• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

নকলের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পাবনার বুলবুল কলেজ : শিক্ষকরা জিম্মি  

  পাবনা প্রতিনিধি

১৮ মে ২০১৯, ১১:২৮
পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ
পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ (ছবি : দৈনিক অধিকার)

এক বছর আগে পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ নকলে সহায়তা করতে যেয়ে হাতে নাতে ধরা পড়ে জেল খেটেছিলেন। এ বছর নকল প্রতিরোধ করতে গিয়ে ওই কলেজেরই এক শিক্ষক ছাত্রদের হাতে মার খেলেন। গত কয়েক বছরে অন্তত ১৫ জন শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন। যার বেশিরভাগই ঘটেছে ছাত্র নামধারী কিছু বখাটের নকলে সুবিধা না পাওয়াকে ঘিরে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন কার্যত নকলের কালো থাবা থেকে কলেজটিকে মুক্ত করতে না পারার কারণেই এমন সব ঘটনা ঘটে চলেছে।  

গত বছর ২৬ মে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় নকল সরবরাহের দায়ে সরকারী শহীদ বুলবুল কলেজের অধ্যক্ষ ড. রেজাউল ইসলামকে আটক করেছিল। পরে আদালতের মাধ্যমে তার সাজা দেয়া হয়েছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কতিপয় পরীক্ষার্থীর কাছে নকল সরবরাহ করা হচ্ছিল। পুলিশ ঐ কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে অভিযান চালিয়ে অধ্যক্ষ এবং তার কয়েক সহযোগীকে আটক করেছিল। বুলবুল কলেজে এর আগের এক অধ্যক্ষও এভাবে নিয়োগ পরীক্ষায় নকলে সহায়তা করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

বুলবুল কলেজে চাকরি করতেন এমন কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নকল করা নিয়েই মূলত বুলবুল কলেজে বিভিন্ন সময়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে এবং অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। তারা জানান, অনার্স পরীক্ষাগুলোতে শিক্ষকদের এক শ্রেণির ছাত্রনেতা নামধারীরা হুমকি দেন, অপমান করেন। পরীক্ষা হলে এসে তাদের চ্যালাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষকদেরই শাসিয়ে দেয়া হয়- তাদের যেন ‘ডিস্টার্ব ’করা না হয়।  

বৃহস্পতিবার পাবনা প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বুলবুল কলেজের কয়েকজন শিক্ষক জানান, পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজে শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশে নেই। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ফেরানোর জন্যে হলেও পাবনাবাসীর অন্তত এই বিষয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। ছাত্রলীগ নামধারী কতিপয় ছাত্র ও বহিরাগতদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। গত কয়েক বছরে অন্তত প্রায় ১৫ শিক্ষক তাদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন। কেউবা কলেজ থেকে নীরবে বদলি নিয়ে চলে গেছেন।

এ কলেজের সাবেক এক শিক্ষক জানান, ‘মানসম্মান নিয়ে ওই কলেজে চাকরি করা সম্ভব নয় তাই সেখান চলে এসেছি।’

সাম্প্রতিক শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনার পর থেকে এখানে কর্মরত শিক্ষকরা চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়েছেন বলে একাধিক শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে। তারা জানান, এখানে মানসম্মান নিয়ে থাকাটা কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে। তারা জানান, যে প্রতিবাদ করা দরকার তাও করতে পারছি না। যে কথা বলা দরকার তাও বলতে পারছি না। যেমনটি অধ্যক্ষ রাজনৈতিক চাপে মূল হোতার নামে এবার মামলাও দিতে পারেননি। 

বৃহস্পতিবার বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি পাবনা জেলা শাখা আয়োজিত মানববন্ধন চলাকালে একাধিক শিক্ষক জানান, ‘কিছু প্রভাবশালী নেতা এবারের ঘটনার মূল হোতার নাম বাদ দিয়ে মামলা করতে চাপ দিয়েছেন।’ তারা বলেন, ‘আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় জড়িত হয়েছি। যারাই এ মামলায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছেন, তাদের কাছে অনুরোধ করছি সন্ত্রাসীদের পক্ষে অবস্থান না নেয়ার জন্যে।’ 

পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবায়দুল হক বলেন, শিক্ষকরা যাদের নামে মামলা দিয়েছেন তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় কারো চাপে তারা কোনো আসামির নাম বাদ দিয়েছেন কিনা আমার জানা নেই।

এদিকে জেলা ছাত্রলীগের নিজস্ব প্যাডে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, অনিবার্য কারণবশত সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

মারধরের শিকার বুলবুল কলেজের বাংলার শিক্ষক মাসুদুর রহমান বলেন, আমি গত ৪ দিন পর বাসা থেকে বের হওয়ার পর দেখছি আমাকে অপরিচিতরা অনুসরণ করে। আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। শুনেছি রাজনৈতিক চাপে অধ্যক্ষ স্যার ঘটনার মূল হোতাকে বাদ দিয়ে পাবনা সদর থানায় একটি মামলা করেছেন। আসলে আমি বুঝতে পারছি না আমার কি হয়। পুনরায় যদি আমার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে তাহলে আমি নিশ্চিত আমাকে তারা শেষ করে ফেলবে। 

বিষয়টির ব্যাপারে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স জানান, আমি জেলা ছাত্রলীগকে ডেকে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের শাস্তি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি।  অধ্যক্ষর দায়েরকৃত মামলার কারা আসামি হবে না হবে সেটি বাদীর নিজস্ব ব্যাপার। এখানে আমার কিছু বলার নেই। তবে কলেজ শিক্ষকরা আমার কাছে এসেছিল, তারা কলেজ ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমাকে অবহিত করেছেন।

প্রসঙ্গত, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনে বাধা দেয়ায় পাবনায় কলেজ শিক্ষক মাসুদুর রহমানকে মারধোর করে কয়েক ক্যাডার। গত ১২ মে এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। 

ওডি/এআর 

অপরাধের সূত্রপাত কিংবা ভোগান্তির কথা জানাতে সরাসরি দৈনিক অধিকারকে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড