্তপ্রক্রিয়ায় পুলিশের অদক্ষতা, আন্তরিকতাহীনতা, দুর্নীতিপ্রবণতা, ধর্ষকের রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি কারণ কাজ করে বলে সামাজিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করেন৷ তাই নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিচারপ্রক্রিয়ায় দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন৷ যৌন নিপীড়ন সম্পর্কিত মামলাগুলো যত দক্ষতা ও দ্রুততার সাথে নিষ্পত্তি করা যাবে, ততই এ ধরনের ঘটনাগুলো সংঘটিত হবার প্রবণতা হ্রাস পাবে৷ তাই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এসব ব্যাপারে আরও তৎপর ভূমিকা পালনে সচেষ্ট করে তুলতে হবে৷

ওডি/আরএইচএস 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড