• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আবরার হত্যার পরিকল্পনা হয় ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জারে!  

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:৫৭
আবরার হত্যাকাণ্ড
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পূর্বে ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপের কথোপকথন (ছবি : সংগৃহীত)

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষটি ছিল বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের টর্চার সেল। যেই রুমে ডেকে নিয়ে রবিবার (৬ অক্টোবর) রাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে। তাকে এই রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের পরিকল্পনার ছক করা হয় আরও আগেই। 

বুয়েট ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপে হয় এমন পরিকল্পনা। এ বিষয়ে এবার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার একদিন আগে শনিবার (৫ অক্টোবর) দুপুর পৌনে ১টায় সিক্সটিন ব্যাচকে মেনশন করে সেই সিক্রেট গ্রুপে মেহেদী হাসান রবিন লেখেন, সেভেন্টিনের আবরার ফাহাদকে মেরে হল থেকে বের করে দিবি দ্রুত। ২ দিন টাইম দিলাম।   

এই নির্দেশনার পরদিন রবিবার রাত ৭টা ৫২ মিনিটে সবাইকে হলের নিচে নামার নির্দেশ দেন মনিরুজ্জামান মনির। রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আবরারকে নিজ কক্ষ থেকে ডেকে করিডোর দিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে নিয়ে যান সাদাত, তানিম, বিল্লাহসহ কয়েকজন। এরপর রাত ১টা ২৬ মিনিটে ইফতি মোশাররফ সকাল ম্যাসেঞ্জারে লেখেন, মরে যাচ্ছে, মাইর বেশি হয়ে গেছে।

এদিকে আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রকাশিত সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওইদিন রাত ১২টা ২৩ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে আশিকুল ইসলাম বিটু ২০১১ নম্বর রুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। এর প্রায় ৭ মিনিট পর তিনি বেড়িয়ে যান। 

শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর হলে ওইদিন রাতে কি ঘটেছিল এর লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী বিটু বলেন, মনির জেমি আর তানিমকে ফোন দিয়ে বলে আবরারকে ডেকে আনো ২০১১ নম্বর রুমে। পরে দেখলাম ২জন ওর দুটা ফোন ও ল্যাপটপ চেক করছে। কোথায় আবরার লাইক দেয় বা কমেন্ট করে অথবা কাদের সাথে ম্যাসেঞ্জারে কথা বলে এগুলো নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। এরপরে আমি রুম থেকে বের হয়ে যাই। পরে ১২টা ৩০ এর দিকে আমি আবার রুমে আসি আমার ল্যাপটপ ও বই নিতে। আমি রুমের ভিতরে ঢুকে দেখলাম যে আবরার একদম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। সেখানে আবরার এর ব্যাচেরও ৭-৮ জন ছিল। পরে রুম থেকে বের হয়ে সকালকে প্রশ্ন করি, এমন কিভাবে হলো? তখন মুনির উত্তর দিলো বললো যে অনিক ভাই মাতাল অবস্থায় একটু বেশি মারছে। তখন ওখানে থাকা আমার জন্য সুরক্ষিত না ভেবে তখনই আমি ওখান থেকে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে আসি।

তবে আবরারকে নির্যাতনের খবর কাউকে জানাননি কেনো এমন প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর দিতে না পারলেও বিটু দাবি করেন, এমন অনেক সময়ই হলে হয়, তবে আবরার যে মারা গেছে তাও না। তখনো ওকে মেডিকেলে নিয়ে গেলে হয়তো বাচানো যেত।

অন্যদিকে আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলার এজাহারে না থাকলেও অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার আইন বিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহার বিরুদ্ধে। এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনাও হয়। কেননা ২০১১ নম্বর কক্ষের একজন আবাসিক ছাত্র ছিলেন তিনি। এ বিষয়ে বুয়েটের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, অমিত সাহার নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল ২০১১ নম্বর কক্ষটি। ঘটনার সময় তার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মীরা আবরারকে বেদম মারধর করেন। পরে তিনিসহ অন্যরা বেরিয়ে যান। ওই কক্ষ থেকে পুলিশ রক্তমাখা স্টিক, ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করে। এই রুমে শুধু আবরারকেই নয়, আরো অনেককেই এনে নির্যাতন করা হতো। যার কক্ষে এ ঘটনা ঘটল তাকে আসামি না করা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।  

এবার ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপে মিলেছে অমিত সাহার সক্রিয় থাকার তথ্য। নিজ রুমে এমন হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি ছিলেন আত্মগোপনে। গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে তিনি দাবি করেন, ২০১১ নম্বর রুমে অমিত থাকে এমন তথ্য উঠে আসাতেই আমি আলোচনায় এসেছি। 

বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে অমিত সাহাকে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।    

২০১১ নম্বর কক্ষ ছিল ছাত্রলীগের টর্চার সেল

বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংসহ রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার বুয়েটের অনেক শিক্ষার্থীই। রাজনৈতিক নির্যাতনসহ এসব অপকর্মের জন্য হলগুলোতে রয়েছে আলাদা টর্চার সেল। আবরার ফাহাদকে যেই রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করা হয় সেটিও মূলত ছিল বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের শেরে বাংলা হলের টর্চার সেল। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একাধিক শিক্ষার্থী এবং শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্রদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুমের পাশে থাকা এক ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক অধিকারকে জানান, ২০১১ নম্বর রুমটি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হতো। সেটা ছাত্রলীগের টর্চার সেলও ছিল। এই রুমে থাকা চার শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজনই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলেও জানান তিনি।  

ঘটনার দিনের বর্ণনা জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমি রাত ৮টার দিকে একবার বাইরে বের হই। তখন ওই রুমের সামনে প্রায় ১৫ জনের জুতা দেখি। তবে রুমটি যেহেতু রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার হতো তাই তেমন একটা সন্দেহ হয়নি। ওই রুমের সামনে প্রায়ই এমন দেখা যেত।’

শেরে বাংলা হলের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘বুয়েটের হলগুলোতে রাজনৈতিক এমন টর্চার সেল রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন সময় জুনিয়র ব্যাচদের ডেকে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। তবে এসবে প্রতিবাদ জানানোর মতো সাহস আসলে কারও নেই।’

এছাড়া বুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, শেরে বাংলা হলের রুম-২০১১ হল শাখা ছাত্রলীগের ঘোষিত টর্চার সেল। একটু ব্যতিক্রম হলে শেখানোর নাম করে জুনিয়রদের র‌্যাগ দেওয়া হতো সেখানে।

বুয়েটে সিনিয়র ভাই ও ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে আবরারের মতো না হলেও এমনই নির্যাতিত হয়েছিলেন বুয়েটের সাবেক এক শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে টর্চার সেলের বিষয়ে তথ্য জানিয়ে তার নির্যাতনের লোমহর্ষক ছবিও প্রকাশ করেছেন তিনি। 

এনামুল হক নামে বুয়েটের সাবেক ছাত্র ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, বিভিন্ন হলের কয়েকটি রুমে ছাত্রলীগের এমন টর্চার সেল রয়েছে। যেখানে ফেসবুকে ভিন্নমতের স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের নির্যাতিত হতে হয়।

এ বিষয়ে ফেসবুকে কয়েকটি ছবি আপলোড করে বুয়েটের সাবেক ওই ছাত্র বলেছেন এসব মারের দাগ আবরারের নয়; এগুলো তার শরীরেরই ছবি। আবরার মারা গেলেও সেবার ছাত্রলীগ কর্মীর নির্যাতনের পরও প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। সেখানে দেখা গেছে নির্যাতনের কারণে পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন।

নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, বুয়েটের ও এ বি এর দোতলায় মেকানিক্যাল ড্রয়িং কুইজ দেয়া শেষ হওয়া মাত্রই পরীক্ষার রুম থেকে তন্ময়, আরাফাত, শুভ্র জ্যোতি টিকাদারদের নেতৃত্বে ৮-১০ জন ছাত্রলীগের ছেলে শিক্ষকের সামনে থেকে তুলে নিয়ে আহসানউল্লাহ হলের তখনকার টর্চার সেল ৩১৯ নাম্বার রুমে নির্যাতন করে। আমি কারো সঙ্গে যেখানে রাগারাগি পর্যন্ত করতাম না, কারো সঙ্গে কখনোই সম্পর্ক খারাপ পর্যন্ত যেখানে ছিল না, শুধুমাত্র ফেইসবুকে সরকারি নীতির সমালোচনা করে পোস্টের কারণে বুয়েটের মতো একটা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগ আমার সঙ্গে এমন আচরণ করে।

তিনি বলেন, ‘এর ৬ দিন আগে সাবেক বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি শুভ্র জ্যোতি টিকাদার ('০৯) ও কাজল ('০৯) ল্যাব থেকে আমাকে ধরতে এসে ব্যর্থ হয়ে পরীক্ষার রুম থেকে আমাকে একা ধরতে ওরা ৮-১০ জন প্রস্তুতি নিয়ে আসে! বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা ৩০!! বদ্ধ রুমে আমার পিঠের ওপর লোহা দিয়ে '১০ ব্যাচের এক ভাই প্রধানত তার শক্তি পরীক্ষা করে।’

ওডি/এআর 

অপরাধের সূত্রপাত কিংবা ভোগান্তির কথা জানাতে সরাসরি দৈনিক অধিকারকে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড