• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

‘আবরার মুখ খোলেনি বলে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল’

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৪২
অনিক সরকারের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত মামলার এজহারভুক্ত আসামি অনিক সরকার (ছবি : সংগৃহীত)

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরে বাংলা হলে সেদিন কতটা নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল আবরার ফাহাদকে এবার তা ফুটে উঠেছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত মামলার এজাহারভুক্ত আসামি অনিক সরকারের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। 

জবানবন্দিতে অনিক বলেন, ‘৪-৫ দিন আগে থেকেই ফাহাদ আমাদের টার্গেটে ছিল। রবিবার (৬ অক্টোবর) আবরার গ্রামের বাড়ি থেকে আসায় আমরা সিদ্ধান্ত নেই সন্ধ্যার পর তাকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডাকা হবে। রাত ৮টার পর ফাহাদকে ওই কক্ষে ডাকা হয়। সঙ্গে তার মোবাইল ল্যাপটপটি আনা হয়। 

তিনি বলেন, ফাহাদকে ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কিন্তু ফাহাদ চুপ ছিল। একপর্যায়ে তার মোবাইল ও ল্যাপটপ ঘেটে আমরা উসকানিমূলক কিছু তথ্য পাই। এরপর মারধর শুরু হয়। 

ফাহাদ হত্যার জেরে ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কৃত অনিক ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, প্রথমে চরথাপ্পড় মারে মেহেদি এরপর আমি কিলঘুসি দেই। ইফতিও চরথাপ্পড় মারতে থাকে। একপর্যায়ে সামসুল আরেফিন ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে আসে। আমি স্ট্যাম্প দিয়ে ফাহাদের পায়ে পেটাতে থাকি। 

“ওর দু’হাত টান টান করে স্ট্যাম্প দিয়ে পেটাতে থাকি। ফাহাদ তখন চিৎকার করে কাঁদতেও পারেনি। অন্যরা ওর মুখ চেপে ধরে রেখেছিল। এভাবে থেমে থেমে ইফতি, জিয়ন ও আমি একই কায়দায় পেটাতে থাকি ফাহাদকে।” 

তিনি আরও বলেন, এভাবেই মার চলছিল রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। এরপর ফাহাদকে কক্ষে রেখে দিয়ে ইফতি, জিয়ন ও আমিসহ অন্যরা ক্যান্টিনে খেতে যাই। খাবার খেয়ে ফিরে এসে দেখি ফাহাদ মেঝেতে পড়ে আছে এবং বমি করেছে। তবে তখন বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছি, ভান করছে। তাই আবার স্ট্যাম্প দিয়ে পেটাই। মেঝের উপর উপুড় হয়ে শুয়েছিল ও। সেই অবস্থাতেই আবরারের পিঠে প্রায় আধাঘণ্টা স্ট্যাম্প দিয়ে পেটাই। 

“একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়লে আমি বলি ফাহাদকে গোসল করিয়ে হাতে-পায়ে মলম লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। এ সময় আবরার দ্বিতীয়বার বমি করে। তখন আবরারের কক্ষ থেকে তার কাপড়-চোপড় নিয়ে আসে একজন।” 

অনিক বলেন, এরপর আবরারকে ওই কক্ষ থেকে বের করে পাশের ২০০৫ নম্বর কক্ষে নেওয়া হয়। ওই কক্ষে আবরার আবারও বমি করে। মেহেদী তখন আবরারকে পুলিশের হাতে দেওয়ার জন্য নিচে নামাতে বলেন। 

“তখন আমি, জেমি, মোয়াজ ও শামীমসহ ৩-৪ জন তাকে কোলে করে সিঁড়িঘরের পাশে নিয়ে যাই। এরও পরে পুলিশ ও চিকিৎসকদের খবর দেওয়া হয়। চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”

“আমাদের উদ্দেশ্য ছিল শিবির শনাক্ত করা। কিন্তু ফাহাদ মুখ খোলেনি বলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ফাহাদ মারা গেছে আমরা বুঝতে পারিনি। এ ঘটনায় আমি অনুতপ্ত।” রেকর্ডকৃত জবানবন্দিতে এভাবেই বলেন অনিক। 

গত ৬ অক্টোবর আবরার খুন হওয়ার পরপরই ওই রাতে বুয়েট ক্যাম্পাস থেকে ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অনিকও ছিলেন। বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পঞ্চদশ ব্যাচের শিক্ষার্থী। গ্রেফতারের পর এ ১০ জনের সঙ্গে অনিককেও পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল পুলিশ। জবানবন্দির পর অনিক সরকারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

গতকাল শনিবার (১২ অক্টোবর) ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করার দায় স্বীকার করে ঘটনার দিনের বর্ণনা দেন চাঞ্চল্যকর এ হত্যামামলার অন্যতম আসামি অনিক সরকার। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) আবেদনের প্রেক্ষিতে শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম তার (অনিক সরকার) জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। 

আরও পড়ুন: অনেক কষ্ট করে টাকা পাঠিয়েছি মাসের পর মাস : অনিকের বাবা

অনিক সরকার রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বড়ইকুড়ি গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, অনিক সরকার ওরফে অপু ছোট থেকেই মেধাবী ছাত্র। তিনি মোহনপুর কেজি স্কুল থেকে ৫ম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হোন। এরপর ৮ম শ্রেণিতেও বৃত্তি পান তিনি। ২০১৩ সালে একই বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে ২০১৫ সালে জিপিএ ৫ পেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হয় অনিক। 

ওডি/এআর 

অপরাধের সূত্রপাত কিংবা ভোগান্তির কথা জানাতে সরাসরি দৈনিক অধিকারকে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড