• শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯, ৭ বৈশাখ ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

ব্রেকিং :

রাষ্ট্রদেহের ক্যান্সারে পরিণত হচ্ছে 'তামাক'

  অধিকার ডেস্ক    ১০ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:৩৬

সম্পাদকীয়

সার ও বীজসহ চাষের সকল উপকরণ প্রায় বিনা মূল্যে পাওয়া, বিনা শর্তে ঋণ গ্রহণের সুবিধা, অন্য যে কোনো ফসল চাষের চাইতে কয়েকগুণ বেশি লাভ— এত এত সুযোগ-সুবিধা যেখানে আছে, স্বাভাবিকভাবেই কৃষকেরা সে দিকে ঝুঁকবেন সন্দেহ নেই, বিশেষত কৃষকদের অধিকাংশই যেখানে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর৷ এমনটিই ঘটছে দেশে তামাক চাষের ক্ষেত্রে৷ তামাক কোম্পানিগুলোর এ ধরনের নানা রকম প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা এবং তিন থেকে চার গুণ বেশি লাভের হাতছানি কৃষকদের ব্যাপক হারে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করছে৷

দেশে আবাদি জমির পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত। তার ওপর, পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি বিভাগের হিসাবমতে, বিভিন্ন কারণে প্রতিবছর দেশে কৃষি জমির পরিমাণ কমছে ১ শতাংশ হারে৷ বিশেষত সড়ক নির্মাণ, শিল্প স্থাপন, ঘরবাড়ি নির্মাণ, নদী ভাঙনসহ বেশকিছু কারণ এ জমিহ্রাসের পেছনে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে৷ বর্তমানে দেশে আবাদি জমির পরিমাণ মাত্র ৮৫ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর, যেখানে ১৯৭১ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৭ লাখ হেক্টর। বছরে আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে প্রায় ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর৷ এমন বাস্তবতায় যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে তামাক চাষের পরিমাণ বৃদ্ধির হারটি আশঙ্কাজনক৷ গত কয়েক বছরে দেশে তামাক চাষের হার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি৷ তামাক চাষের এ ব্যাপকতার কারণে একদিকে জমির উর্বরতাশক্তি যেমন হ্রাস পাচ্ছে, সেই সাথে কমছে জমির চাষবৈচিত্র্যও৷ তামাকের কারণে তিনটি মৌসুমের ফসলের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে৷ জমি তৈরি, বীজ বপন, পরিচর্যা, পাতা তোলা, গোড়া তোলা ইত্যাদি কারণে তামাক চাষে সময় লাগে প্রায় আট মাস। ফলে এক জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়৷ তারপরেও বান্দরবান, রংপুর, রাজবাড়ি, কুষ্টিয়াসহ দেশের অন্তত ১৫টি জেলায় ব্যাপকভাবে তামাকের চাষ হচ্ছে৷

তামাক চাষে নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসল উৎপাদন যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তার চাইতেও বেশি প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর৷ তামাক চাষে নিয়োজিত সিংহভাগ কৃষকই আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল হওয়ায় অধিকাংশ চাষিরই শ্রমিক ভাড়া করার সামর্থ্য থাকে না। ফলে তামাক পাতা ওঠানোর মৌসুমে বাড়ির নারী, পুরুষ, শিশু সকলকে একসাথে মাঠে কাজ করতে হয়। এর ক্ষতিকর প্রভাবে এসব পরিবারের সদস্যরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখিন হয়৷ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, তামাক ব্যবহারের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে দেশে ৩০ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতি বছর ৫৭,০০০ জন মৃত্যুবরণ করেন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেন প্রায় ৩,৮২,০০০ জন৷ এর মধ্যে কেবল কুষ্টিয়াতেই প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার, এ জেলার দৌলতপুর উপজেলাতেই প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ১৫ হাজার, যা দেশের অন্য যে কোনো এলাকা থেকে বেশি৷ বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব প্রতিবন্ধিতার প্রধান কারণ তামাক৷ কেননা, এ জেলার শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ জমি ব্যবহৃত হচ্ছে তামাক চাষে৷ এ তো কেবল একটি এলাকার হিসাব; সারা দেশে প্রতিবছর তামাকের কারণে অন্তত দুই লক্ষ মানুষ স্বজনহারা হচ্ছেন৷ তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪৩.৩ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করেন৷ বলা বাহুল্য, তামাকের এ ব্যবহার কেবল ধূমপানের মাধ্যমে হচ্ছে না, এর একটি বড় অংশ ঘটছে ভুক্তভোগীদের অজান্তে, তামাক চাষের ফলস্বরূপ৷

তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ফলে বাড়ছে নানা রকম রোগের আক্রমণও৷ হৃদরোগ, মস্তিষ্কে স্ট্রোক, পক্ষাঘাত, ফুসফুসের ক্যান্সার, ফুসফুসের যক্ষা, মুখ-স্বরযন্ত্র-শ্বাসনালীর ক্যান্সার ইত্যাদি নানা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক৷ তাছাড়া নারীদের নানা ধরনের প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যারও একটি অন্যতম কারণ তামাক। অসুস্থ শিশুর জন্ম হওয়া, সময়ের আগেই শিশু জন্ম দেয়া, কম ওজন সম্পন্ন শিশুর জন্ম দেয়া ছাড়াও গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যুও ঘটছে তামাকের ক্ষতিকারক প্রভাবে৷ এমন পরিস্থিতিতে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসাখরচ বাবদ বরাদ্দ রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা।

এত এত ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট আইনবিধি না থাকায় তামাক চাষ ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না৷ তবে, রাষ্ট্রীয় বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় এনে অতিসত্ত্বর তামাক চাষ ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন৷ পাশাপাশি দেশের প্রান্তিক কৃষকদের পুনর্বাসন ও সচেতনতামূলক নানা ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে হবে৷ তামাকের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে মুক্ত হতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিঘ্ন সৃষ্টিসহ দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠীকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কবলে পড়তে হতে পারে৷

ওডি/আরএইচএস

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড