• মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দেউলিয়া হচ্ছে পিপলস লিজিং: আমানতকারীদের অর্থ ফেরতে অনিশ্চয়তা!  

  অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক

১০ জুলাই ২০১৯, ১৩:৩৯
পিপলস লিজিং

আমানতকারীদের অর্থ ফেরত না দেওয়া এবং অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও চরম অর্থ সঙ্কটের কারণে এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড। আর এসব কারণেই প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যেই সরকারের সম্মতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় যা যা করা দরকার বাংলাদেশ ব্যাংক তার সব উদ্যোগই নিচ্ছে। 

সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকটির কাছ থেকে আমানতকারীরা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার আমানত ফেরত পাচ্ছেন না। আর এখন প্রতিষ্ঠানটি যদি পথে বসে, তাহলে আমানতকারীদের এক টাকাও ফেরত পাওয়ার কোনও বিমা নিশ্চয়তা নেই। কেননা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কোনো আমানত বিমা নেই। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন চেয়ে আদালতের কাছে যাচ্ছে। মূলত, আমানতকারীর অর্থ ফেরতসহ দায়-দেনা কীভাবে মেটানো হবে, তা আদালতের আদেশে নির্ধারিত হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের উদ্যোগ এটাই প্রথম।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির চিঠি দিলে অর্থ মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে তাতে সম্মতি দিয়েছে।  

অন্যদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ, অনিয়ম, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ও তাদের বেতনভাতার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজও  শুরু করেছে তারা। 

তবে পিপলস লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি হুদা জানিয়েছেন, তারা আর্থিক এই প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, গত তিন বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠনের জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শেয়ার বিক্রি চেষ্টার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৬০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছি। আর এই তহবিল পাওয়া গেলে সব সমস্যার সমাধান হবে। 

আমানতকারীদের কী হবে?

প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন সম্ভব হলে নিয়মানুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে আর্থিক খাতের এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব থাকবে। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় একজন অবসায়ককে (লিকুইডেটর) নিয়োগ দেওয়া হবে। আর আমানতকারীদের অর্থ ফিরিয়ে দিতে গঠন করা হবে দীর্ঘমেয়াদি স্কিম।

তবে যতদূর জানা গেছে, অবসায়ন হওয়া প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীর অর্থ কোন উপায়ে ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনে পরিষ্কার করে কিছু বলা নেই। এজন্য আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে। তারা যে উপায়ে অর্থ পরিশোধ করতে বলবেন, সেভাবেই কার্যকর হবে। সাধারণত, সম্পদ বিক্রি এবং সরকারের সহায়তার আলোকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষায় ‘ব্যাংক আমানত বিমা’ নামে একটি তহবিল থাকলেও নন ব্যাংক তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের সুরক্ষায় কোনও তহবিল নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য আমানত বীমা চালুর জন্য ২০১৪ সালে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য আমানত বিমা চালু করা সম্ভব হয়নি।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংকের মতোই আর্থিক  প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের সুরক্ষায় আমানত বিমা থাকা জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংকের আমানত বিমার পরিমাণও বাড়ানো দরকার।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ব্যাংক আমানত বিমা নামে একটি তহবিল আছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য আলাদা আমানত বিমা থাকা দরকার ছিল। এখন সময় এসেছে আমানত বিমা তহবিল সংস্কার করা। কারণ, এখন অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া পর্যায়ে রয়েছে।

পিপলস লিজিং দেউলিয়ার নেপথ্যের কাহিনী কি? 

পিপলস লিজিং ২০১০ সাল পর্যন্ত ভালোই ছিল। তবে তদারকি দুর্বলতা ও পরিচালকদের অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন দেউলিয়ার পথে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালকরা পিপলস লিজিং থেকে বিতরণ করা ঋণের অধিকাংশই জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে নিয়েছেন। 

প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালকরা ভুয়া কাগজ তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটায়। আর এই ঘটনায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ পরিচালককে অপসারণ করে। শুধু প্রতিষ্ঠানের নামে জমি কেনার কথা বলে নিজ নামে জমি রেজিস্ট্রি করার ঘটনায় আত্মসাৎ হয় প্রায় সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকা।
ওই সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জমি রেজিস্ট্রির এ জালিয়াতির  মাধ্যমে সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান ১১৬ কোটি টাকা, নার্গিস আলামিন ও হুমায়রা আলামিন ২৯৮ কোটি টাকা, সাবেক পরিচালক খবির উদ্দিন মিয়া ১০৭ কোটি টাকা, আরেফিন সামসুল আলামিন আত্মসাৎ করেন মর্মে প্রতিবেদন জমা দেয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সামসুল আলামিন, নার্গিস আলামিন, হুমায়রা আলামিন ও খবির উদ্দিনকে অপসারণ করে। একই ঘটনায় তৎকালীন চেয়ারম্যান এম মোয়াজ্জেম হোসেন স্বেচ্ছায় পদ ছেড়ে দেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯৭ সালে পিপলস লিজিংকে অনুমোদন দেয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় রাজধানীর মতিঝিলে। এছাড়া গুলশান ও চট্টগ্রামে এর দুটি শাখা রয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের মুখে আছে। গত ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির আমানত ছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ছিল ১ হাজার ৩০০ কোটি  টাকা। আর এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬  হাজার সাধারণ গ্রাহকের আছে ৭০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে পিপলসের ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপিই ৭৪৮ কোটি টাকা। 

একই অবস্থানে আছে আরও যেসব প্রতিষ্ঠান: 

পিপলস লিজিং ছাড়াও অনেক প্রতিষ্ঠানই অবসায়ন না হলেও ব্যাংক একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ এবং নাম পরিবর্তন হয়েছে। সর্বশেষ ফারমার্স ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। সরকারি পাঁচটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পড়া ব্যাংকটির মালিকানায় এসেছে। বছরের শুরুতে তারা নাম বদলে পদ্মা ব্যাংক হয়েছে। 

এছাড়া ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক শিল্প ব্যাংক এবং শিল্প ঋণ সংস্থা একীভূত করে গঠন করা হয়। ওরিয়েন্টাল ব্যাংক ২০০৬ সালে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। মালিকপক্ষের লুটপাটের কারণে ওই বছরের ১৯ জুন ব্যাংকটির দায়িত্ব নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে আইসিবি গ্রুপ মালিকপক্ষের ৮৬ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। পরে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক নামকরণ করা হয়। কিন্তু দেউলিয়া ব্যাংকের গ্রাহকরা এখনো টাকা ফেরত পাননি। 

শুধু তাই নয়, ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল (বিসিসিআই) ১৯৯২ সালে বিলুপ্ত হয়ে ইস্টার্ন ব্যাংক গড়ে উঠেছিল। এখনও বিসিসিআইর বিভিন্ন দেশের গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাননি। এমনকি ভারত বিভক্তির পর দেউলিয়া হওয়া পাইওনিয়ার ব্যাংক ও ক্যালকাটা মডার্ন ব্যাংকের লিকুইডেশনের সমস্যার এখনো সমাধান হয়নি। 
 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড