• শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

১০০ কোটি না হলে হাতই দেন না জি কে শামীম!

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:০৪
গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীম
গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীম (ফাইল ফটো)

হঠাৎ ‘ক্যাসিনো ঝড়ে’ লণ্ডভণ্ড গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীমের সাম্রাজ্য! একে একে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য, খুলে যাচ্ছে মুখোশ, ভেসে যেতে বসেছে তার সম্পদের সাম্রাজ্য।

জি কে শামীম এক সময় ছিলেন নারায়ণগঞ্জ যুবদলের নেতা। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি যুবলীগ নেতা বনে গেছেন। গড়েছেন অর্থ-সম্পদের সাম্রাজ্য। সব কিছুকে পেছনে ফেলে শামীমের বড় পরিচয় এখন গণপূর্তের প্রতাপশালী ঠিকাদার। বিশেষ ক্ষমতায় গণপূর্তের প্রায় সব কাজই পেয়ে যেত শামীম। তাই ঘুষ-কমিশনও দুহাত ভরে দেন তিনি। সাবেক এক মন্ত্রীকে রীতিমতো দুহাত বস্তাভরে ঘুষ দিতেন। গাড়িতে করে নিজেই এসব টাকা পৌঁছে দিতেন।

কেবল মন্ত্রীই নন, জি কে শামীমের কাছ থেকে প্রভাবশালী আমলা ও প্রকৌশলীরাও একইভাবে ঘুষ-কমিশন পেতেন।

শুক্রবার (২০ সেপ্টেম্বর) র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন জি কে শামীম। এরপর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তিনি।

সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর ব্যানার ব্যবহার করে যারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম করছেন, তাদের কেউই এবার রেহাই পাবেন না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। শুদ্ধি অভিযান তো মাত্র শুরু হয়েছে। একে একে ফাঁসবে বহু রথী-মহারথী। রাজধানীর বাইরেও চলবে এই শুদ্ধি অভিযান।

সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শামীম তার পাঁচটি ব্যাংকে ৭০০ কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য দিয়েছেন। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন তিনি। কয়েক মাস আগে সেখানেও বিপুল অঙ্কের টাকা জমা রেখেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জি কে শামীম টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজধানীর নিকেতন ও বাসাবোতে পাঁচটি করে ১০টি বহুতল বাড়ি, বাসাবোতে এক বিঘার একটি বাণিজ্যিক প্লট, বান্দরবানে একটি তিন তারকা মানের রিসোর্ট রয়েছে। এগুলো শুধু প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সূত্র বলছে, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী এই ঠিকাদার গত ১০ বছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার কাজ পায়। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের ৮০ শতাংশ ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে শামীমের প্রতিষ্ঠান যুক্ত।

অনেকেই বলেন, এমনভাবে টেন্ডার আহ্বান করা হয় যাতে শামীমের প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। অন্যভাবে বললে বলতে হয়, শামীমকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের শর্ত সেভাবে নির্ধারণ করা হয়।

সাম্প্রতিক একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ঘটনায় শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জি কে বিপিএল ব্ল্যাকলিস্টেড হয়। কারণ রূপপুরের বালিশ কাণ্ডের মাধ্যমে মূলত জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয়। রূপপুরের গ্রিনসিটি আবাসন পল্লী নির্মাণের ব্যয় ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সেখানে বড় অঙ্কের কয়েকটি কাজ জি কে শামীম নিজেই করছেন।

এছাড়া ৫ পার্সেন্ট কমিশনের বিনিময়ে তিন-চারটি প্রতিষ্ঠানকে কয়েকটি কাজও দেন। ব্যাপক কমিশন বাণিজ্যের কারণেই মূলত রূপপুরে ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে বালিশ, চাদর ও ইলেকট্রিক সামগ্রী সরবরাহে ব্যাপক দুর্নীতি হয়।

সূত্র বলছে, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সব ঠিকাদারই জি কে শামীমের নিয়ন্ত্রণে। বড় বড় কাজ তিনি নিজেই করেন। কিছু কাজ পছন্দের অন্য ঠিকাদারদের দিয়ে দেন মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে। তার মাধ্যমে কাজ পেয়ে ব্যাপকভাবে লাভবান সাজিন ট্রেডার্স, এনডিই (ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লি.) ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

শামীমের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকারি টেন্ডারের প্রাক্কলিত মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করতেন মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। অতিরিক্ত মূল্যের একটি বড় অংশ অসৎ কর্মকর্তারা ভাগ করে নিতেন।

সূত্র বলছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পের ‘বালিশ কাণ্ড’ প্রকাশ হওয়ার পর জি কে শামীম বিশাল নিরাপত্তা বহর নিয়ে চলতেন। কমপক্ষে ২০ জন গানম্যান থাকত তার সঙ্গে। বহরের থাকত ২০-২৫টি মোটরসাইকেল।

জি কে শামীম তার মোটরসাইকেল বাহিনী টেন্ডার ছিনতাইয়ের কাজেও লাগাতেন। প্রায় এক বছর আগে প্রকাশ্যে বঙ্গ বিল্ডার্সের মালিক লিটনের টেন্ডার ছিনিয়ে নেয় শামীমের লোকেরা। ছোট কোনো কাজের প্রতি শামীমের যেন আগ্রহই নেই। পূর্ত মন্ত্রণালয়ে ১০০ কোটি টাকার নিচে কাজ সাধারণত তিনি ধরেন না। ১০০ কোটির বেশি হলেই কেবল তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম শোনা যায়।

রাজধানী ঢাকায় পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে যেসব বড় বড় ভবন নির্মাণ কাজ হচ্ছে; সেগুলোর অধিকাংশই শামীমের প্রতিষ্ঠান জি কে বিপিএল নির্মাণ করছে।

ওডি/এমআর

অপরাধের সূত্রপাত কিংবা ভোগান্তির কথা জানাতে সরাসরি দৈনিক অধিকারকে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড